আন্তর্জাতিক

হুতি হামলা ঘিরে ইরান-সৌদিকে ‘ভিন্ন বার্তা’ দিচ্ছে পাকিস্তান

হুতি হামলা ঘিরে ইরান-সৌদিকে ‘ভিন্ন বার্তা’ দিচ্ছে পাকিস্তান

ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিরক্ষা চুক্তির অঙ্গীকার করছে পাকিস্তান। তবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে জড়াতে চাইছে না দেশটি। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে ইসলামাবাদ। ফলে হুতি হামলা ঘিরে পাকিস্তানকে একদিকে সৌদির নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক অবস্থানের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সৌদি আরবে হুতি হামলা বাড়লে মক্কা চুক্তির আওতায় পাকিস্তান কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে। জবাবে তিনি বলেন, তখন এ নিয়ে কোনো আলোচনা চলছিল না। তবে প্রয়োজন হলে চুক্তি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে ইসলামাবাদ।

একই দিন রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়েমেনে নিজেদের মিত্র হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানকে সতর্ক করেছে পাকিস্তান। তবে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইসলামাবাদ জানায়, আপাতত সামরিক জবাব দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। একই সঙ্গে তেহরানকে সতর্ক করা হয়, পরিস্থিতি পাকিস্তানকে সামরিক পদক্ষেপের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তার জন্য যেকোনো হুমকি পাকিস্তানের কাছে ‘রেড লাইন’।

একই দিন রিয়াদে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। মক্কা চুক্তির অংশীদার দেশগুলোর প্রতিরক্ষাপ্রধানদের ওই বৈঠকে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সমন্বয় এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।

এরপর ৫ অক্টোবর রিয়াদে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মন্ত্রীদের বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানান, পাকিস্তান ও তুরস্ক সহায়ক ভূমিকা পালন করছে এবং পাকিস্তান গোয়েন্দা নজরদারির কাজেও যুক্ত রয়েছে। তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরাসরি লড়াই করছে সৌদি বাহিনী।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর পাকিস্তানের কোনো মন্ত্রীর পক্ষ থেকে সামরিক কার্যক্রম নিয়ে এটিই ছিল সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ্য বক্তব্য। তবে পাকিস্তানের গোয়েন্দা নজরদারি কোথায় পরিচালিত হচ্ছে, তা পরিষ্কার নয়। সৌদি ভূখণ্ডে, ইয়েমেন সীমান্তে, নাকি সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। যৌথ বিবৃতিতেও সেনাসদস্যের সংখ্যা বা সামরিক সরঞ্জামের তথ্য ছিল না।

সৌদি আরবের নিরাপত্তায় পাকিস্তানের সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা নিয়ে ইরানও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ২ অক্টোবর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানান, নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বৈঠকের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে মক্কা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।

ইসহাক দারের ভাষ্য অনুযায়ী, সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে হুতিদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে বলেছিল ইরান। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এটি দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা ছিল, কোনো লিখিত প্রস্তাব নয়।

৪ অক্টোবর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, পাকিস্তানের সেনা মোতায়েনের খবর সত্য নয় বলেই তেহরান আশা করে। পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। দেশটির তাসনিম সংবাদ সংস্থা তুরস্ক ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের যুদ্ধে যোগ দেওয়ার অভিযোগ তোলে।

তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক জাভাদ হেইরান-নিয়ার মতে, সৌদি ভূখণ্ড রক্ষার বিষয়টি ইরান মেনে নিতে পারে। কিন্তু হুতিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সামরিক পদক্ষেপকে তেহরান ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচনা করে।

পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবের পক্ষে সেনা মোতায়েন করলে পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হুতি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে হুতিদের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে যে, দেশ দুটি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে না বলে তারা ধারণা করছে।

পাকিস্তানের সামনে এখন দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রাখা, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়িয়ে চলা। গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সৌদিকে সহায়তা দেওয়ার পথ খোলা রাখলেও সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়ে ইসলামাবাদ এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

বিষয়:ইরান-সৌদি ভিন্ন বার্তা সতর্ক অবস্থান হুতি হামলা

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…