মজিবুর রহমান স্মৃতি গ্রন্থাগার: বই পড়া, বৃত্তি ও সাংস্কৃতিক চর্চায় বদলাচ্ছে জনপদ

নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার সীমান্তঘেঁষা প্রত্যন্ত গ্রাম আগ্রাদিগুন। একসময় যে জনপদে পাঠাগারকেন্দ্রিক চর্চা ছিল সীমিত, সেখানে এখন বই পড়াকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন সামাজিক উদ্যোগ। আশেপাশের ৪২টি গ্রামের পাঠককে নিয়ে গঠিত হয়েছে বহু পাঠক দল। তাদের লক্ষ্য, নিয়মিত বই পড়া এবং অন্যদেরও বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলা। এই উদ্যোগের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ‘মজিবুর রহমান স্মৃতি গ্রন্থাগার’।
পরিবারের উদ্যোগে বাবার স্মৃতি ধরে রাখতে গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠা করেছেন আলমগীর কবির। তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক এবং গ্রিন ভয়েস বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা। তার উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই পাঠাগার এখন শুধু বই পড়ার জায়গা নয়, বরং স্থানীয় তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানচর্চা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে উঠছে।

গ্রন্থাগারকে ঘিরে পাঠক তৈরির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পার্শ্ববর্তী ৪২টি গ্রামের শিশু থেকে শুরু করে তরুণদের নিয়ে পাঠক দল গঠন করা হয়েছে। দলগুলোর সদস্যরা নিয়মিত গ্রন্থাগারে আসে এবং নিজেদের মধ্যে বই পড়ার চর্চা চালু রেখেছে। পাশাপাশি কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে অন্যদেরও তারা বই পড়ায় উৎসাহিত করছে। কবি-সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন এবং তাদের জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনার নানা কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে নিয়মিত।
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আলমগীর কবির জানান, শিক্ষার্থীদের পাঠাগারমুখী করতে উপজেলার ২৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এ আশাপাশের কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিয়মিত আয়োজন রয়েছে। প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট দিনে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গ্রন্থাগারে আনা হয়। তাদের জন্য শিক্ষণীয় ডকুমেন্টারি প্রদর্শন, বই পড়া, ছড়া-কবিতা, বিতর্ক ও গানসহ নানা আয়োজন থাকে। প্রথম দিকে আগ্রহ কম থাকলেও বর্তমানে আগ্রহ বাড়ছে। নিয়মিত পাঠকদের মধ্যে নানা প্রতিযোগিতার পরে মূল্যায়নের ভিত্তিতে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করা হয়। এসব আয়োজনের ব্যয় বহন করে আসছে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ।
মাঝে মাঝে শিক্ষণীয় সিনেমা ও তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়ে বলেও জানা পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা। শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক, পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে আগ্রহী করে তোলাও এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
গ্রন্থাগারের কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় সহায়তা দিচ্ছে মজিবুর রহমান ফাউন্ডেশন। গত কয়েক বছর ধরে উপজেলার বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও পাঠাগারটির উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। চকময়রাম সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খেলাল-ই-রব্বানী বলেন, গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে মহৎ উদ্যোগ। গ্রন্থাগার মনুষ্যত্ব বিকাশের অন্যতম মাধ্যম। মনুষ্যত্বের বিকাশের মধ্য দিয়েই মানুষ পূর্ণতা পায়।
আগ্রাদিগুন ইউনিয়নের প্রবীণ ব্যক্তি ও সাপাহার উপজেলার চৌধুরী চান মোহাম্মদ মহিলা ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. আব্দুল জলিল বলেন, মজিবুর রহমান গ্রন্থাগার নিজস্ব স্বকীয়তায় জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখবে। তার প্রত্যাশা, পাঠাগারটি মাদকমুক্ত, প্রতিহিংসামুক্ত ও ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গঠনে অবদান রাখবে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরাও এই উদ্যোগ দেখে বই পড়ায় আগ্রহী হবে।
পাঠাগারের গ্রন্থাগারিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রায়হান পারভেজ বলেন, গ্রামের নানা প্রতিকূলতার মধ্যে আমাদের কার্যক্রম চলছে। তবে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগ্রহ আমাদের কার্যক্রমে গতি নিয়ে আসছে প্রতিনিয়ত।
প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সময়ে গ্রামীণ জনপদে পাঠাগারকেন্দ্রিক এমন উদ্যোগের গুরুত্ব বাড়ছে। আগ্রাদিগুনের এই গ্রন্থাগারকে ঘিরে তাই শুধু বই পড়ার অভ্যাস নয়, নতুন পাঠক তৈরি, প্রজন্মের মধ্যে সংযোগ এবং সামাজিক বন্ধন গড়ারও চেষ্টা চলছে।





