আন্তর্জাতিক

গাজায় যুদ্ধবিরতির এক বছর পরে কেমন আছে গাজাবাসী?

গাজায় যুদ্ধবিরতির এক বছর পরে কেমন আছে গাজাবাসী?

ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত গাজা যুদ্ধবিরতির এক বছর পেরিয়েছে। তবে যুদ্ধ বন্ধ, ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও গাজার পুনর্গঠনসহ চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতিগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবায়িত হয়নি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, পুনর্গঠনের জন্য বিপুল অর্থ দেওয়ার ঘোষণা এলেও বাস্তবে সেই অর্থ পৌঁছানোর অগ্রগতি নেই।

জেরুজালেম থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার তিন দিন পর হামাস ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় আটক জীবিত ২০ ইসরাইলি জিম্মিকে মুক্তি দেয়। জিম্মিদের মুক্তি ছিল ইসরাইলের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। তাঁদের ভাগ্য নিয়ে দেশটির জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিন উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছিল।

যুদ্ধবিরতির বর্ষপূর্তি গাজা সীমান্ত থেকে ইসরাইলের এক বছর রকেট হামলামুক্ত থাকারও স্মারক। এ সময়ে হামাস কোনো রকেট হামলা চালায়নি। ইসরাইলের অবিরাম বোমাবর্ষণে হামাসের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিঃশেষ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে গাজার অধিকাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা ধ্বংস হয়ে গেছে।

যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য গাজার সীমান্তের কাছে বিদেশি মিত্রদের নিয়ে একটি কমান্ড পোস্ট স্থাপন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।

যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইল হামলার মাত্রা কমালেও প্রায় প্রতিদিনই গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় প্রায় ১ হাজার ৪৫০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ এ পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িত সবাইকে হত্যার অঙ্গীকার করেছেন। হামলার বর্ষপূর্তিতে তিনি বলেন, হামাসের ৬ হাজার যোদ্ধার মধ্যে চার হাজারকে হত্যা করা হয়েছে।

যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী, গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকায় ইসরাইলি সেনাদের অবস্থানের অনুমতি ছিল। তবে সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এক বছর পর ইসরাইলি বাহিনী গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।

চুক্তির দ্বিতীয় পর্যায়ে গাজায় হামাসের শাসন থেকে রাজনৈতিক উত্তরণের কথা ছিল। এ লক্ষ্যে নতুন গাজা প্রশাসনের জাতীয় কমিটির (এনসিএজি) প্রধান হিসেবে কারিগরি বিশেষজ্ঞ আলী শা’থকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

জুলাইয়ে হামাস ঘোষণা করে, তারা নিজেদের শাসন কাঠামো বিলুপ্ত করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট এনসিএজির কাছে গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তর করছে। তবে বাস্তবে গাজার নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ এখনো হামাসের হাতেই রয়েছে। অন্যদিকে, আলী শা’থও অনেকটা আড়ালে রয়েছেন।

জুলাইয়ে হামাস নতুন নেতা হিসেবে খলিল আল-হাইয়াকে নির্বাচিত করে। এর কিছুদিন পর সংগঠনটি জানায়, তারা অস্ত্র ত্যাগ করবে। ট্রাম্প এ ঘোষণাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানান।

তবে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের ঘোষণা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে ইসরাইল। নেতানিয়াহু প্রতিটি আগ্নেয়াস্ত্রসহ সব অস্ত্রের যাচাইযোগ্য নিরস্ত্রীকরণের দাবি জানিয়েছেন। এখন পর্যন্ত হামাস নিরস্ত্রীকরণের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অন্যদিকে, ইসরাইলও সেনা প্রত্যাহার শুরু করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

গাজার পুনর্গঠন ও যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নে ট্রাম্প ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি নতুন বৈশ্বিক সংস্থা গঠন করেন। এতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এবং বুলগেরীয় কূটনীতিক নিকোলাই ম্লাদেনভকে। ম্লাদেনভ ‘গাজার উচ্চ প্রতিনিধি’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জানুয়ারিতে ট্রাম্প তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন বোর্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্ররাও আরও অর্থ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তবে গাজার পুনর্গঠনে এসব প্রতিশ্রুত অর্থের কোনোটি পৌঁছেছে বলে জানা যায়নি।

সেপ্টেম্বরে বোর্ডের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর এক বৈঠকে গাজার পুনরুদ্ধারের জন্য ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পনাটি তৈরি করা হয়েছে।

যুদ্ধবিরতির এক বছর পরও গাজায় হামলা, সেনা প্রত্যাহার নিয়ে অচলাবস্থা, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং পুনর্গঠনের অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ফলে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষিত লক্ষ্য ও গাজার বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান এখনো স্পষ্ট।

বিষয়:ইসরাইল গাজায় যুদ্ধবিরতি ফিলিস্তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামাস

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…