মানুষের হক নষ্ট করলে শুধু তওবা করলেই কি যথেষ্ট? ইসলামে কী বলা হয়েছে?

ছবিঃ সংগৃহীত
মানুষের জীবনে ইবাদতের গুরুত্ব অপরিসীম। নামাজ, রোজা, জাকাত ও দান-সদকার মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ইসলামে শুধু আল্লাহর হক আদায় করাই নয়, মানুষের অধিকার রক্ষা করাকেও অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ একজন মানুষ নিয়মিত নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন কিংবা দান করেন—কিন্তু একই সঙ্গে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করেন, কারও পাওনা আটকে রাখেন, কাউকে অপমান করেন কিংবা মিথ্যা অপবাদ দেন, তাহলে তাঁর ইবাদতের পাশাপাশি এসব অন্যায়ের জবাবদিহিও করতে হবে।
ইসলামে মানুষের অধিকার ও প্রাপ্যকে বলা হয় ‘হক্কুল ইবাদ’। অর্থাৎ একজন মানুষের প্রতি অন্য মানুষের যে দায়িত্ব ও অধিকার রয়েছে, তা যথাযথভাবে পালন করা। কারও টাকা ধার নিয়ে ফেরত না দেওয়া, কর্মচারীর ন্যায্য পারিশ্রমিক আটকে রাখা, অন্যের সম্পত্তি দখল করা, কারও সম্মানহানি করা কিংবা কারও অনুপস্থিতিতে তাঁর নামে মিথ্যা কথা বলা—এসবই মানুষের হক নষ্ট করার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। অনেক সময় মানুষ এসব বিষয়কে ছোটখাটো ভুল মনে করেন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে প্রকৃত নিঃস্ব ব্যক্তির পরিচয় দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমরা কি জানো, নিঃস্ব কে?’ সাহাবিরা বলেন, আমাদের মধ্যে যার কোনো অর্থ-সম্পদ নেই, সেই নিঃস্ব। তখন তিনি বলেন, তাঁর উম্মতের প্রকৃত নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে। কিন্তু দুনিয়ায় সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ ভোগ করেছে, কাউকে আঘাত করেছে কিংবা কারও রক্তপাত ঘটিয়েছে। ফলে তার নেকি থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রাপ্য পরিশোধ করা হবে। নেকি শেষ হয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮১)।
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মানুষের সঙ্গে অন্যায় আচরণের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। দুনিয়ায় একজন মানুষ হয়তো নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়েছেন, কিন্তু যার অধিকার নষ্ট করেছেন, তাঁর পাওনা ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষতি পূরণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের অধিকার শুধু মুখে ক্ষমা চেয়ে শেষ হয়ে যায় না। কারও সম্পদ নিয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে, কারও পাওনা আটকে রাখলে পরিশোধ করতে হবে এবং কারও সম্মানহানি করলে যথাসম্ভব সেই অন্যায় সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।
পবিত্র কোরআনেও মানুষের অধিকার রক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সুরা নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচার করবে।’ এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আমানত রক্ষা ও ন্যায়বিচার করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
এ ছাড়া সুরা হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে অন্যের প্রতি সন্দেহ, গোপন বিষয় অনুসন্ধান এবং গিবত বা পরনিন্দা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের সম্মান রক্ষা করাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আমরা অনেক সময় রাগের মাথায় কাউকে অপমান করি, বন্ধুমহলে অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে ছোট করে মন্তব্য করি। এসব আচরণও অন্যের অধিকার ও সম্মানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে মানুষের হক নষ্ট হয়ে গেলে হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ইসলামে তওবার দরজা খোলা রয়েছে। কেউ নিজের ভুল বুঝতে পারলে আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হতে হবে, অন্যায় কাজ বন্ধ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। পাশাপাশি কারও সম্পদ বা পাওনা নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে কিংবা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কারও প্রতি অন্যায় আচরণ করে থাকলে যথাসম্ভব ক্ষমা চেয়ে সম্পর্ক ও ক্ষতি সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।
সবশেষে মনে রাখা জরুরি, ভালো মানুষ হওয়ার পরিচয় শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, সহকর্মী, আত্মীয়স্বজন কিংবা অপরিচিত মানুষ সবার অধিকার ও সম্মান রক্ষা করাও একজন মুসলমানের দায়িত্ব। কারণ ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ, ন্যায়বিচার ও আমানতদারিতাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তাই প্রতিদিন নিজের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন আমার কোনো কথা, কাজ কিংবা আচরণে অজান্তেই অন্য কারও অধিকার নষ্ট হচ্ছে না তো?





