আন্তর্জাতিক

পালিত হচ্ছে মৃতদের নিয়ে স্মরণ উৎসব, এই উৎসব সম্পর্কে কতটুকু জানেন?

পালিত হচ্ছে মৃতদের নিয়ে স্মরণ উৎসব, এই উৎসব সম্পর্কে কতটুকু জানেন?

মেক্সিকোর সান আন্দ্রেস মিক্সকুইকে ‘ডে অফ দ্য ডেড’ উদযাপন

মেক্সিকো সিটির উপকণ্ঠে ঐতিহাসিক গ্রাম সান আন্দ্রেস মিক্সকুইকের কবরস্থানে সন্ধ্যা নামতেই মৃত স্বজনদের কবর ঘিরে জড়ো হন পরিবারের সদস্যরা। মোমবাতি, ফুল আর ধূপের সুগন্ধে ভরে ওঠে পুরো এলাকা।

মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী ‘ডে অব দ্য ডেড’ বা মৃতদের দিবস উপলক্ষে প্রতি বছর ১ ও ২ নভেম্বর মৃত স্বজনদের স্মরণ করেন দেশটির মানুষ। এ সময় পরিবারের সদস্যরা কবর পরিষ্কার করেন, গাঁদা ফুল দিয়ে সাজান এবং মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রিয়জনদের শ্রদ্ধা জানান।

উৎসব সম্পর্কে জানা যায়, হাজার বছরের পুরোনো এক ঐতিহ্য এটি। দিয়া দে লস মুয়েরতস নামের মেক্সিকোর এই রীতি ইংরেজিতে পরিচিত ‘ডে অব দ্য ডেড’ নামে। মৃতদের স্মরণ করে ও শ্রদ্ধা জানিয়ে পালন করা হয় এটি। তবে এ সময় মানুষ মোটেই দুঃখকাতর হয় না বরং থাকে উৎসবের আমেজ।

১ নভেম্বর শুরু হয় ডে অব দ্য ডেড, শেষ হয় নভেম্বরের ২ তারিখ। রীতিটি পালন করা ব্যক্তিরা বিশ্বাস করেন এ সময় মৃতদের আত্মা বাড়িতে ফিরে আসে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য।

মূলত এটি মেক্সিকোর রীতি বা উৎসব হলেও অনেক জায়গাতে এমনকি উত্তর বা দক্ষিণ আমেরিকার বাইরেও দিনটি নিজেদের মতো করে উদ্‌যাপন করে মানুষ। ফিলিপাইনে এটি পরিচিত উনদাস নামে এবং নভেম্বরের প্রথম দুই দিনই উদ্‌যাপিত হয়। মেক্সিকোর মতো ফিলিপাইনের মানুষও এ দিনে বা দিন দুটিতে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া প্রিয় মানুষদের সমাধিস্থলে যান এবং তাদের জন্য বেদির মতো তৈরি করেন।

বলা হয় দক্ষিণ আমেরিকা ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসীদের থেকে এই রীতিটি এসেছে। বিশেষ করে বলতে হয় অ্যাজটেকদের কথা। মিচাইহুইতো নামের মৃতদের শ্রদ্ধা জানানোর একটি উৎসব পালন করতেন অ্যাজটেকরা।

২০২৫ সালে ‘ডে অব দ্য ডেড’ উদযাপনের একটি দৃশ্য

পরবর্তীতে এসব এলাকায় স্প্যানিশদের আগমন ঘটে। খ্রিস্টধর্মালম্বীদের পালন করা মৃতদের সঙ্গে সম্পর্কিত আচার অল সেইন্টস ডে এবং অল সোলস ডের সঙ্গে আদিবাসীদের এই ঐতিহ্য মিলিয়ে তারা তৈরি করে নতুন এক উৎসব বা রীতি দিয়া দে লস মুয়েরতস।

দিনটিতে কি করা হয়?

অনেকে মৃত আত্মীয় এবং প্রিয়জনদের সমাধিতে গিয়ে সম্মান জানান। কিন্তু তারা শোক করতে যান না। বরং সমাধি এবং সমাধিফলক পরিষ্কার করে বা ফুল দিয়ে সাজান। কেউ কেউ প্রার্থনা করেন, অন্যরা গান বাজান।

পরিবেশ প্রায় একটি পার্টির মতো। সংগীত এবং নানা খাবার-দাবারের আয়োজন থাকে। মৃত প্রিয়জনের স্মৃতি জাগিয়ে রাখতে তাদের নিয়ে নানা গল্প বলেন একজন আরেকজনকে।

মেক্সিকোর কোনো কোনো শহরে প্যারেড এবং উৎসবের মাধ্যমে উদ্‌যাপন করে দিনটি। অনেকে তাদের মুখে এভাবে রং করে যেন দেখতে খুলি বা করোটির মতো মনে হয়। নানা ধরনের অদ্ভুত পোশাকও গায়ে চাপান তারা।

ডে অব দ্য ডেড উদ্‌যাপনের জন্য বেদি তৈরি করা হয় বিভিন্ন বাড়িতে। অফরেন্দা নামে পরিচিত এই বেদি স্কুলসহ অন্যান্য জায়গায়ও স্থাপন করা হয়। বেদির ওপরে থাকে মৃত প্রিয় মানুষটির ছবি। বিভিন্ন নকশা করা বর্ণিল সব টিস্যু পেপার বা পেপেল পিকাডোও শোভা পায়। বেদিতে থাকে মোমবাতি আর চিনির তৈরি খুলিও। কখনো কখনো লবণ দিয়ে ক্রুশের মতো তৈরি করে বেদির আশপাশেই রাখা হয়। কোনো কোনো পরিবার মৃত ব্যক্তির প্রিয় খাবার কিংবা পোশাক, বই এসবও রাখেন। বলা চলে সবকিছু মিলিয়ে মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে উৎসব মুখর পরিবেশে দিনটি উদ্‌যাপন করে মানুষ।

পর্যটকদের ভিড়, স্থানীদের উদ্বেগ:

তবে স্বজনদের স্মরণে আয়োজিত এই ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানে স্থানীয়দের পাশাপাশি সাম্প্রতিককালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকদের ভিড়ও বাড়ছে। এতে ব্যক্তিগত শোক ও স্মরণের পরিবেশ অনেকটা পর্যটকদের দর্শনীয় স্থানে  পরিণত হচ্ছে। এটা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

২০১০ সালে মারা যাওয়া অ্যাঞ্জেল হিমেনেজ দেল আগুইলার কবরের পাশে তার পরিবারের সদস্যরাও জড়ো হয়েছিলেন। তার ছেলে হেসুস বাবার উদ্দেশে পানীয়ের গ্লাস তুলে বলেন, ‘আমাদের মৃত স্বজনদের জন্য শুভকামনা।’

তবে এই আয়োজন ঘিরে পর্যটকদের উপস্থিতি স্থানীয়দের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

অ্যাঞ্জেলের মেয়ে মার্থা নাশিয়েলি জানান, কয়েক বছর আগে বাবার কবরে ফুল দিতে গিয়ে পর্যটকদের অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে তাঁকে কবরস্থানে প্রবেশের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

মার্থার ভাষায়, তারা আমাকে ঢুকতে দেয়নি। বিষয়টি খুব হতাশাজনক ছিল। কারণ তিনি আমার বাবা, আমি এখানকার বাসিন্দা। অথচ মানুষের ভিড়ে আমাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

ফুল দিয়ে ও মোমবাতি জ্বালিয়ে একটি পরিবার তার মৃত স্বজনকে স্মরণ করছে

শৈশব থেকেই এই কবরস্থানে পর্যটকদের আনাগোনা দেখে আসছেন ৪০ বছর বয়সী মার্থা। তার মতে, পরিবারের সদস্যদের জন্য কবরস্থানে স্বজনদের স্মরণ করা অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও আবেগের বিষয়। কিন্তু পর্যটকদের ক্যামেরার ঝলকানি ও ভিড়ে সেই অন্তরঙ্গ পরিবেশ অনেক সময় প্রদর্শনীতে পরিণত হয়।

মেক্সিকো সিটি সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় এক লাখ মানুষ এই কবরস্থান পরিদর্শন করেন। গ্রামের মোট জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় সাত গুণ।

মেক্সিকোর ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক দ্রিসেলদা সানচেজ-আগিরে জানান, অতীতে পর্যটকদের জন্য কবরস্থানের ওপর একটি সেতু তৈরি করা হয়েছিল। সেখান থেকে তারা নিচে পরিবারের আচার-অনুষ্ঠান দেখতে পারতেন। তবে স্থানীয়দের অনেকে নিজেদের চিড়িয়াখানার প্রাণীর মতো প্রদর্শিত হওয়ার অভিযোগ তোলায় উদ্যোগটি সমালোচনার মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত সেতুটি মাত্র একবার ব্যবহার করা হয়।

বর্তমানে মেক্সিকো সিটির পর্যটন নির্দেশিকায় কবরস্থানে ছবি তোলার আগে পরিবারের অনুমতি নেওয়া এবং ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে অধ্যাপক সানচেজ-আগিরের মতে, শুধু পর্যটকদের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানালেই সমস্যার সমাধান হবে না। কবরস্থানে প্রবেশের আগেই দর্শনার্থীদের স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, এটি শোক পালন ও স্বজনদের স্মরণের পবিত্র স্থান, কোনো প্রদর্শনী নয়।

স্থানীয়দের উদ্বেগ থাকলেও পর্যটকদের আসা বন্ধ হোক, তা চান না মার্থা। তার মতে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের আগ্রহ এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে। তবে সবাইকে স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবারের আবেগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

মার্থার কথায়, আমরা চাই মানুষ আমাদের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানুক, এটি অনুভব করুক এবং নিজেদের দেশে ফিরে গিয়ে এর কথা ছড়িয়ে দিক। তবে তাদের অবশ্যই শ্রদ্ধার সঙ্গে এখানে আসতে হবে।

বিষয়:উনদাস ঐতিহ্যবাহী উৎসব কবর ডে অব দ্য ডেড মৃত স্বজনদের স্মরণ মৃতদের স্মরণ দিবস

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…