বিনোদন

এনিমেল ফার্ম: বিপ্লবের স্বপ্ন, ক্ষমতার পালাবদল ও শোষণের চিরচেনা চক্র

রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের উপস্থাপনায় শিল্পকলায় ‘এনিমেল ফার্ম’

এনিমেল ফার্ম: বিপ্লবের স্বপ্ন, ক্ষমতার পালাবদল ও শোষণের চিরচেনা চক্র

ক্ষমতা, শোষণ, রাজনৈতিক প্রতারণা এবং বিপ্লবের লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার এক গভীর রূপক জর্জ অরওয়েলের কালজয়ী উপন্যাস ‘এনিমেল ফার্ম’। যে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মুক্তি ও সমতার স্বপ্ন দেখানো হয়, সেই বিপ্লবই কীভাবে একসময় নতুন শাসকের হাতে শোষণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তার নির্মম চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এই উপন্যাসে।

নাটকে দেখানে হয়েছে-কীভাবে শাসকেরা আদর্শের কথা বললেও নিজেদের জন্য আলাদা সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে।

রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা উপন্যাসটির গল্প অবলম্বন করে মঞ্চস্থ করেছে-‘এনিমেল ফার্ম’।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় সন্ধ্যা ৭টায় নাটকটি প্রদর্শিত হয়। দর্শকদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখ করার মতো। মঙ্গলবারও (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টায় নাটকটির আরো একটি প্রদর্শনী রয়েছে।

উপন্যাসের কাহিনি ইংল্যান্ডের উইলিংডনের ম্যানর ফার্মকে কেন্দ্র করে। খামারের মালিক জোন্সের অবহেলা ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ পশুরা একসময় বিদ্রোহ করে। তারা জোন্সকে খামার থেকে বিতাড়িত করে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে। খামারের নতুন নাম হয়- ‘এনিমেল ফার্ম’। পশুরা এমন এক সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখে, যেখানে কোনো পশু অন্য পশুর অধীন থাকবে না, সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে এবং শোষণমুক্ত জীবন পাবে।

এই বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে পশুরা পুরোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে। তাদের কাছে স্বাধীনতা মানে শুধু শাসকের অনুপস্থিতি নয়, বরং নিজেদের শ্রমের ফল ভোগ করার অধিকার এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। এভাবেই গল্পের শুরুতে সাম্য, ন্যায়বিচার ও সম্মিলিত মালিকানার একটি আদর্শিক ছবি তৈরি হয়।

কিন্তু বিপ্লবের পরপরই প্রশ্ন দেখা দেয়, নতুন সমাজের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে এবং সেই ক্ষমতার জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে? উপন্যাসের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজে।

খামারের শাসনভার ধীরে ধীরে শূকরদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। তাদের মধ্যে নেপোলিয়ন ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বী স্নোবলকে খামার থেকে বিতাড়িত করে। এরপর সে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রচার, ভয়ভীতি ও বলপ্রয়োগের আশ্রয় নেয়। পশুদের জন্য প্রণীত মূলনীতিগুলোও ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে।

অরওয়েল দেখিয়েছেন, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ শুধু শাসকের আচরণ বদলায় না, বরং সত্য ও ন্যায়ের সংজ্ঞাও পাল্টে দিতে পারে। যে নিয়ম একসময় সবার সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছিল, সেটিই পরে শাসকের স্বার্থ রক্ষার উপকরণে পরিণত হয়।

‘সব পশু সমান, কিন্তু কিছু পশু অন্যদের চেয়ে বেশি সমান’ এই বিখ্যাত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের রাজনৈতিক ব্যঙ্গ সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমতার ধারণাকে ব্যবহার করেই কীভাবে বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়া হয়, এই বাক্য তার প্রতীক। শাসকেরা আদর্শের কথা বললেও নিজেদের জন্য আলাদা সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে। অন্যদিকে, খামারের সাধারণ পশুরা আগের মতোই কঠোর পরিশ্রম করে, অথচ তাদের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না।

নেপোলিয়নের শাসন টিকিয়ে রাখতে স্কুইলার নামের শূকরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সে কথার মারপ্যাঁচ, বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা এবং প্রচারের মাধ্যমে পশুদের বোঝানোর চেষ্টা করে যে শাসকের প্রতিটি সিদ্ধান্তই তাদের কল্যাণের জন্য নেওয়া হয়েছে। অতীতের ঘটনাও এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে নেপোলিয়নের নেতৃত্ব প্রশ্নের মুখে না পড়ে।

এই ঘটনাপ্রবাহ আধুনিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। কোনো শাসক যখন তথ্য নিয়ন্ত্রণ করে, ভিন্নমতকে দমন করে এবং মানুষের স্মৃতি ও বিচারবোধকে প্রভাবিত করতে চায়, তখন সত্য যাচাইয়ের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসে। ফলে শোষিতরাও কখনো কখনো নিজেদের শোষণের বাস্তবতা বুঝতে পারে না।

অরওয়েলের এই উপস্থাপন কেবল একনায়কতন্ত্রের সমালোচনা নয়; এটি প্রচারযন্ত্র, রাজনৈতিক ভাষা এবং জনগণের সচেতনতার সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

‘এনিমেল ফার্ম’-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এখানে বিপ্লবের ব্যর্থতাকে কেবল শাসকের বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়নি। গল্পটি দেখায়, ক্ষমতার জবাবদিহি, স্বাধীন চিন্তা, তথ্য যাচাই এবং সংগঠিত প্রতিরোধের অভাব কীভাবে একটি মুক্তির আন্দোলনকে নতুন কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় পরিণত হতে সাহায্য করে।

নেপোলিয়ন ও তার সহযোগীরা একসময় মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শূকরদের সঙ্গে মানুষের আচরণ ও স্বার্থের পার্থক্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যায়। উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে মানুষ ও শূকরদের মুখের দিকে তাকিয়ে অন্য পশুরা বুঝতে পারে না, কে মানুষ আর কে শূকর। এই দৃশ্যটি শুধু ক্ষমতার পালাবদলের সমাপ্তি নয়, বরং পুরোনো ও নতুন শাসকের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হারিয়ে যাওয়ার প্রতীক।

তবে উপন্যাসটিকে সব বিপ্লবের পরিণতি একই, এমন একটি সরল সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য সীমিত হয়ে যায়। বরং অরওয়েলের গল্পটি সতর্ক করে দেয়, কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত না হলে মুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত নাও হতে পারে।

রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের মঞ্চায়নে ‘এনিমেল ফার্ম’ দর্শকের সামনে ক্ষমতা ও ক্ষমতাহীনতার সম্পর্ক নতুনভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে। নির্দেশকের বক্তব্যেও উঠে এসেছে, ইতিহাসের বিভিন্ন বিপ্লবে শোষিত শ্রেণির ক্ষমতায় আরোহণের পর তাদের একাংশের শোষক হয়ে ওঠার প্রবণতা নাটকটির অন্যতম অনুসন্ধানের বিষয়।

মঞ্চনাটকের ক্ষেত্রে এই বক্তব্য কেবল সংলাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। চরিত্রের শরীরী ভাষা, মঞ্চের বিন্যাস, আলো, শব্দ এবং পশুদের সম্মিলিত উপস্থিতির মধ্য দিয়ে শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে।

নাটকটির তাৎপর্য এখানেই যে, এটি দর্শককে কেবল নেপোলিয়নের মতো শাসকের সমালোচনা করতে বলে না; বরং প্রশ্ন করতে শেখায়, একটি সমাজে ক্ষমতা কীভাবে কেন্দ্রীভূত হয়, মানুষ কেন অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে এবং সমতার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় নাগরিকদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

নজরুল সৈয়দের নাট্যরূপে এটি নির্দেশনা দিয়েছেন নাট্যকলা বিভাগের প্রধান সাইদুর রহমান লিপন।

নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন মো. হাবিবুল্লাহ, ফাহাদ খান, সাইফুল ইসলাম, মো.সজিব হোসেন, সানজিত সুপ্ত, নাজিমউদ্দৌলা জুয়েল, আবির খান অন্তু, পলক চক্রবর্তী, রিফাত আরা জুঁই, মেহেদী হাসানসহ নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

নাটকটির সহযোগী নির্দেশনায় আছেন আব্দুর রাজ্জাক ও মো.শামীম আহমেদ। আলোক পরিকল্পনায় ধীমান চন্দ্র বর্মন, পোশাক পরিকল্পনায় মহসিনা আক্তার এবং সংগীত পরিকল্পনায় রয়েছেন অসীম কুমার নট্ট। টিকেটের দাম ধরা হয়েছে ১০০০, ৫০০, ৩০০ এবং ২০০ টাকা।

বিষয়:এনিমেল ফার্ম জর্জ অরওয়েল বিপ্লব রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয় সাইদুর রহমান লিপন

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…