অফিসের কাজে ফাঁকি দিলে কি বেতন হালাল হবে? ইসলামে কী বলা হয়েছে?

ছবি: সংগৃহীত
মাস শেষে নির্দিষ্ট সময়ে বেতন পাওয়া একজন চাকরিজীবীর অধিকার। তবে সেই বেতনের বিনিময়ে নির্ধারিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করাও তার কর্তব্য। অফিসের সময় ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করা, ইচ্ছাকৃতভাবে কাজ ফেলে রাখা কিংবা দায়িত্বে অবহেলা করা এসব বিষয় শুধু কর্মক্ষেত্রের অনিয়ম নয়, ইসলামের দৃষ্টিতেও আমানত ও দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ইসলামে উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ চাকরি করে যে বেতন পান, তা মূলত তার নির্ধারিত কাজ, সময় ও দায়িত্বের বিনিময়। তাই চাকরির শর্ত মেনে দায়িত্ব পালন করা জরুরি। নিয়োগকর্তা যে কাজের জন্য বেতন দিচ্ছেন, সেই কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে না করে বেতন গ্রহণ করা নৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা হলে ভিন্ন কথা।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত ২৯)।
এই আয়াতের শিক্ষা হলো, অন্যের সম্পদ গ্রহণের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত অধিকার ও পারস্পরিক চুক্তির প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। চাকরির ক্ষেত্রেও নিয়োগকর্তা ও কর্মীর মধ্যে একটি চুক্তি থাকে। কর্মী নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করবেন এবং বিনিময়ে বেতন পাবেন।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমানরা তাদের শর্তাবলি মেনে চলতে বাধ্য।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৯৪)। অর্থাৎ বৈধভাবে করা চুক্তি ও শর্ত পূরণ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
অফিসের দায়িত্বে অবহেলা বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে। যেমন, অফিসের নির্ধারিত সময়ে ব্যক্তিগত কাজে দীর্ঘ সময় ব্যয় করা, ইচ্ছাকৃতভাবে কাজ ফেলে রেখে সময় পার করা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজ অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, কাজ না করেও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো কিংবা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করা। এসব আচরণ কর্মক্ষেত্রে সততা ও আমানতদারির পরিপন্থী।
তবে এখানে একটি বিষয় বোঝা জরুরি। কাজের ফাঁকে বিশ্রাম নেওয়া, নামাজ আদায় করা, খাবার খাওয়া কিংবা অনুমোদিত বিরতি নেওয়া দায়িত্বে অবহেলা নয়। আবার কোনো কর্মী যথাসাধ্য চেষ্টা করার পরও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারলে সেটিও ইচ্ছাকৃত ফাঁকির সমান নয়।
তাহলে অফিসের কাজে ফাঁকি দিলে বেতন হারাম হয়ে যায় কি? এ বিষয়ে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি হলো, কোনো কর্মী যদি জেনেশুনে নিজের দায়িত্ব পালন না করেন, অথচ কাজের বিনিময়ে পাওয়া বেতন গ্রহণ করেন, তাহলে তিনি আমানতের খেয়ানত করছেন। তবে অফিসে একদিন কাজ কম হয়েছে কিংবা কোনো অনিবার্য কারণে কাজ শেষ করা যায়নি এ কারণে পুরো মাসের বেতনকে সরাসরি হারাম বলা ঠিক নয়। বিষয়টি নির্ভর করে চাকরির চুক্তি, দায়িত্ব, কাজের সময় এবং অবহেলার ধরন অনুযায়ী।
কেউ যদি নিয়মিত দায়িত্বে অবহেলা করে থাকেন, তাহলে তার উচিত নিজের ভুল সংশোধন করা, কাজের প্রতি আন্তরিক হওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে চলা। অন্যায়ভাবে কোনো অর্থ গ্রহণ করে থাকলে কীভাবে তা সংশোধন করতে হবে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।’ (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত ১)। এই নির্দেশনা বৈধ চুক্তি ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
অফিসের চাকরি শুধু মাস শেষে বেতন পাওয়ার মাধ্যম নয়; এটি একটি আমানত ও দায়িত্বের বিষয়। একজন কর্মী তার প্রতিষ্ঠানের কাছে যেমন ন্যায্য বেতন প্রত্যাশা করেন, তেমনি প্রতিষ্ঠানেরও প্রত্যাশা থাকে কর্মী তাঁর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন। তাই হালাল উপার্জনের জন্য শুধু কত টাকা আয় করছি, তা নয়, কীভাবে সেই অর্থ উপার্জন করছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অফিসের দায়িত্বকে আমানত মনে করে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করাই একজন মুসলমানের কর্তব্য।






