বিশ্বকাপ ফুটবল হল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট। প্রতি চারবছর পরপর অনুষ্ঠিত এই আসরে ফুটবলাররা শুধু ম্যাচ জিততেই নয়, ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠতেও মাঠে নামেন। নাটকীয়তা, উত্তেজনা আর অবিশ্বাস্য মুহূর্তে ভরা এই টুর্নামেন্টে এক জোড়া গ্লাভস হাতে গোলরক্ষকদের অদম্য ভূমিকাও অনেক সময় নির্ধারণ করে দেয় ম্যাচের ভাগ্য। তাই প্রতিটি বিশ্বকাপেই তৈরি হয় গোলকিপারদের মহাকাব্য।
বিশ্বের সেরা গোলকিপাররা বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের সক্ষমতা এবং সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দেন। ক্ষিপ্র রিফ্লেক্স, চরম চাপের মধ্যে স্থিরতা এবং অবিশ্বাস্য সব সেভের মাধ্যমে তারা একাই দলের জয়ের পথ তৈরি করে পারেন। ফুটবল ইতিহাসের পাতায় গোলরক্ষকদের এমন বহু পারফরম্যান্স রয়েছে, যা আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অক্ষয়, অমলিন। গত ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের কথাই ধরা যাক। ফ্রান্সের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের গুরুত্বপূর্ণ সেভগুলো আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে সহায়তা করে। বিশেষ করে ফাইনালে পেনাল্টি শুট আউটের আগে ম্যাচ যখন ৩-৩ তখন ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড কোলো মুয়ানি একেবারে গোলের সামনে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
কিন্ত আর্জেন্টিনার ক্রসবারের সামনে দাঁড়ানো মার্টিনেজ অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় পয়েন্ট ব্লাংক রেঞ্জ থেকে চোখের পলকে শটটি ঠেকিয়ে দেন। সেই শট ঠেকাতে না পারলে ফ্রান্সই চ্যাম্পিয়ন হতো। কেননা ম্যাচ তখন ছিল একেবারেই অন্তিম লগ্নে। এরপর পেনাল্টি আউটে অবিশ্বাস্য জাদুকরী পারফরম্যান্সের কারণেই বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে নিতে পেরেছিল আর্জেন্টিনা। সেদিন সেই দম বন্ধ হওয়া ম্যাচে বিশ্বেও কোটি কোটি আর্জেন্টিনা ভক্তদের আনন্দে সিক্ত করেছিলেন একজন গোলরক্ষক- এমিলিয়ানো মার্টিনেজের সমসাময়িক সময়ে বিশ্বকাপ ফুটবলে গোলকিপারদের দক্ষতার এরকম আরও অনেক উদাহরণ আছে।
গত বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু ঠিক একই কাজ করেছিলেন। তিনিও একাধিক পেনাল্টি ঠেকিয়ে শুটআউটে স্পেনকে হতাশ করে নিজ দেশ মরক্কোকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে নিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে মেক্সিকোর গোলরক্ষক গুইলের্মো ওচোয়ার উত্থান ছিল সত্যিই অসাধারণ। স্বাগতিক ব্রাজিলের বিপক্ষে তিনি একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে ঝড় তুলেছিলেন। বিশেষ করে নেইমারের হেড থেকে করা সেভটি আজও স্মরণীয়। তার বীরত্বপূর্ণ পারফরম্যান্সের কারণেই ম্যাচটি ড্র হয়েছিল। সেদিন স্বাগতিক দেশের বিপক্ষে, হাজারো দর্শকের চাপের মধ্যে, ওচোয়া খেলেছিলেন জীবনের সেরা এক মঞ্চ।
এবারের বিশ্বকাপ মঞ্চে ইতিমধ্যেই কোন কোন গোলকিপার দুর্দান্ত কিছু সেভ করে আলোচনায় উঠে এসেছেন। যদিও কেবলই প্রথম পর্বের খেলা শুরু হয়েছে। ম্যাচ অনেক অনেক বাকি। তবুও জাপানের গোলরক্ষক জায়েন সুজুকি, কেপ ভার্দের ভোজিনহা প্রথম ম্যাচেই অতুলনীয় পাফরম্যান্স প্রদর্শন করে সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। সে কথাই বলছিলেন সাবেক তারকা ফুটবলার বিপ্লর ভট্টচার্য। বাংলাদেশের গোলপোস্ট যিনি অনেক অনেকদিন আগলে রেখেছিলেন।
বিপ্লবের মতে, সবকিছুর পরেও একটা ম্যাচের জয় পরাজয় গোলরক্ষকের ওপরই বর্তায়। ফলে একজন কিপারকে অনেক চাপ ও দায়িত্ব নিয়ে গোলপোস্ট পাহারা দিতে হয়। একজন গোলরক্ষক যখন গুড সেভ করার দক্ষতা দেখান তখনই তাঁর ফুটবল নান্দনিকতা প্রকাশিত হয়। আর গোলপোস্টে তো তাকে একাই খেলতে হয় প্রতিপক্ষের এগারোজনকে মাথায় নিয়ে।
এপর্যন্ত যেকটি ম্যাচে হয়েছে তার নিরিখে বিপ্লব মনে করেন সৌদি আরবের মোহাম্মদ আল ওয়াইস, মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনো, জাপানের গোলরক্ষক জায়েন সুজুকি, কেপ ভার্দের ভোজিনহার কিপিং সবচেয়ে ভালো লেগেছে। গোলকিপারদের কারণেই এসব দল প্রথম ম্যাচে হারেনি, বরং দর্শকদের হৃদয় জয় করতে পেরেছেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির প্রথম গোল নিয়ে জিদান পুত্র লুকা জিদানের সোশ্যাল মিডিয়াতে কারো কারো সমালোচনা প্রসঙ্গে বিপ্লব বললেন, ‘ডিফেন্ডারদের মাঝখান দিয়ে এ ধরনের ত্বরিৎ বুলেট শটে কেবল মিরাকল সেইভ হয়। এখানে টাইমিং মেলানো অত সহজ নয়। মেসির এই গোলটাতে কিছুটা বাঁকও ছিল। ফলে গোলরক্ষকের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব হয়নি। মেসি শট স্পেস থেকে অসাধারণ ভঙ্গিমায় গোল করার অদম্য ক্ষমতা আবারো দেখিয়েছেন।’
সবশেষে বিপ্লব বললেন, ‘বিশ্বকাপের খেলা কেবল শুরু। ম্যাচ যত গড়াবে, ধীরে ধীরে গোলরক্ষকরাও আরও দৃশ্যমান হবে। গত বিশ্বকাপ মাতিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মাটিনেজ। হিরোর হিরোতে পরিণত হয়েছিলেন এবার হয়ত আরও নতুন কাউকে আমরা গোলপোস্ট আগলাতে দেখব সাহসে ও সৌন্দর্যে। এবারের বিশ্বকাপেও গোলকিপারদের মহাকাব্য লেখা হবে।’







