শচীন থেকে মেসি: বিদায়ের সময় কিংবদন্তিদের স্মরণে মানুষের ভালোবাসার সেতুবন্ধন

শেষ বাঁশিটা বেজে যাওয়ার পর লিওনেল মেসি যেন মাঠ ছাড়তেই চাইছিলেন না। যে মাঠে কয়েক মিনিট আগেও তিনি ছিলেন বিশ্বের সেরা ফুটবলার, সেই মাঠে তখন তিনি সাবেক একজন, আবেগাপ্লুত এক মানুষ। কথাও বলছিলেন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। নিজেই যেন বুঝতে পারছিলেন, কথা শেষ হলেই শেষ হয়ে যাবে তার আর্জেন্টিনা অধ্যায়।
বুধবার ভোরের ম্যাচে বুয়েন্স আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারানোর ম্যাচ দিয়ে শেষ হয়েছে মেসির ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। নিজের ২০৮তম ও শেষ ম্যাচে গোল করেছেন, দুটি গোল করিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার শেষ হিসাব ১২৬ গোল। ৮৫ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে ম্যাচটিতে যতটা না ফুটবল ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল একটি দেশের পক্ষ থেকে তার সবচেয়ে বড় নায়কদের একজনকে ‘ধন্যবাদ’ বলার অনুষ্ঠান।
কিন্তু বিদায়ের মঞ্চে মেসি গোলের কথা দিয়ে শুরু করেননি। তার মাথায় প্রথম এসেছেন প্রয়াত বাবা। তারপর এসেছে আর্জেন্টিনার জার্সি, সতীর্থ এবং মানুষ। দুই দশকের বেশি সময় এই জার্সি পরতে পারাকে তিনি বলেছেন জীবনের বিরাট গর্ব। জানিয়েছেন, জাতীয় দলে আর ফিরে আসতে না পারার কষ্ট তার সঙ্গে থাকবে; সুযোগ থাকলে সারাজীবনই তিনি এই দলের কাছে ফিরে আসতে চাইতেন।
তিনি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কথা বলছিলেন, কারণ মুহূর্তটা শেষ হতে দিতে চাইছিলেন না। শেষে দর্শকদের উদ্দেশে তার কথার সারকথা ছিল ভালোবাসা, শূন্যতা ও কৃতজ্ঞতা: তিনি তাদের মিস করবেন এবং আর্জেন্টাইন হয়ে জন্মাতে পারাকে নিজের সৌভাগ্য মনে করেন।
এই জায়গাতেই মেসির সঙ্গে আশ্চর্যভাবে মিলে যান শচীন টেন্ডুলকার।
২০১৩ সালের ১৬ নভেম্বর, ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ২০০তম টেস্ট খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান শচীন। ২৪ বছরের ক্যারিয়ারে ১০০ আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি, ৩৪ হাজারের বেশি রান; সংখ্যার দিক থেকে তার বিদায়ী ভাষণ হতে পারত রেকর্ডের এক দীর্ঘ তালিকা। কিন্তু শচীন সেই পথে যাননি।
তিনি সঙ্গে করে একটি তালিকা নিয়ে এসেছিলেন: নিজের কীর্তির নয়, ধন্যবাদ দেয়ার মানুষদের নামের তালিকা। প্রথমেই প্রয়াত বাবা। বাবার কাছ থেকে তিনি শিখেছিলেন স্বপ্নের পেছনে ছুটতে, কিন্তু শর্টকাট না নিতে; সবচেয়ে বড় কথা, ভালো মানুষ হতে। এরপর মা, ভাইবোন, স্ত্রী, সন্তান, কোচ, বন্ধু, সতীর্থ, চিকিৎসক; এভাবে যেন নিজের সাফল্যের মালিকানা একটু একটু করে অন্যদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন তিনি। তারপর এলেন সাধারণ মানুষের কাছে।
শচীন বলেছিলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ এসে তাকে সমর্থন করেছেন; তিনি শূন্য করুন কিংবা একশ। কেউ তার জন্য প্রার্থনা করেছেন, কেউ উপবাস পর্যন্ত করেছেন। শেষপর্যন্ত তার কাছে সবচেয়ে স্থায়ী স্মৃতি হয়ে থেকে গেল গ্যালারির সেই ডাক: ‘শচীন, শচীন’। তিনি বলেছিলেন, সেই ধ্বনি তার কানে আজীবন বাজবে।
এখানেই কিংবদন্তিদের বিদায়ী ভাষণের সবচেয়ে বড় মিলটা ধরা পড়ে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তাদের পরিচয় তৈরি হয় অসাধারণত্ব দিয়ে; কিন্তু বিদায়ের দিনে তারা নিজেদের অসাধারণত্বের গল্প বলেন না। তারা বরং মনে করিয়ে দেন, কোন অসাধারণ ক্যারিয়ারই একা তৈরি হয় না।
শ্রীলঙ্কার কুমার সাঙ্গাকারার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের ভাষণেও ছিল একই সুর। ২০১৫ সালে কলম্বোয় ভারতের বিপক্ষে শেষ টেস্টের পর তিনি স্কুল, কোচ, সতীর্থ, পরিবার; সবাইকে স্মরণ করেছিলেন। আবেগ সামলাতে পারেননি বাবা-মায়ের কথা বলতে গিয়ে। তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন কী? বিশ্বকাপ, সেঞ্চুরি, নাকি অন্যকিছু? সাঙ্গাকারার কাছে সেদিন সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল গ্যালারির দিকে তাকিয়ে পরিবার ও দীর্ঘদিনের বন্ধুদের উপস্থিতি দেখা এবং এই নিশ্চয়তা পাওয়া যে জয়-পরাজয়ের বাইরে তাদের ভালোবাসা থাকবে। শ্রীলঙ্কার সমর্থকদের প্রতিও তার কৃতজ্ঞতা ছিল খুব সরল: তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারাটা তার জন্য ছিল আনন্দ ও সম্মানের।
অর্থাৎ, শেষপর্যন্ত স্কোরবোর্ড মুছে যায়, মানুষ থেকে যায়।
মহেন্দ্র সিং ধোনির বিদায় আবার ছিল একেবারেই অন্য ধরনের। কোন ভর্তি স্টেডিয়াম নেই, মাইক্রোফোন হাতে দীর্ঘ বক্তৃতা নেই। ২০২০ সালের ১৫ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকটি শব্দেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সরে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত বার্তাতেও প্রথম কথা ছিল সমর্থকদের নিয়ে: তাদের ভালোবাসা ও সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ।
ধোনির বিদায় তাই দেখায়, ভাষণের দৈর্ঘ্য নয়, বিদায়ের অভিধানটাই আসল। মেসির কয়েক মিনিটের আবেগ, শচীনের দীর্ঘ ধন্যবাদজ্ঞাপন কিংবা ধোনির কয়েকটি শব্দ; তিন জায়গাতেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ‘আমি’ নয়, ‘তোমরা’।
সম্ভবত এ কারণেই খেলাধুলার কিংবদন্তির সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক অন্য অনেক তারকার সম্পর্কের চেয়ে আলাদা। দর্শকের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত পরিচয় নেই, কিন্তু দর্শকের জীবনের সঙ্গে তাদের গভীর পরিচয় তৈরি হয়ে যায়।
কেউ স্কুল থেকে ফিরে টেলিভিশন খুলে মেসিকে দেখেছে। কারও বাবা তাকে প্রথম শচীনের ব্যাটিং দেখিয়েছেন। কেউ সাঙ্গাকারার খেলা দেখতে রাত জেগেছে। কেউ ধোনির ছক্কায় বিশ্বকাপ জয়ের মুহূর্তে রাস্তায় নেমেছে। একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার তাই শুধু তার নিজের সময় নয়, লক্ষ-কোটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেরও সময়রেখা।
মেসির ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার এই সম্পর্ক আরও গভীর। একসময় নিজের দেশেই তাকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল: বার্সেলোনার মেসি কেন আর্জেন্টিনার মেসি হয়ে উঠতে পারছেন না, তার মধ্যে ম্যারাডোনার মতো আবেগ আছে কিনা। ২০১৬ সালে টানা ফাইনাল হারের পর তিনি সাময়িকভাবে জাতীয় দল থেকে সরেও গিয়েছিলেন। তারপর ২০২১ কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ বিশ্বকাপ বদলে দেয় সম্পর্কের ভাষা। সন্দেহ পরিণত হয় প্রায় নিঃশর্ত ভালোবাসায়।
আর এই জায়গায় ‘সাধারণ মানুষ’ শুধু দর্শক নয়।
আর্জেন্টিনায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কঠিন সময়েও ফুটবল, বিশেষ করে মেসি, অনেক মানুষের জন্য কিছুক্ষণের আনন্দ ও স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছেন। এপিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সমর্থক ও গবেষকরা সেই কথাই বলেছেন। একজন ৭০ বছর বয়সী কিয়স্ক মালিকের স্মৃতিতে, ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ ছিল শুধু একজন ফুটবলারের জয় নয়; সবাই একসঙ্গে রাস্তায় নেমে আনন্দ করার বিরল এক মুহূর্ত।
এ কারণেই হয়তো কোন কিংবদন্তির বিদায়কে শুধু খেলোয়াড়ের অবসর বলা যায় না। সেখানে দর্শকেরও কিছু একটা শেষ হয়।
শচীনের অবসরের দিনে অনেক ভারতীয় বুঝেছিলেন, তাদের শৈশব-যৌবনের একটি অংশও বিদায় নিচ্ছে। মেসির বিদায়ে আর্জেন্টিনার একটি প্রজন্ম একই অনুভূতির মুখোমুখি। যে কিশোর মেসির প্রথম বিশ্বকাপ দেখেছিল, সে এখন মধ্যবয়সের কাছাকাছি। যে শিশু বাবার হাত ধরে মেসির জার্সি কিনেছিল, আজ হয়তো নিজের সন্তানকে নিয়ে তার শেষ ম্যাচ দেখেছে।
তাই কিংবদন্তিদের বিদায়ী ভাষণে বারবার পরিবার আসে। বাবা-মা আসেন। কোচ আসেন। সতীর্থ আসেন। সাধারণ সমর্থক আসেন। কিন্তু আশ্চর্যভাবে ট্রফি আসে অনেক পরে।
কারণ ক্যারিয়ারের মাঝখানে একজন খেলোয়াড় নিজের অর্জনের দিকে তাকান সামনে থেকে; পরের ম্যাচ, পরের গোল, পরের সেঞ্চুরি, পরের ট্রফি। বিদায়ের দিনে তিনি প্রথমবার পুরো পথটাকে পেছন থেকে দেখেন। তখন বোঝা যায়, যাকে আমরা একজনের সাফল্য বলি, সেখানে আসলে অসংখ্য মানুষের হাতের ছাপ।
মেসির শেষ রাত তাই তার ১২৬তম আন্তর্জাতিক গোলের রাত হয়েও শুধু গোলের রাত নয়। শচীনের শেষ দিন ২০০তম টেস্টের দিন হয়েও শুধু ক্রিকেটের দিন নয়। সাঙ্গাকারার বিদায় তার পরিসংখ্যানের সমাপ্তি নয়। ধোনির ছোট্ট অবসরবার্তাও নিছক একটা ঘোষণা নয়।
এসব আসলে কৃতজ্ঞতার দলিল।
খেলোয়াড়রা ক্যারিয়ারজুড়ে সাধারণ মানুষকে আনন্দ দেন। এটাই আমরা দেখি। বিদায়ের দিনে তারা যেন উল্টো কথাটাই বলেন: সেই সাধারণ মানুষও তাদের কিছু দিয়েছেন। চাপের সময়ে সাহস, পরাজয়ের পরে ফিরে আসার কারণ, আর এমন এক ভালোবাসা; যার কোন পরিসংখ্যান নেই।
মনুমেন্টালে শেষবারের মতো দাঁড়িয়ে মেসি তাই হয়তো ক্যারিয়ারের সবচেয়ে মানবিক কথাটিই বলেছেন: তিনি যেতে চান না।
কিংবদন্তিদের শেষ ভাষণ শুনলে বোঝা যায়, শেষ পর্যন্ত তারাও আমাদের মতোই। প্রিয় জায়গা ছেড়ে যেতে তাদেরও কষ্ট হয়। প্রিয় মানুষকে তারা ধন্যবাদ দিতে চান। চলে যাওয়ার মুহূর্তটা আর একটু দীর্ঘ করতে চান।
এবং, তখনই সম্ভবত একজন মহান খেলোয়াড় তার সবচেয়ে বড় জয়টি পান। স্কোরকার্ডে নয়, মানুষের স্মৃতিতে।






