জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান দিলারা চৌধুরীর

জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘জাতীয় ঐক্য: উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভিপিএসএসসির উদ্যোগে আয়োজিত এ বৈঠকে দেশের বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, সাবেক কূটনীতিক, সামরিক কর্মকর্তা, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নেন।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবের বৈঠকে আলোচকরা বলেন, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করতে হলে গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কার্যকর জাতীয় ঐক্য গড়ে না ওঠাকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন তারা। একই সঙ্গে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অগ্রগতির অভাব নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন বক্তারা।
অতিথিদের বক্তব্যে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, বিচার কেন থমকে আছে? যারা বিচার করবে না, আমরা ধরে নেব তারাও গুম করবে। এত গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরও বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত না হওয়াকে দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাইয়ের আত্মত্যাগের আকাঙ্ক্ষা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তার অভিযোগ, বিএনপি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে একের পর এক জনবিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এবং জনগণের ম্যান্ডেটকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে টালবাহানা চলছে। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।
সাবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বোঝাপড়া, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করার প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় উঠে আসে।
প্রফেসর ড. নাইমা মোয়াজ্জেম বলেন, দুর্নীতি দেশের অন্যতম বড় সমস্যা। দলমত-নির্বিশেষে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নেই; এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

প্রফেসর ড. আব্দুর রব বলেন, জাতীয় সংকট থেকে উত্তরণে নৈতিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। একটি স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে নৈতিক মূল্যবোধের গুরুত্ব আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসে।
সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ মিয়া রাষ্ট্রীয় সংস্কার, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় গুরুত্ব পায়। জাতীয় উত্তরণের জন্য প্রশাসনকে জবাবদিহিমূলক করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সম্মিলিত উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। জাতীয় সংকট মোকাবিলায় দায়িত্বশীল আচরণ ও দেশপ্রেমকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হুসাইন (অব.)।
অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, আমাদের ছেলেরা আর কত রক্ত দেবে? এত রক্তের পরও দেশ পরিবর্তন না হওয়াটা দুঃখজনক। বারবার জাতির সঙ্গে প্রতারণা করলে জাতি কখনো ক্ষমা করবে না।
তিনি আরও বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের আহ্বানে নয়, বরং নিজেদের অধিকার ও আকাঙ্ক্ষা থেকেই মানুষ জুলাইয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল। তার অভিযোগ, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক নয়। আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং অন্যায়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় শিক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং সমাজের বিভিন্ন অংশের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন।
গণতান্ত্রিক উত্তরণকে টেকসই করতে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও গঠনমূলক আলোচনার পরিবেশ তৈরির বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি।
সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলি বলেন, বিএনপি দেশ ভালোভাবে পরিচালনা করলে জাতীয় ঐক্যের প্রসঙ্গ সামনে আসত না। তিনি আরও মন্তব্য করেন, জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও জাতীয় ঐক্য ছিল না। তার বক্তব্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় দায়িত্বশীল শাসন, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল মুদাসসের বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মর্যাদা এবং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্যকে অপরিহার্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
রুবী আমানতউল্লাহ বলেন, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সমাজের বিভিন্ন অংশের অংশগ্রহণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ভিপিএসএসসির চেয়ারম্যান লে. জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী (অব.)। তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনায় জাতীয় ঐক্যের সংকট, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ, রাজনৈতিক দলগুলোর অতীত ভূমিকা, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
সংস্কার ও বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করতে হলে গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে। রাজনৈতিক বিভাজন ও পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর করে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার, আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আধিপত্য বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
তার মতে, জাতীয় ঐক্য কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সাময়িক সমঝোতার বিষয় নয়; বরং এটি একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। অতীতের রাজনৈতিক ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গঠনে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।






