মারা গেছেন জাপানি লেখক ও নির্মাতা রিউ মুরাকামি

যৌনতা, সহিংসতা ও সমাজের অন্ধকার বাস্তবতা নিয়ে সাহসী লেখার জন্য পরিচিত জাপানি ঔপন্যাসিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা রিউ মুরাকামি মারা গেছেন।
৭৪ বছর বয়সে গত ১৭ অক্টোবর নিজ বাসায় তার মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) তার প্রকাশনা সংস্থা জেনতোশা এ তথ্য জানিয়েছে।
সমকালীন জাপানি সাহিত্যের ‘এনফঁ তেরিবল’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন রিউ মুরাকামি। প্রচলিত সাহিত্যধারার বাইরে গিয়ে লেখা তার উপন্যাসে উঠে এসেছে যৌনতা, মাদকের ব্যবহার, সহিংসতা এবং জাপানি ও মার্কিন সমাজের নানা অসংগতি। ব্ল্যাক হিউমার ও তীক্ষ্ণ সমাজ পর্যবেক্ষণের কারণে তার সাহিত্যকর্ম বিশ্বজুড়ে লাখো পাঠকের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
১৯৫২ সালে জাপানের নাগাসাকি প্রদেশের সাসেবো শহরে জন্মগ্রহণ করেন রিউ মুরাকামি। তার বাবা-মা দুজনই ছিলেন শিক্ষক। স্কুলজীবনে তিনি একটি রক ব্যান্ডে ড্রাম বাজাতেন। এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর তাকে তিন মাস গৃহবন্দীও থাকতে হয়েছিল।
১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘অলমোস্ট ট্রান্সপারেন্ট ব্লু’। শিক্ষার্থী থাকাকালেই লেখা বইটিতে মাদক, যৌনতা ও হতাশায় নিমজ্জিত একদল তরুণের উচ্ছৃঙ্খল জীবন তুলে ধরেন তিনি। উপন্যাসটি জাপানের মর্যাদাপূর্ণ আকুতাগাওয়া পুরস্কার এবং গুনজো পুরস্কার জিতে নেয়। প্রথম বই দিয়েই সাহিত্যজগতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন মুরাকামি।
পরবর্তী সময়ে ৪০টির বেশি উপন্যাস ও ছোটগল্পের সংকলন লিখেছেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘কয়েন লকার বেবিজ’, ‘ইন দ্য মিসো স্যুপ’, ‘অডিশন’, ‘পিয়ার্সিং’ এবং ‘পপুলার হিটস অব দ্য শোওয়া এরা’। তার অনেক বই এখনো ইংরেজিতে অনূদিত হয়নি।
তার উপন্যাসের বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে রূপ পেয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ‘অডিশন’, যা ১৯৯৯ সালে চলচ্চিত্র নির্মাতা তাকাশি মিয়িকে পরিচালনায় পর্দায় আসে। স্ত্রীকে হারানো এক ব্যক্তির নতুন জীবনসঙ্গী খুঁজতে ভুয়া চলচ্চিত্রের অডিশনের আয়োজন এবং পরবর্তী ভয়াবহ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটি স্বাধীন ধারার হরর সিনেমার অন্যতম আলোচিত কাজ হয়ে ওঠে।
নিজেও বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। প্রথম উপন্যাস ‘অলমোস্ট ট্রান্সপারেন্ট ব্লু’-কে নিজেই চলচ্চিত্রে রূপদান করেন। ১৯৭৯ সালে একই নামে মুক্তি পায় সিনেমাটি। এর পর ‘ইটস অল রাইট, মাই ফ্রেন্ড’, ইউরোতা, র্যাফলস হোটেল, টোকিও ডিকেডেন্স এবং কোকোর মতো চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন রিউ মুরাকামি।
জাপানের আরেক জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামির সঙ্গে নামের মিল থাকলেও তাদের মধ্যে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। সাংবাদিক ডেভিড পিলিং ২০১৩ সালে দুই লেখকের সাহিত্যধারার পার্থক্য তুলে ধরে রিউ মুরাকামির লেখাকে হারুকির তুলনায় বেশি ধারালো ও ক্ষুব্ধ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
যুক্তরাজ্যে মুরাকামির বই প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠান পুশকিন প্রেসের প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক অ্যাডাম ফ্রয়েডেনহাইম তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, রিউ মুরাকামির অদ্ভুত, মৌলিক ও চলচ্চিত্রের মতো দৃশ্যধর্মী উপন্যাস ইংরেজিভাষী পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পাওয়া তাদের জন্য বড় প্রাপ্তি।
প্রকাশনা সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মুরাকামির মৃত্যুতে তারা গভীরভাবে শোকাহত। বিশ্বজুড়ে তার অসংখ্য পাঠকের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিতর্কিত বিষয়বস্তু, ব্যতিক্রমী বর্ণনাভঙ্গি এবং সমাজের অস্বস্তিকর বাস্তবতা তুলে ধরার সাহসের মধ্য দিয়ে জাপানি সাহিত্যে নিজস্ব জায়গা তৈরি করেছিলেন রিউ মুরাকামি। তার সাহিত্যকর্মের বহু গল্প চলচ্চিত্রে রূপ পেলেও, প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রেখেছে। জাপান টাইমস ও দ্য গার্ডিয়ান





