আবারও অশান্ত মণিপুর: সহিংসতায় নিহত ৯, পুড়ল নাগা-কুকিদের ১৪ বাড়ি

ছবি: সংগৃহীত
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাত থেকে শনিবার (১০ অক্টোবর) পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় গোলাগুলি, হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের অন্তত ১৪টি বাড়ি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং। শান্তি ফেরাতে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি।
শুক্রবার রাতে কামজং জেলার চাসাদ গ্রামে ডমখোনেই তোথাং নামের এক কুকি নারী নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন করে সহিংসতার সূত্রপাত হয়।
পুলিশ জানায়, গ্রামের অবৈধ বাংকার উচ্ছেদে মণিপুর পুলিশ, ইন্ডিয়া রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন (আইআরবি) ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) যৌথ অভিযান চালায়। এ সময় স্থানীয় নারীরা অভিযানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিরা নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি চালালে বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান। এ সময় ডমখোনেই তোথাং নিহত হন।
এরপর শুক্রবার রাতেই বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের অন্তত ১৪টি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, চাসাদ গ্রামের স্বেচ্ছাসেবকদের গ্রেপ্তার ও আটকাদেশের প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলার সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে এসব ঘটনা ঘটে।
কুকি উইমেন ইউনিয়নের দাবি, ওই সময় গুলিতে ২৩ বছর বয়সী মাইকেল গামিনলেন হাওকিপ নিহত হন। সংগঠনটি এ হত্যাকাণ্ডের জন্য নাগা বিদ্রোহীদের দায়ী করেছে। তবে এ অভিযোগ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
শনিবার সকালেও রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা অব্যাহত থাকে। অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারীরা চাসাদ থানায় আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভোর ৫টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত সেখানে গোলাগুলি চলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কামজংয়ের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট থানার চারপাশের ৪০০ মিটার এলাকায় মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করেন।
কামজং জেলার নিংচৌ চিনডং গ্রামে আরেকটি হামলায় দুই নাগা গ্রামরক্ষক নিহত হন। তাঁরা হলেন গাচানসো নিংশেন (৩০) ও লেইশিশান হুঙিয়ো (৫০)। শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চাসাদ থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এ হামলার ঘটনা ঘটে। সরকারি সূত্রের ধারণা, সীমান্তের ওপার থেকে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এতে জড়িত থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে শনিবার ভোর ৫টার দিকে মাকুই গ্রামে হামলায় আরও তিন নাগা গ্রামরক্ষক নিহত হন বলে খবর পাওয়া যায়। তাঁরা হলেন মাচুংগাম্মাম, আজিনপৌ রিংকাংমাই ও রবার্ট। তাঁদের ওপর কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গ্রামবাসীর দাবি, নিহত আজিনপৌ রিংকাংমাইয়ের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। এ ঘটনার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই করা যায়নি। প্রতিবেদন লেখার সময়ও ওই এলাকায় গোলাগুলি চলছিল। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি বলে জানা গেছে।
এদিকে কাংপোকপি জেলার তাপোন গ্রামেও শনিবার সকাল ৬টার দিকে হামলা হয়। মাকুই গ্রামের কাছে ইম্ফল-তামেংলং সড়কে সন্দেহভাজন সশস্ত্র ব্যক্তিদের অতর্কিত হামলায় এক নাগা গ্রামস্বেচ্ছাসেবক নিহত হন। আহত হন আরও দুজন। নিহত মাচুংওয়াংবৌয়ের বয়স ৩৫ বছর। তিনি থালোন গ্রামের বাসিন্দা। আহত দুজন হলেন নাহাসন (২৯) ও মাথাংগামবৌ (৩০)। ওই এলাকায় দুপুর পর্যন্ত গোলাগুলি চলেছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে উখরুল জেলার কনজাং গ্রামের কাছে ২০২ নম্বর জাতীয় মহাসড়কে হামলায় সন্দীপ রাই (৩০) নামের এক যাত্রী নিহত হন। তিনি সেনাপতি জেলার তাফৌ সেনাপতি নেপালি গ্রামের বাসিন্দা। পুলিশ জানায়, শনিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে গাড়িতে করে যাওয়ার সময় অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাঁর ওপর হামলা চালান। তবে এ হামলার কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি।
এ পরিস্থিতির মধ্যে নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং। বৈঠকে তিনি মণিপুরে শান্তি ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন।
একাধিক এলাকায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও গোলাগুলির ঘটনায় মণিপুরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে।






