মতামত

“আমি সবসময় অন্তরের কথাই বলি, কিন্তু রেকর্ড হয় না”-একজন উপাচার্যের এক স্বীকারোক্তি

উপাচার্য ও সাংবাদিকের মধ্যে আলোচনা, চ্যানেল আই অনলাইন. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

উপাচার্য ও সাংবাদিকের মধ্যে সাক্ষাৎকারের দৃশ্য, আলোচনার জন্য আলাদা ডেস্ক ও ক্যামেরা সেটআপ।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ

আগের রাতে ঘুম ভাঙল হঠাৎ, মাঝরাতে। অথচ অফিস থেকে বেরিয়েছিলাম রাত প্রায় ১২টার কাছাকাছি সময়ে। বাসায় ফিরে নিঃশব্দে টেবিলে রাখা খাবার খেয়ে, সব বাবার মতোই সন্তর্পণে ঘুমাতে গিয়েছিলাম — কারণ তাবির আর তাসনিয়া, বিশেষ করে তাবির, একটু আওয়াজ পেলেই চোখ খুলে বলে দেবে, “বাবা এসেছে!” আর তারপর আর ঘুমই আসবে না।

মাঝরাতে ঘুম ভাঙার পর সেই ভাবে চোখই লাগেনি আর। যথারীতি সকালে অফিসে চলে এলাম — সকালের নাস্তাটাও সেদিন আর করা হয়নি, তাড়াহুড়োয় বেরিয়ে পড়েছিলাম।

অন্যান্য কাজের মধ্যেই হঠাৎ রিসেপশন থেকে ফোন — “স্যার, গেস্ট চলে এসেছেন!” অথচ আমার প্রথম রেকর্ডিং তখনো ৪৫ মিনিট বাকি। দ্রুতই সম্মানিত অতিথিদের মেকআপ রুমে বসানো হলো, জাহিদুল ইসলাম ,বাঁধন, হানিফরা সবাই সমন্বয় করছেন। এর মধ্যেই দ্বিতীয় পর্বের অতিথিরাও চলে এলেন। উপস্থাপক জনাব তৌফিক হাসান, এফসিআইএম — যিনি “চলতি বিষয়: ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড এডুকেশন ব্রিজ” অধ্যায়টি উপস্থাপনা করেন — তাঁর আসতেও সামান্য দেরি হলো।

দেশের গুরুত্বপূর্ণ দুই অতিথি — মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি জনাব কামরান টি. রহমান এবং প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব মো. ইলিয়াছ মৃধা — কে নিয়ে বসলাম আমার এমডি স্যার ফরিদুর রেজা সাগরের রুমে। সেখানে শাইখ সিরাজ স্যার, জুয়েল ভাই, আরেফিন ফয়সাল ভাই — সবার সাথে মুহূর্তেই জমে উঠল চ্যানেল আই-সুলভ আন্তরিক আড্ডা। “হৃদয়ে বাংলাদেশ” — এই একটি বাক্যেই চ্যানেল আইয়ের পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না, বরং প্রতিটি অতিথিকে যে আন্তরিকতায় এখানে গ্রহণ করা হয়, তাতেই এর প্রকৃত অর্থ ফুটে ওঠে। ফরিদুর রেজা সাগর নিজে যেভাবে প্রতিটি অতিথির সাথে সময় কাটান, কথা বলেন — তাতে মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না কারও।

ততক্ষণে আমাদের ৩ নম্বর স্টুডিওতে “চলতি বিষয়”-এর ভারি সেট প্রস্তুত। প্রথম পর্বের রেকর্ডিং শুরু হলো। প্রায় সাড়ে চারটা বেজে গেল যখন তা শেষ হলো। এরপর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হান্নান চৌধুরী এবং টি.কে গ্রুপের বিজনেস ডিরেক্টর জনাব মোহাম্মদ মোফাসেল হককে নিয়ে স্টুডিওতে ঢুকলাম।

উপস্থাপকসহ সবাই যেন একই অঙ্গনের মানুষ — শিক্ষা আর শিল্প একে অপরের জন্য ঠিক কতটা অপরিহার্য, এই কথাগুলো দীর্ঘদিন ধরে বলার এবং শোনার জন্যই যেন তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন।

শিল্প ও শিক্ষার মধ্যেকার এই সেতুবন্ধন কতটা জরুরি, তা এই মানুষগুলো বোধহয় সবচেয়ে গভীর থেকে উপলব্ধি করেন — কারণ প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া লাখো গ্র্যাজুয়েটের একটি বড় অংশ চাকরির বাজারে গিয়ে দেখেন, প্রাতিষ্ঠানিক সনদ আর কর্মক্ষেত্রের দাবি — এই দুইয়ের মধ্যে ফাঁক এখনও অনেকখানি। এই ফাঁক পূরণের প্রশ্নেই “ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড এডুকেশন ব্রিজ” তার প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পায়।

দ্বিতীয় পর্ব শুরু হলো, আমি প্যানেলে বসা। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যার এবং টি.কে গ্রুপের বিজনেস ডিরেক্টরের আলোচনা শুনতে শুনতে হঠাৎ মনে হলো — এই মুহূর্তেই “মানুষের মুখ, অন্তরের কথা”-র রেকর্ডিং করতে হবে। সাথে সাথেই ২ নম্বর স্টুডিও প্রস্তুত করা হলো, যদিও তখন জিল্লুর রহমান ভাইয়ের “তৃতীয় মাত্রা”-র রেকর্ডিং সেখানে ছিল না। দ্বিতীয় পর্বের রেকর্ডিং শেষ করেই আমরা “মানুষের মুখ, অন্তরের কথা”-র সেটে গিয়ে বসলাম। এই একটি মুহূর্তই বলে দেয়, চ্যানেল আই ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে — যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো বিষয়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন করে তা বাস্তবায়ন করে ফেলার সামর্থ্য রাখে এই প্রতিষ্ঠান।

ভিসি স্যার হঠাৎ অনুষ্ঠানের ডিজাইন আর নাম নিয়ে প্রশ্ন করলেন — “এটা কে ডিজাইন করেছে?” আমি খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে সম্মানের সাথে জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার, কোনো সমস্যা লক্ষ্য করছেন?” তিনি বললেন, অনুষ্ঠানের নামের পেছনের সিম্বলটি কে করেছেন, তা জানতে চান। বুঝলাম, স্যার বিষয়টি খুব গভীর থেকে লক্ষ্য করেছেন — আর করবেনই বা না কেন! তাঁর পারিবারিক ইতিহাস সত্যিই অবিশ্বাস্য এক গল্পের মতো — নানার বংশ থেকে মামা-মামি-খালা-খালু, দাদার পরিবার এবং নিজের মায়ের পরিবার মিলিয়ে বহু বছর আগে থেকেই আমেরিকা, লন্ডন, অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি রয়েছে তাঁদের পরিবারে — আর সেই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন তাঁর মা, যিনি স্বামীর মৃত্যুর পর খুব অল্প বয়সেই সংসারের হাল ধরেছিলেন।

আমি বললাম, “স্যার, জনাব ফরিদুর রেজা সাগরের গ্রন্থমালা অবলম্বনে ‘মানুষের মুখ, অন্তরের কথা’ অনুষ্ঠানটি তৈরি, আর লোগো ডিজাইন করেছেন জনাব আফজাল হোসেন।” তখন ভিসি স্যার বললেন, “আপনাদের অনুষ্ঠানের নাম আমাকে ছুঁয়ে গেছে, আর এই ডিজাইন যেন তারই একটি প্রতিচ্ছবি। আমি সবসময় অন্তরের কথাই বলি, কিন্তু সেটা কখনো রেকর্ড হয় না। আজ রেকর্ডিংয়ে বলব!”

এই মুহূর্তে মনে পড়ে গেল একটি ব্যক্তিগত মিলের কথা — আমার শ্রদ্ধেয় স্যার ফরিদুর রেজা সাগরের আম্মা, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন, যাঁকে খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও চেনার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। অর্ধশতাধিক উপন্যাসের এই রচয়িতা ছিলেন স্বাধীনতা পদক ও একুশে পদকে ভূষিত একজন প্রথিতযশা লেখক, যিনি ২০২১ সালের জানুয়ারিতে প্রয়াত হন। আর কাকতালীয়ভাবে, আমার নিজের মায়ের নামও রাবেয়া খাতুন।

বিকেল প্রায় ৫টার দিকে সাগর স্যার লক্ষ্য করলেন সকাল থেকে কিছু মুখে দিইনি, বললেন — “একটু খেয়ে নাও, না হলে তো পরে যাবে!” আসলে সারাদিনের ব্যস্ততায় সামনে খাবার থাকলেও ক্ষুধাটাই যেন হারিয়ে যায় — শুধু আমার একার নয়, আমাদের সাথে যাঁরাই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের প্রায় সবার অভিজ্ঞতাই এমন। কারণ আমাদের কাজের ধরনটাই এমন যে একটি বিষয়ের সাথে জড়িয়ে থাকে আরও অনেক অনেক বিষয় — একই সাথে সামলাতে হয় একাধিক রেকর্ডিং, একাধিক অতিথি, একাধিক সিদ্ধান্ত।

আর সেই আন্তরিকতারই প্রতিদান বোধহয় সেদিন দেখা গেল ভিসি স্যারের আচরণে। এত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি সারাদিন সময় দিলেন, শেষ বেলা পর্যন্ত থাকলেন — যা প্রমাণ করে, চ্যানেল আইয়ের এই আন্তরিক আতিথেয়তা অতিথিদেরও কীভাবে ছুঁয়ে যায়।

রেকর্ডিং শেষ করে গাড়িতে ওঠার প্রস্তুতির মুহূর্তে টি.কে গ্রুপের বিজনেস ডিরেক্টরকে শিক্ষা ও শিল্প নিয়ে এই ধরনের অনুষ্ঠানে সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যার বললেন — “শিক্ষা আর শিল্পের মধ্যে যদি সেতুবন্ধন তৈরি না হয়, তাহলে সামনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক অনিশ্চয়তা অপেক্ষা করছে।”

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিষয়:ডিরেক্টর

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…