যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে কীভাবে প্রভাবিত হতে পারে ভারতের শেয়ারবাজার

ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি, ইরান সংঘাত এবং জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ভারতের শেয়ারবাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনের সম্ভাব্য তিনটি ফলাফল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।
চলতি বছর ভারতের শেয়ারবাজারে বেশ অস্থিরতা দেখা গেছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, অপরিশোধিত তেলের দাম ও বন্ডের সুদহার বৃদ্ধি এবং বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (এফআইআই) ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ তুলে নেওয়ায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সেনসেক্স ও নিফটি সূচক সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের দিকে নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা। তাদের ধারণা, নির্বাচনের ফলাফল থেকে মার্কিন বাণিজ্যনীতি, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক পুঁজিপ্রবাহের সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।
তবে ভারতের জন্য বড় ঝুঁকি হতে পারে ইরান সংঘাত। নতুন করে উত্তেজনা বাড়লে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে। এতে ভারতের আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি রুপির বিনিময়মূল্য ও শেয়ারবাজারের ওপর চাপ তৈরি হবে।
বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমকে রিসার্চ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি এবং ভারতের বাজারে এর প্রভাব তুলে ধরেছে।
এমকে রিসার্চের হিসাবে, এ পরিস্থিতির সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্পের শুল্কনীতির ওপর নজরদারি ও তদন্ত বাড়াতে পারেন। তবে এতে বিদ্যমান শুল্ককাঠামো দ্রুত পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।
অভিবাসননীতিতেও ট্রাম্প প্রশাসন চাপের মুখে পড়তে পারে। ডেমোক্র্যাটরা অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসের অর্থায়ন সীমিত করার উদ্যোগ নিতে পারেন। দক্ষ কর্মীদের অভিবাসনের বাধা কমানোর দাবিও উঠতে পারে।
তবে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও পররাষ্ট্রনীতিতে ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা যথেষ্ট থাকবে। ফলে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সংঘাত তীব্র হলে তেলের দাম বাড়বে, যা ভারতের আমদানি ব্যয় ও রুপির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের দুই কক্ষ ভিন্ন দলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ফলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও আইনগত কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের কর্মকাণ্ড তদন্ত এবং সরকারি ব্যয়ের ওপর নজরদারির সুযোগ পাবেন।
তবে শুল্কনীতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। পররাষ্ট্রনীতিতেও ট্রাম্পের ক্ষমতা পুরোপুরি সীমিত করা কঠিন হবে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকতে পারে।
দুই দলের মধ্যে বাজেট ও নীতিগত বিরোধ বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি কার্যক্রম বন্ধ বা শাটডাউনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। আইসিআইসিআই গ্লোবাল মার্কেটসের সতর্কতা, এ ধরনের অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প তার নীতিগত কর্মসূচি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা পাবেন। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষ রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকলে অভিবাসনসহ বিভিন্ন নীতিতে তার বিরোধিতা কম হতে পারে।
এমকে রিসার্চের মতে, এ পরিস্থিতিতে ইরান সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এতে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
তেলের দাম বাড়লে ভারতের আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বাড়বে। একই সঙ্গে রুপির ওপর চাপ তৈরি হবে এবং জ্বালানিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এতে দেশটির শেয়ারবাজারের ওপর চাপ আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর নিশ্চয়তা নেই। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ নীতি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। তবে তাতে তার বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতির তাৎক্ষণিক পরিবর্তন নিশ্চিত নয়।
ভারতের শেয়ারবাজারে প্রভাবের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে অপরিশোধিত তেলের দাম, মার্কিন ডলারের অবস্থান, বন্ডের সুদহার এবং উদীয়মান বাজারে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ।
এনডিটিভিকে জ্যেষ্ঠ অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ সোহম ব্যানার্জি বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল কোম্পানিগুলোর সম্ভাব্য আয় ও মূলধনের ব্যয় নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা বদলে দিতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে শেয়ারবাজারে।
তার মতে, নির্বাচনের ফলাফল বাণিজ্যনীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা, সরকারি ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি এবং আন্তর্জাতিক পুঁজিপ্রবাহেও প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বৈশ্বিক তারল্য পরিস্থিতি ও অন্যান্য বাজারের তুলনায় ভারতের বিনিয়োগ সম্ভাবনা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন হয় না। ভোটাররা কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের সদস্য নির্বাচন করেন।
এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের মেয়াদের পরবর্তী দুই বছর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হয়। আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় অনুমোদন এবং নির্বাহী বিভাগের কর্মকাণ্ড তদারকির দায়িত্ব কংগ্রেসের।
বর্তমানে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষ নিয়ন্ত্রণ করছে। ডেমোক্র্যাটরা শুধু প্রতিনিধি পরিষদে জয়ী হলেও বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ ও তদন্তের ক্ষমতা পাবেন। আর দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে আইন প্রণয়ন ও সরকারি ব্যয়সহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের প্রভাব বাড়বে।
এ কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড ও জনপ্রিয়তার ওপর এক ধরনের গণভোট হিসেবেও দেখা হয়।






