আন্তর্জাতিক

আশা ও শঙ্কার দোলাচলে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন

পাকিস্তানের নির্বাচনী বুথে ভোট দিচ্ছেন একজন ভোটার. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

একজন ভোটার পাকিস্তানের নির্বাচনী বুথে ভোট দিচ্ছেন, চারপাশে পাকিস্তানের পতাকা দেখা যাচ্ছে।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ

আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন। টানা তৃতীয়বারের মতো বেসামরিক সংসদে ভোট দিতে চলেছে দেশটির জনগণ। পাকিস্তানের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় এই দেশের প্রতিটি নির্বাচনেই মূল ভূমিকা পালন করে আসছে সেনাবাহিনী। দেশটির ইতিহাসে কোন নির্বাচনই বিতর্ক ছাড়া হয়নি। এবারের নির্বাচনও তার ব্যতিক্রম নয়।

অন্যান্য বারের তুলনায় ২০২৪ সালের পাকিস্তানের নির্বাচনকে বেশ জমজমাট বলে মনে হলেও এই নির্বাচনকে ঘিরে নাটকীয়তারও কমতি নেই। নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেননি দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং জনপ্রিয় নেতা ইমরান খান। গত বছর মে থেকেই কারাবন্দি আছেন তিনি। এদিকে স্বআরোপিত নির্বাসন থেকে পুনরায় আবির্ভূত হয়ে নির্বাচনে লড়ছেন দেশটির সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সহোদর এবং পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। তবুও পাকিস্তানের আসন্ন এই নির্বাচনটি বিশ্বের রাজনীতি বোদ্ধাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কেন এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ?

ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ পাকিস্তান। চীনের ঘনিষ্ঠতা থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক একদমই মধুর নয় দেশটির। আবার পাকিস্তানের সাথে ইরান এবং তালেবান-নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের বিশাল সীমান্ত রয়েছে। তাই এই পারমাণবিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের ক্ষমতায় কে বসবেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

অনেকের মতে দেশটিতে এখন যা প্রয়োজন তা হল স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার। ইরানের সাথে সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মতো বিষয়গুলো মোকাবেলা করার জন্যই শুধু নয় বরং আর্থিক সহায়তা এবং বিনিয়োগকে সুরক্ষিত রাখতেও নির্বাচিত সরকার প্রয়োজন।

২০২৪ সালের পাকিস্তানের নির্বাচনকে বেশ জমজমাট বলে মনে হলেও এই নির্বাচনকে ঘিরে নাটকীয়তারও কমতি নেই।

নওয়াজ শরিফ বনাম ইমরান খান

২০১৩ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসেন নওয়াজ শরিফ। নির্বাচনে জয়লাভ করলেও সামরিক বাহিনীর সুনজর পেতে ব্যর্থ হন তিনি। দেশকে সেনাবাহিনীর প্রভাবমুক্ত করে বৈদেশিক ও নিরাপত্তানীতি প্রণয়ন এবং ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে গিয়েই বিদায় ঘণ্টা বাজে তার।

২০১৭ সালে দুর্নীতির অভিযোগ এনে নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতাচ্যুত করে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ইমরান খান ও তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফকে (পিটিআই) সমর্থন দেয় দেশটির সেনাবাহিনী। তারা নিপুণভাবে জনগণের সামনে ইমরান খানের জনপ্রিয় ভাবমূর্তি তুলে ধরে এবং তাকে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে।

অপরদিকে নওয়াজ শরিফকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এসব দুর্নীতির মামলা থেকে বাঁচতে স্বেচ্ছায় নির্বাসন গ্রহণ করেন তিনি।

কিন্তু ইমরান খানের ক্ষমতায় আরোহণের পরই আইএসআই প্রধানের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে তার সঙ্গে সেনাবাহিনীর মতপার্থক্য শুরু হয়। অবশেষে ২০২২ সালের এপ্রিলে অনাস্থা ভোটে ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে নওয়াজ শরিফের ভাই শেহবাজ শরিফকে ক্ষমতায় বসেন।

প্রায় অর্ধযুগেরও বেশি সময় পর যেন নিজেদেরই বিপরীত অবস্থানে অবস্থান করছেন নওয়াজ শরিফ এবং ইমরান খান।

 

এভাবে ক্ষমতাচ্যুতির পর ইমরান খান প্রকাশ্যে সামরিক বাহিনীর সমালোচনা করেন। এর বিপরীতে সেনাবাহিনী তাকে নির্বাচনের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করে এবং একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে যদিও এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন ইমরান।

এদিকে সামরিক বাহিনী নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে সব মামলা বাতিল করে আসন্ন নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ পরিষ্কার করেছে এবং তাকে ইমরান খানের বিরুদ্ধে পছন্দের প্রার্থী হিসেবে তৈরি করছে। এখানে উদ্দেশ্য পরিষ্কার, ইমরান খানকে সরিয়ে নওয়াজ শরিফকে সেনাবাহিনী সামনে আনছে  যাতে তিনি ভবিষ্যতে সেনাস্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করা থেকে বিরত থাকেন।

সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। জনগণের সামনে নওয়াজ শরিফের জনপ্রিয় ভাবমূর্তি তুলে ধরে ইমরান খানকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ হিসেবে চিত্রিত করা। প্রায় অর্ধযুগেরও বেশি সময় পর যেন নিজেদেরই বিপরীত অবস্থানে অবস্থান করছেন এই দুই নেতা।

পাকিস্তানের জনগণ কি চাচ্ছে ?

বিশৃঙ্খল রাজনীতি, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, ভেঙে পড়া অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি থেকে মুক্তি চাইছে পাকিস্তানের জনগণ। নির্বাচিতদের জন্য রাজনৈতিক লড়াইের তুলনায় মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পাকিস্তানের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ নিশ্চিত করাই হবে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং, ফেব্রুয়ারিতে যিনি ক্ষমতায় বসবেন তাকে করণীয় অনেক কিছুর মুখোমুখি হতে হবে। ভেঙ্গে পড়া একটি রাষ্ট্রকে গঠন করতে হবে।

সময়টা পাকিস্তানের জন্য একদমই নজিরবিহীন। রাগ, হতাশা, আশা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অচলাবস্থা, বিতর্ক সবকিছুই যেন জড়িয়ে আছে এই নির্বাচনের সাথে।

বিষয়:ইমরান খান নওয়াজ শরিফ পাকিস্তান পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…