একসময় শেখ হাসিনাকে ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘অ্যাসেট’ হিসেবে দেখা হতো। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, আওয়ামী লীগের সঙ্গে দিল্লির ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং ভারতীয় নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে তার সরকারের ঘনিষ্ঠ সমন্বয়; শেখ হাসিনা ছিলেন ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক অংশীদার।
কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই হিসাব বদলে গেছে। দিল্লির কূটনৈতিক ও পর্যবেক্ষক মহলে এখন প্রশ্ন উঠছে: শেখ হাসিনা কি ভারতের জন্য আগের মতো কৌশলগত সম্পদ, নাকি ধীরে ধীরে তিনি একটি ‘লায়াবিলিটি’ বা কূটনৈতিক দায় হয়ে উঠছেন?
এর সবচেয়ে বড় কারণ, শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অস্বস্তি ক্রমেই গভীর হচ্ছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক নোট ভার্বাল পাঠায় বাংলাদেশ সরকার। এরপর একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হলেও দিল্লি এখনো তাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। ফলে শেখ হাসিনার বিষয়টি এখন দুই দেশের সম্পর্কের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ওপর ছায়া ফেলছে। গঙ্গার পানি বণ্টন, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ, সীমান্তসহ বিভিন্ন বিষয়ে ঢাকা-দিল্লির আলোচনা গত দুই বছরে অনেকটাই থমকে আছে। বাংলাদেশের যুক্তি: শেখ হাসিনাকে ফেরত না দিলে দুই দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে ভারতের অবস্থান: শেখ হাসিনার বিষয়টি আলাদা রেখে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যান্য ক্ষেত্র এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু ঢাকা সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে না। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানই দেখিয়ে দিচ্ছে, একসময় যার সঙ্গে ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল, সেই শেখ হাসিনাই এখন দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম প্রধান অস্বস্তির কারণ। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। ভারতের দীর্ঘদিনের নীতি অনুযায়ী, সংকটের সময় ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন বিদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আশ্রয় দেওয়ার নজির রয়েছে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সেই নীতিই অনুসরণ করা হয়।
ভারতে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক মাস তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও পরিস্থিতি ব্যাখ্যার প্রক্রিয়ায় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে জানা গেছে। শেখ হাসিনার সঙ্গে দোভালের আগে থেকেই একটি ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। ফলে শুরুতে এই যোগাযোগ প্রক্রিয়াটি বেশ মসৃণভাবেই চলছিল বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পরিস্থিতি বদলেছে।
দোভালের ব্যস্ততা বাড়ার পর শেখ হাসিনার সঙ্গে এই ধরনের যোগাযোগের দায়িত্ব ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর সাবেক প্রধান তপন ডেকা এবং তার অবসরের পর বর্তমান প্রধান মহেশ দীক্ষিতের ওপর পড়েছে বলে জানা গেছে। দিল্লির কাছে শেখ হাসিনার গুরুত্ব আগের তুলনায় কমে যাওয়ার একটি ইঙ্গিত হিসেবেই একে দেখা হচ্ছে। ভারতে যাওয়ার পর শেখ হাসিনার প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে ভারত সহযোগিতা করবে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকায় দিল্লিও শুরুতে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নাকচ করেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। কিন্তু এখানেই তৈরি হয় নতুন সমস্যা।
বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কৌশল কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে ভারত যে পরামর্শ দিয়েছে, শেখ হাসিনা তার অনেকটাই গ্রহণ করেননি বলে দিল্লির কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে ভারতের পরামর্শ তার মনঃপূত হয়নি বলে বলে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে। এমনকি দলের নেতৃত্বে সাময়িক বা সীমিত পরিবর্তনের সম্ভাবনাও শেখ হাসিনা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তার বা তার পরিবারের বাইরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব সাময়িক সময়ের জন্যও অন্য কারও হাতে যাওয়ার বিষয়টি তিনি মেনে নিতে রাজি ছিলেন না, এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের। ফলে দিল্লির একটি অংশের কাছে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে: ভারত যে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে চাইছে, শেখ হাসিনা কি সেই বাস্তবতা মেনে নিতে প্রস্তুত? উত্তর হচ্ছে, না। এ কারণে শেখ হাসিনাকে এখন ভারতের জন্য গলার কাঁটা হিসেবেও মনে করছেন ভারতীয় অনেক বিশ্লেষক। ভারতে রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাজনিত কারণে আশ্রয় নেওয়া বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দালাই লামার উদাহরণ প্রায়ই সামনে আসে।
১৯৫৯ সালে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দালাই লামা একদিকে ভারতের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির সংবেদনশীল বাস্তবতা বুঝেছেন, অন্যদিকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানও ধরে রেখেছেন। ভারতের দৃষ্টিতে তিনি পরবর্তীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদে পরিণত হন। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সেই সমীকরণ তৈরি হয়নি। ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার রাজনৈতিক প্রত্যাশা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অবস্থান এবং বাংলাদেশের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তার সম্পর্ক; সবকিছু মিলিয়ে দিল্লির জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। শেখ হাসিনাকে ভারত কতদিন আশ্রয় দেবে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে দিল্লির কৌশল কী হবে; এখন সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ দাবি যেমন অব্যাহত রয়েছে, তেমনি ভারতের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত তাকে ফেরত দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে ঘিরে অস্বস্তির কারণে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাগুলোও এগোচ্ছে না। ফলে ভারতের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ শুধু শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া নয়; বরং তাকে আশ্রয় দেওয়ার রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক মূল্য কতটা; সেটিও হিসাব করতে হচ্ছে। একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ছিলেন ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘অ্যাসেট’গুলোর একটি।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে: সেই অ্যাসেটই কি এখন ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় ‘লায়াবিলিটি’?








