মতামত

দুর্নীতি কি ব্যক্তির পাপ, নাকি রাষ্ট্রের চরিত্র?

যে ব্যবস্থায় সততা বোকামি, আর লুণ্ঠন যোগ্যতা

দুর্নীতি কি ব্যক্তির পাপ, নাকি রাষ্ট্রের চরিত্র?

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে কথা বলার একটা সুবিধা আছে। এ বিষয়ে কথা বলতে কাউকে খুব বেশি ভাবতে হয় না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দু-চারটি গরম কথা বলুন, কয়েকজন দুর্নীতিবাজের নাম উল্লেখ করুন, রাষ্ট্রের নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলুন—ব্যস, আপনি সুশীল, সচেতন, দেশপ্রেমিক। কিন্তু গোলমাল বাধে তখনই, যখন প্রশ্ন ওঠে, দুর্নীতিবাজ তৈরি করছে কে? যে রাষ্ট্র প্রতিদিন দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, সেই রাষ্ট্রেরই অন্দরমহলে দুর্নীতি এত নিরাপদ আশ্রয় পায় কী করে? যে সমাজ অসৎ মানুষকে ঘৃণা করার কথা, সেই সমাজে অসৎ মানুষের সম্পদ, প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা দেখে মানুষের চোখ চকচক করে কেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের পরিচিত নৈতিকতার দোকান বন্ধ হয়ে যায়। কারণ আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে যতটা সোচ্চার, দুর্নীতির সুবিধাভোগী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ততটাই নীরব। আমরা দুর্নীতিবাজের বিচার চাই, কিন্তু দুর্নীতিকে সম্ভব করে তোলে যে ক্ষমতার কাঠামো, তার বিচার চাই না। আমরা চোরের হাত কাটতে প্রস্তুত, কিন্তু যে ঘরটি চুরির জন্য তৈরি, তার নকশা পরীক্ষা করতে রাজি নই।

এইখানেই বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী কথাবার্তার সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি।

দুর্নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়

একজন সরকারি কর্মচারী ঘুষ নিলেন। একজন জনপ্রতিনিধি সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করলেন। একজন ব্যবসায়ী প্রভাব খাটিয়ে অন্যায় সুবিধা আদায় করলেন। আমরা বললাম, এরা অসৎ। কথাটি মিথ্যা নয়। কিন্তু কথাটি অসম্পূর্ণ। কারণ ব্যক্তির অসততা আর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এক জিনিস নয়।

একজন মানুষ অন্যায় করতে পারেন নিজের লোভে; কিন্তু হাজার হাজার মানুষ যখন একই ধরনের অন্যায়ের সুযোগ পায়, তখন শুধু ব্যক্তির চরিত্র নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। তখন দেখতে হবে, অন্যায়ের পথটি কে খুলে রেখেছে, পাহারাদারকে কে ঘুম পাড়িয়েছে, বিচারককে কে ভয় দেখাচ্ছে, আর অপরাধের লাভের ভাগ কার কার পকেটে যাচ্ছে।

একটি রাষ্ট্রের চরিত্র বোঝা যায় তার সংবিধানে কী লেখা আছে, শুধু তা দিয়ে নয়; বরং তার ক্ষমতাবান নাগরিকেরা কী করতে পারেন এবং সাধারণ নাগরিকেরা কী করতে পারেন না, তা দিয়ে। সাধারণ মানুষ সামান্য নিয়ম ভাঙলে আইনের মুখোমুখি হন, আর ক্ষমতাবান ব্যক্তি বিপুল অনিয়মের অভিযোগ নিয়েও নির্বিকার জীবন কাটান—তখন বুঝতে হবে, রাষ্ট্রের আইনে সমতা থাকলেও রাষ্ট্রের বাস্তবতায় সমতা নেই।

আইনের বইয়ে সবাই সমান, কিন্তু বাস্তবের আদালতে কারও পরিচয় তার ঢাল, কারও পরিচয় তার অপরাধ। এই বৈষম্যই দুর্নীতির সবচেয়ে উর্বর জমি।

সততা যখন নির্বুদ্ধিতা

বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিকের জীবন থেকে দুর্নীতির অর্থ বুঝতে খুব বেশি গবেষণার প্রয়োজন নেই। একটি সরকারি সেবা নিতে গিয়ে তাকে যদি বারবার দপ্তরে যেতে হয়, একটি ফাইল এগিয়ে নিতে যদি তাকে মধ্যস্বত্বভোগীর দ্বারস্থ হতে হয়, বৈধ অধিকার পেতে যদি তাকে অবৈধ অর্থ দিতে হয়, তাহলে রাষ্ট্র তার নাগরিককে কী শিক্ষা দিচ্ছে?

রাষ্ট্র যেন বলছে, আইন মেনে চলুন, তবে আইন মেনে চলার জন্য আপনাকে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হবে। নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন, কিন্তু নিয়মের দরজা খুলতে হলে নিয়মবহির্ভূত পথে হাঁটুন। সততার চর্চা করুন, তবে সততার কারণে আপনার কাজ আটকে গেলে তার দায় আপনাকেই নিতে হবে।

এ এক অদ্ভুত রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা! এখানে দুর্নীতি নিষিদ্ধ, কিন্তু দুর্নীতির প্রয়োজনীয়তা অনেক ক্ষেত্রে দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ। ঘুষ নেওয়া অপরাধ, অথচ ঘুষ ছাড়া কাজ না হওয়ার অভিযোগ নাগরিকের মুখে মুখে। সরকারি সেবা নাগরিকের অধিকার, কিন্তু সেই অধিকার আদায় করতে গিয়ে নাগরিককেই অপরাধের ব্যবস্থায় অংশ নিতে বাধ্য করা হয়।

এই ব্যবস্থায় সৎ মানুষ শুধু অসুবিধায় পড়েন না; অনেক সময় তাঁকে নির্বোধ বলেও বিবেচনা করা হয়। আর অসৎ মানুষকে বলা হয় চালাক, বাস্তববাদী, যোগাযোগসম্পন্ন। যে সমাজে নৈতিকতার চেয়ে কৌশলের দাম বেশি, সেখানে দুর্নীতিবাজের জন্মকে নিছক ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। সমাজ নিজেই তখন অসততার জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করে।

রাজনীতি: জনসেবার প্রতিষ্ঠান, নাকি সুবিধা বণ্টনের কারখানা?

গণতন্ত্রে রাজনীতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। কিন্তু রাজনীতি যখন ক্ষমতা দখল, সম্পদ বণ্টন এবং অনুগতদের পুরস্কৃত করার ব্যবস্থায় পরিণত হয়, তখন জনগণ রাষ্ট্রের মালিক থাকে কাগজে; বাস্তবে তারা হয়ে পড়ে ক্ষমতাবানদের অনুগ্রহপ্রার্থী।

রাজনীতির সঙ্গে ব্যবসার সম্পর্ক থাকতেই পারে, প্রশাসনের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু যখন রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে অন্যায় সুবিধা দেওয়া হয়, সরকারি সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, কিংবা নিয়োগ ও প্রকল্প বণ্টনে যোগ্যতার বদলে পরিচয় গুরুত্ব পায়, তখন রাষ্ট্রের জনকল্যাণমূলক চরিত্র ক্ষয়ে যায়।

ক্ষমতাসীন দল বদলাতে পারে, মন্ত্রীর মুখ বদলাতে পারে, স্লোগানের ভাষা বদলাতে পারে। কিন্তু যদি একইভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার চলতে থাকে, তাহলে পরিবর্তনটি কতখানি গভীর? পুরোনো সুবিধাভোগীর জায়গায় নতুন সুবিধাভোগী বসানোকে রাষ্ট্রসংস্কার বলা যায় না। লুটেরার পোশাক বদলালে লুণ্ঠনের প্রকৃতি বদলায় না।

বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে আজ তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন থাকা উচিত: ক্ষমতায় গিয়ে কে কতটা সম্পদ অর্জন করল, সেটি কি সাফল্যের মাপকাঠি হবে, নাকি ক্ষমতায় থেকে কে কতটা জবাবদিহির মধ্যে থাকল, সেটিই হবে রাজনৈতিক সততার পরীক্ষা?

রাজনীতিবিদকে দেবতা বানানো বিপজ্জনক, আবার কেবল শত্রু বানিয়েও সমস্যার সমাধান হয় না। তাকে নাগরিকের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে হবে—যিনি ক্ষমতা পেয়েছেন দায়িত্ব পালনের জন্য, ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি নির্মাণের জন্য নয়। তার সম্পদ, সিদ্ধান্ত, স্বার্থের সংঘাত এবং জনসম্পদের ব্যবহারের প্রশ্নে নাগরিকের জবাব চাওয়ার অধিকার থাকতে হবে।

যে রাজনীতি প্রশ্ন সহ্য করতে পারে না, সে রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জবাবদিহিকেও সহ্য করতে পারে না।

দুর্নীতি দমন, নাকি দুর্নীতির রাজনৈতিক ব্যবহার?

দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান প্রয়োজন। অপরাধের তদন্ত, সম্পদ বিবরণী যাচাই, অবৈধ সম্পদ শনাক্তকরণ, অর্থ পাচারের অনুসন্ধান এবং দোষীদের বিচার—এসব ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কিন্তু অভিযানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিযানের নীতি। আইন যদি দুর্বল ও শক্তিশালীর জন্য ভিন্নভাবে প্রয়োগ হয়, যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ দ্রুত তদন্ত হয় অথচ মিত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তাহলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানও মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে না।

দুর্নীতি দমন কমিশন কিংবা অন্য কোনো তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে হলে শুধু জনবল, বাজেট ও আইন দিলেই চলবে না; দিতে হবে স্বাধীনভাবে কাজ করার বাস্তব সুযোগ। অভিযোগের উৎস রাজনৈতিক না ব্যক্তিগত, অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্ষমতাবান না সাধারণ—এসব বিবেচনায় তদন্তের মান বদলে গেলে প্রতিষ্ঠান তার নৈতিক কর্তৃত্ব হারায়।

একটি সভ্য রাষ্ট্রে অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় তদন্তের বাধা হতে পারে না, আবার রাজনৈতিক বিরোধিতাও অপরাধের প্রমাণ হতে পারে না। অপরাধ প্রমাণিত হবে সাক্ষ্য-প্রমাণে, তদন্ত হবে নিরপেক্ষভাবে, বিচার হবে আইন অনুসারে। এর বাইরে যা কিছু, তা ন্যায়বিচার নয়; ক্ষমতার সুবিধামতো আইনকে ব্যবহার করা।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বিরোধী দলের একজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা নয়। পরীক্ষা হলো, নিজের দলের প্রভাবশালী ব্যক্তি অভিযুক্ত হলে রাষ্ট্র একই দৃঢ়তায় আইন প্রয়োগ করতে পারে কি না।

দুর্নীতির আসল মূল্য দেয় কে?

দুর্নীতির হিসাব শুধু সরকারি কোষাগারের খাতায় লেখা থাকে না। তার মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। একটি সেতুর নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহৃত হলে তার ঝুঁকি বহন করেন যাত্রী। একটি হাসপাতালের কেনাকাটায় অনিয়ম হলে তার প্রভাব পড়ে রোগীর চিকিৎসায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগে দুর্নীতি হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। সরকারি অর্থের অপচয় হলে কমে যায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও জনকল্যাণে ব্যয় করার সুযোগ।

অর্থাৎ দুর্নীতি কেবল টাকা চুরির নাম নয়; এটি নাগরিকের অধিকার চুরিরও নাম। দুর্নীতির কারণে যে শিশুটি মানসম্মত শিক্ষা পেল না, যে রোগী প্রয়োজনীয় সেবা পেল না, যে তরুণ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো, তাদের ক্ষতির পূর্ণ হিসাব কোনো দুর্নীতির মামলার নথিতে লেখা থাকে না।

আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, দুর্নীতি মানুষের রাষ্ট্রবিশ্বাস নষ্ট করে। নাগরিক যখন মনে করেন, নিয়ম মেনে কোনো লাভ নেই, ন্যায়বিচার পেতে পরিচয় প্রয়োজন, আর যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব বেশি কার্যকর, তখন তিনি রাষ্ট্রের সঙ্গে নৈতিক সম্পর্ক হারাতে থাকেন। রাষ্ট্রের আইন তখন তাঁর কাছে ন্যায় প্রতিষ্ঠার বিধান নয়, বরং ক্ষমতাবানদের তৈরি বাধা বলে মনে হয়।

এই অবিশ্বাস গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। কারণ গণতন্ত্র শুধু ভোটের দিনে ব্যালট বাক্সে চিহ্ন দেওয়ার নাম নয়; গণতন্ত্র হলো প্রতিদিনের জীবনে নাগরিকের মর্যাদা, অধিকার এবং আইনের সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

রাষ্ট্রসংস্কারের শুরু কোথায়?

দুর্নীতি নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোনো সরকার রাতারাতি দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র তৈরি করতে পারবে না। কিন্তু দুর্নীতির সুযোগ কমানো, অপরাধের ঝুঁকি বাড়ানো এবং সৎ আচরণকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব।

প্রথমত, সরকারি সেবাকে সহজ, স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ করতে হবে। নাগরিক কেন একটি সেবা পাচ্ছেন না, কোন পর্যায়ে তার আবেদন আটকে আছে, কে সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী—এসব তথ্য সহজে জানার সুযোগ থাকা উচিত। ডিজিটাল ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দুর্নীতি যদি শুধু কাগজ থেকে কম্পিউটারে স্থানান্তরিত হয়, তাহলে প্রযুক্তি কোনো মুক্তির পথ নয়। প্রযুক্তির সঙ্গে প্রয়োজন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার।

দ্বিতীয়ত, সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন প্রকল্পে দরপত্র, চুক্তি, ব্যয় বৃদ্ধি, কাজের অগ্রগতি এবং নিরীক্ষার ফল জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। শুধু প্রকল্পের সাফল্য প্রচার নয়, ব্যর্থতা ও অনিয়মের দায়ও নির্ধারণ করতে হবে। জনসম্পদ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত যত বেশি যাচাইযোগ্য হবে, অনিয়মের অন্ধকার জায়গা তত সংকুচিত হবে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক অর্থায়ন, নির্বাচনী ব্যয় এবং ক্ষমতাবানদের স্বার্থের সংঘাত সম্পর্কে কার্যকর বিধান দরকার। জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পদের বিবরণী যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। অবৈধ সম্পদের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় যেন সুরক্ষা কিংবা শাস্তির বিশেষ কারণ না হয়।

চতুর্থত, বিচার বিভাগ, তদন্তকারী সংস্থা, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে। দুর্নীতির তথ্য প্রকাশকারী ব্যক্তি যেন প্রতিশোধ, হয়রানি বা চাকরি হারানোর ভয়ে নীরব হয়ে না যান, সে জন্য তথ্যদাতার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন সাংবাদিকতা ও নাগরিক অনুসন্ধানকে শত্রু ভাবলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের লড়াই নিজের হাতেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

সর্বোপরি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে একজন সৎ কর্মকর্তা রাজনৈতিক চাপের মুখেও আইন মেনে কাজ করতে পারেন এবং একজন অসৎ কর্মকর্তা ক্ষমতাবানের আশ্রয় নিয়েও অপরাধের দায় এড়াতে না পারেন।

শেষ কথা: মুখ বদল নয়, ব্যবস্থার বদল

বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য আরও একটি বক্তৃতা, আরও একটি শপথ কিংবা আরও একটি প্রচারাভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে সততা ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের নাম হবে না; বরং দায়িত্ব পালনের স্বাভাবিক নিয়ম হবে। যেখানে দুর্নীতি করে ধরা পড়ার ভয় থাকবে, কিন্তু সৎ থাকার কারণে বঞ্চিত হওয়ার ভয় থাকবে না। যেখানে ক্ষমতা মানুষের অধিকার হরণ করার অস্ত্র নয়, অধিকার রক্ষার দায়িত্ব হবে।

এ কাজের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, কিন্তু শুধু সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, কার্যকর আইন, স্বচ্ছ প্রশাসন, নিরপেক্ষ বিচার এবং এমন নাগরিক সমাজ, যে কোনো দলের অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস রাখে। নিজের পক্ষের অপরাধকে ক্ষমা করে অন্যের অপরাধের বিচার চাইলে দুর্নীতিবিরোধী নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। তখন ন্যায়বিচারও দলীয় আনুগত্যের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রকে তাই একটি অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি হতে হবে: দুর্নীতি শুধু রাষ্ট্রের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু অপরাধীর কাজ নয়; রাষ্ট্রের ভেতরে ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অস্বচ্ছতা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতিও দুর্নীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

যে রাষ্ট্র নিজের অসুখের নাম উচ্চারণ করতে ভয় পায়, সে রাষ্ট্র সুস্থ হতে পারে না। আর যে সমাজ দুর্নীতিবাজের সম্পদ দেখে মুগ্ধ হয়, কিন্তু সেই সম্পদের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে না, সে সমাজও দুর্নীতির দায় থেকে মুক্ত নয়।

প্রশ্নটি তাই শুধু কে চোর, তা নয়। প্রশ্ন হলো, চুরি করে কে পার পায়, কেন পার পায়, কারা তাকে পার পেতে সাহায্য করে এবং কোন ব্যবস্থায় এই পার পেয়ে যাওয়াটাই নিয়মে পরিণত হয়।

এই প্রশ্নের উত্তর না বদলালে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিটি অভিযান শেষ পর্যন্ত একই নাটকের নতুন মঞ্চায়ন হয়ে থাকবে। চরিত্র বদলাবে, সংলাপ বদলাবে, ক্ষমতার চেয়ার বদলাবে—কিন্তু দর্শকসারিতে বসে থাকা জনগণের ভাগ্য বদলাবে না।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকৃত বিপ্লব শুরু হবে সেদিন, যেদিন রাষ্ট্র দুর্নীতিবাজের পরিচয় দেখে নয়, অপরাধের প্রমাণ দেখে ব্যবস্থা নেবে; যেদিন ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করা রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে বিবেচিত হবে না; আর যেদিন সৎ থাকা আর বোকামি বলে গণ্য হবে না। তার আগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের সব উচ্চকণ্ঠ ঘোষণা—রাষ্ট্রের বিবেক জাগানোর চেয়ে রাষ্ট্রের বিবেক ঘুম পাড়ানোর আয়োজনই বেশি।

বিষয়:বাংলাদেশে দুর্নীতি বাংলাদেশের রাজনীতি রাষ্ট্রের আইন সংবিধান

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…