শিল্প সাহিত্য

লুৎফর রহমান রিটনের অনবদ্য ছড়ার বই ‘দাবায়া রাখতে পারবা না’

Bangladesh Liberation War poster with a man pointing and shouting. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

A Bengali poster depicting a man passionately speaking or shouting, symbolizing the Bangladesh Liberation War. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ

‘দাবায়া রাখতে পারবা না’ আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত ও সাহসী এক রুপময় আহবান। বঙ্গবন্ধুর যে আহবান এখনও আমাদের হৃদয়কে নিত্য আলোড়িত ও আন্দোলিত করে। যে আহবানের মাঝে আমরা খুঁজে পাই বাঙালি, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে ৭ই মার্চ যে ভাষণ দিয়েছিলেন সেই ভাষণকে আরও তেজদীপ্ত এবং নান্দনিক করেছিল ‘দাবায়া রাখতে পারবা না’ এই সাহসী উচ্চারণ।

বঙ্গবন্ধুর এই সাহসী উচ্চারণ নিয়েই প্রখ্যাত ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন ছড়ার বই লিখেছেন ‘দাবায়া রাখতে পারবা না’। এবারের বইমেলায় বইটি প্রকাশ করেছে ঝিঙেফুল প্রকাশনী। বইটির প্রচ্ছদ ও ছবি এঁকেছেন মাসুক হেলাল। মেলায় বইটির কাটতি ছিলো চোখে পড়ার মতো। সুন্দর, পরিচ্ছন্ন এবং আকর্ষণীয় এই বইটিতে মোট ছড়ার সংখ্যা একত্রিশটি।

এই বইটির প্রতিটি ছড়াতেই রয়েছে বাঙালি, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের সবেচেয়ে সত্য কথাগুলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে লুৎফর রহমান রিটন ছড়ার রঙ-তুলি দিয়ে সাজিয়েছেন। তবে এখানেই শেষ নয়, ছড়ার মাঝেই তিনি শেখ মুজিবকে নিয়ে অসত্য উচ্চারণ, ইতিহাস বিকৃতি, অবমাননা, শেখ মুজিবের প্রতি আক্রোশ, বিদ্ধেষ, বিরুপ মনোভাব এসবেরও প্রতিবাদ করেছেন। একইভাবে কথিত যারা মুজিব বন্দনায় ব্যস্ত, যারা মুজিবকে সামনে রেখে নিজের স্বার্থ গোছাতে হাসিল, যারা মুজিব পোশাক পরে কেবল ধন-সম্পদের পাহাড় বানিয়েছেন তাদেরকেও ছেড়ে কথা বলেননি।

ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটনের হ্নদয়জুড়ে রয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমান। ‘বঙ্গবন্ধু’ প্রশ্নে তিনি যে আপোষহীন তা ছড়াগুলো পড়লেই ভীষণ উপলব্ধি করা সম্ভব। বই-এর মুখবন্ধের এক স্থানে তিনি উচ্চারণ করেছেন, ‘ বাংলা-বাঙালি-বঙ্গবন্ধু-বাংলাদেশ-এই চার মূলমন্ত্রে বিশ্বাসী আমি আমার যাপিত জীবনে, চিন্তায় চেতনায় মননে ও মেধায় বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতির হিরক দ্যুতির অপরুপ অনুরণন অনুভব করি।’ আসলেই প্রতিটি শব্দে, বাক্যের উচ্চারণে প্রতিধ্বণিত হয় এসবই।

লুৎফর রহমান রিটন ছড়ার এক অনবদ্য জাদুকর। বরাবরই হাতখুলে লিখতে পারেন। এ পর্যন্ত অসংখ্য ছড়ার বই লিখেছেন। সব ধরনের ছড়া লেখায় তিনি ভীষণ সিদ্ধহস্ত। তবে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে ছড়া লেখায় তিনি নিঃসন্দেহে নতুনত্ব এনেছেন। বিশেষ করে আমাদের ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই, সম্প্রীতি। এসব বিচারে লুৎফর রহমান রিটনের লেখায় যেমন থাকে সত্যানুসন্ধান তেমনি থাকে ইতিহাসের নানা বাঁকের ঘটনা প্রবাহ। একই সাথে থাকে অল্প শব্দের বিনুনিতে নিঃখুঁত বিশ্লেষণ। একটি বড় রাজনৈতিক বা সামাজিক ইতিহাসকে তিনি মাত্র একটি ছড়ার মাঝেই দ্রুত ধারণ করে সুর, ছন্দে লিখে ফেলেন অনায়াসে। এখানেই লুৎফর রহমান রিটনের ছড়ার বড় এক বৈশিষ্ট্য বললে ভুল হবে না।

লুৎফর রহমান রিটনের ছড়া মানেই নতুন আকর্ষণ, নতুন চিন্তা আর নতুন এক স্বপ্নের আহ্বান। বরাবরই বাংলা ও বাঙালির তিনি এক অতন্দ্রপ্রহরী। এ বিষয়ে তিনি ভীষণ জেদী, একরোখা এবং আপোষহীনও বটে। বাংলা-বাঙালি-বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের পক্ষে তাঁর কলম থেমে থাকেনি। অনেকদিন ধরে তিনি কানাডাতে অবস্থান করলেও নিজের লেখা শত শত ছড়ার মাঝে দেশের প্রতি যে দায়, সে যুদ্ধ তা তিনি সচল রেখেছেন। এই বইয়ের বেশিরভাগ ছড়া লিখেছেন তিনি কানাডার অটোয়াতে বসে। অনেকদিন ধরে তিনি কানাডাতে থিতু হলেও বাংলাদেশ আর বঙ্গবন্ধুকে হ্নদয়ে ধারণ করে আছেন আগের মতোই শত বিশ্বাসে আর শত আবেগে। এই ছড়াগ্রন্থের ‘এই দেশ এই স্বাধীনতা’ ছড়ার শেষে তিনি লিখেছেন, সব পেয়েছি সব পেয়েছি শেখ মুজিবের তরে/ মুজিব নামের প্রেমের প্রদীপ জ্বলছে ঘরে ঘরে/ সোনার দেশে সোনামানিক একটি মুজিব ছিল/ এই দেশ এই স্বাধীনতা সে-ইতো এনে দিল। এই বইয়ের প্রতিটি ছড়াতেই আছে মুজিবের প্রতি লেখকের ভালোবাসার অনন্য স্ফূরণ এবং সত্য ইতিহাসের উন্মোচন।

‘দাবায়া রাখতে পারবা না’ বইয়ের ছড়াগুলো হলো- ‘ছবি শুধু ছবি নয়’ (পৃষ্ঠা ৯), এই দেশ এই স্বাধীনতা (পৃষ্ঠা ১০), সাতই মার্চের ভাষণ (পৃষ্ঠা ১১), যে সব বঙ্গেতে জন্ম হিংসে মুজিবরে (পৃষ্ঠা ১২), আবার আসিব এই বাংলায় (পৃষ্ঠা ১৪), পিতা-পুত্র সংলাপ (পৃষ্ঠা ১৬), তুমি সবখানে (পৃষ্ঠা ১৮), মুজিবের দৃশ্যানতা (পৃষ্ঠা ২০), মুজিব আমায় কী দিয়েছে জানো? (পৃষ্ঠা ২২),আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা (পৃষ্ঠা ২৩), স্বাধীনতা এমনি এমনি রেডিওতে এক ঘোষণায় হঠাৎ ক’রে আসে না (পৃষ্ঠা ২৫), বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ছড়া ( পৃষ্ঠা ২৭), সেদিন, ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ (পৃষ্ঠা ২৯), সেরা বন্ধু বঙ্গবন্ধু (পৃষ্ঠা ৩১), কানাডা এক সুইট কান্ট্রি লাইক পাটালি গুড় (পৃষ্ঠা ৩৩), তাঁকে পাবে তুমি (পৃষ্ঠা ৩৬), শেখ মুজিবুর ভালোবাসার বনস্পতির ছায়া (পৃষ্ঠা ৩৮), আপনি আমাদের ক্ষমা করবেন বঙ্গবন্ধু! (পৃষ্ঠা ৩৯), অবমাননার চিকিৎসা (পৃষ্ঠা ৪৩), লেকিন কিউ? বাঙ্গালীলোগ ক্যান্ পাকিস্তান ভাঙ্লা (পৃষ্ঠা ৪৪), চেনো তাঁকে জানো তাঁকে (পৃষ্ঠা ৪৬), সাতই মার্চের ভাষণে কী ছিলো? (পৃষ্ঠা ৪৮), ছাব্বিশে মার্চ এবং সাতাশে মার্চের গল্পটা (পৃষ্ঠা ৫০), স্বাধীনতা যুদ্ধটা ফুটবল খেলা না রে গাধা! (পৃষ্ঠা ৫৩), তোমাকে বলছি, হ্যাঁ তোমাকেই… (পৃষ্ঠা ৫৫), বঙ্গবন্ধু দেখছেন, বঙ্গবন্ধু শুনছেন (পৃষ্ঠা ৫৮), শতবর্ষ ও সুবর্ণজয়ন্তীর পঙ্ক্তিমালা বটমলেস বাস্কেটের গল্পটা (পৃষ্ঠা ৬১), ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ পড়ো নাই? (পৃষ্ঠা ৬৪), সত্যি তুমি শেখ মুজিবের লোক? (পৃষ্ঠা ৬৬), জয় বাংলা (পৃষ্ঠা ৬৮), জাতির পিতার খুনি নূর চৌধুরীর ভাষ্য রেসকোর্স ময়দান ১৯৭১ (পৃষ্ঠা ৭০)।

বিষয়:বঙ্গবন্ধু লুৎফর রহমান রিটন শেখ মুজিবুর রহমান

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…