নিউজরুমে আমরা কিছু জার্গন বা নিজস্ব শব্দ ব্যবহার করি,যেগুলো ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয় নিউজরুমের বাইরে। এরকম একটি শব্দ ‘দোকান’।
এখানে দোকান মানে চাল-ডাল-আদা-শ্যাম্পু বিক্রির জায়গা নয়। দোকান মানে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় অথবা জাতীয় নেতাদের নাম ভাঙিয়ে গজিয়ে ওঠা কিছু সংগঠন—যাদের কাজ জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ বিভিন্ন স্থানে সমসাময়িক নানা বিষয়ে কয়েকজন পরিচিত মুখকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করা। দোকান মানে মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, আদিবাসী বা এরকম ইস্যুতে গড়ে ওঠা কিছু সুবিধাবাদী সংগঠন—যাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও এসব ইস্যুতে সরব এবং নানা কায়দা-কানুন করে গণমাধ্যমে নিজেদের বিজ্ঞাপন দেয়া; যার বিনিময়ে তারা দেশ-বিদেশের নানা জায়গা থেকে পয়সা কামায়। আবার ওইসব সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট ‘বিশেষজ্ঞরা’ প্রায়শ আন্তর্জাতিক নানা সভা-সেমিনারেও অংশ নেন।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস উল্লেখ করা যায়, তিনি লিখেছেন: ‘২০১২তে রামু, উখিয়া ও পটিয়ায় সহিংসতার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ সংহতি জানাতে গেছেন, সাহস দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার দুইশো টাকার বদনা দিয়ে সাতশো টাকার ব্যানার টাঙিয়ে ছবি তুলে নিয়ে এসেছেন। স্থানীয়রা সেসব হাসিমুখে নিয়েছে। সম্প্রদায়ের যেসব নেতা মানে যেসব সাম্প্রদায়িক নেতারা আছেন ঢাকায়, তারাও গিয়েছিলেন বিমানে চেপে। তারা দিয়ে এসেছেন মহামূল্যবান সাহস। বড় দলের বিমানের খরচ সামলানোর পর সেটাই অবশিষ্ট ছিল দেয়ার মতো। সেটা নিয়েই বেঁচেবর্তে আছে সেসব এলাকার লোকজন। গোবিন্দগঞ্জেও অনেকে সাহস দিচ্ছেন। ভুলে যাচ্ছেন—রাইফেলের বিরুদ্ধে যারা তীর ধনুক নিয়ে দাঁড়ায়, তাদের সাহস দেয়া লাগে না।’
জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার এই ক্ষোভের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে রংপুর সুগার মিলের জমি থেকে সাঁওতালদের গুলি করে উচ্ছেদের ঘটনায় যে জনাতিনেক আদিবাসী নিহত হলেন, তার উত্তাপ এরইমধ্যে ছড়িয়েছে সারা দেশে। বিভিন্ন স্থানে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় মিছিল-মিটিং হচ্ছে। ঢাকা থেকেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা সেখানে গেছেন। পরিস্থিতি দেখেছেন। এমনকি একাত্তরের ঘাতক-দালাল-নির্মূল কমিটি সেখানে গণশুনানিও করেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল সেখানে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের এই বলে আশ্বাস দিয়ে এসেছে যে, যাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে, তাদের ঘর বানিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু বাস্ততা বড়ই নির্মম।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে আহত সাঁওতালদের চিকিৎসা হয় হাতকড়া পরিয়ে। সেই হাতকড়া খুলতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা লাগে। জমিতে সাঁওতালরা যে ধান লাগিয়েছিলেন, সুগার মিল কর্তৃপক্ষ সেই ধান কেটে সাঁওতালদের বুঝিয়ে দিয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন দাবি করলেও, সাঁওতালরা বলছেন, তাদের জোর করে ওই ধান দেয়া হচ্ছে। তারা ধান নয়, বরং জমি ফেরত চান।
এরকম পরিস্থিতিতে ২৬ নভেম্বর একটি সংবাদ গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে যে, সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের জমি থেকে সাঁওতাল উচ্ছেদের সময় হামলা লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় স্থানীয় এমপি এবং ২ ইউপি চেয়ারম্যানসহ ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ৫ থেকে ৬ শ’ জনকে আসামি করে একটি মামলা হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই এর ইন্ধনদাতা হিসেবে স্থানীয় এমপি এবং দুজন ইউপি চেয়ারম্যানের নাম আসছিল। সাঁওতালরাও সাংবাদিকদের কাছে এই অভিযোগ করেছেন। ফলে যখন জানা গেলো যে, ওই ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে অবশেষে মামলা হয়েছে, তখন এটা আমাদের মনে কিছুটা আশার সঞ্চার করে। কিন্তু ভুল ভাঙতেও সময় লাগেনি। পরে জানা গেলো ওটি আসলে মামলা নয়, অভিযোগ—যেটি পরে সাধারণ ডায়েরি হিসেবে নথিভূক্ত করেছে পুলিশ।
সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির পক্ষে থমাস হেমরম নামের একজন বাদী হয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানায় ওই অভিযোগ জমা দেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ব্লাস্ট, নিজেরা করি এবং এএলআরডি’র মতো কয়েকটি বেসরকারি সংগঠনের ১০জন প্রতিনিধি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা আসলে গিয়েছিলেন মামলা করতে। কিন্তু পুলিশ সেটি অভিযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। তারা এর প্রতিবাদ না করে বা আদালতে না গিয়ে পুলিশ অভিযোগ হিসেবে গ্রহণ করায় খুশিমনে ফিরে আসেন।
প্রশ্ন হলো,থানায় এরকম অভিযোগ বা ডায়েরি করতে দশজন মানুষের যাওয়া লাগলো কেন? ঢাকা থেকে বড় বড় সংগঠনের আইনজীবীরা গোবিন্দগঞ্জ থানায় গেলেন কেবল একটা জিডি করতে? অথচ তারা জানতেন, এর আগে পুলিশ ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে একটি মামলা করিয়েছে। সুতরাং একই ঘটনায় দ্বিতীয় মামলা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। গণমাধ্যমে প্রচার হলো স্থানীয় এমপি ও ইউপি চেয়ারম্যানসহ ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পাঁচ-ছয়শোজনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। অথচ পরে দেখো গেলো সেটা স্রেফ একটা ডায়েরি। সুতরাং এর পরিণতি কী হবে—তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ না হলেও চলে।
গোবিন্দগঞ্জের ওই ঘটনার পর মানবাধিকার নামধারী বিভিন্ন সংগঠন, বিভিন্ন এনজিও, বাঘা বাঘা লোকজন সেখানে গেছেন। রাজধানীতে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে মঞ্চ কাঁপিয়েছেন। তাতে কী ফল হয়েছে? আবার ঘটনা যখন ঘটলো, বিভিন্ন এনজিও তাদের তৎপরতা শুরু করেছে এর অনেক পরে। দুষ্টলোকেরা বলে, ফান্ড পেতে বিলম্ব হওয়ায় তাদের প্রতিবাদ জানাতেও দেরি হয়েছে।
আবার দোকান প্রসঙ্গে আসা যাক। খেয়াল করে দেখবেন বা সন্ধ্যার পরে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলে দেখা যাবে, রাজধানীতে প্রতিদিনই খুব পরিচিতি কিছু দোকানে কিছু পরিচিতি রাজনীতিবিদ, কিছু পরিচিত ‘বুদ্ধিজীবী’ জাতিকে জ্ঞান দিচ্ছেন। আর রাজনৈতিক ইস্যু হলে সেখানে বিএনপি-জামাতের গালাগালি ছাড়া কিছু পাবেন না। অনেক গণমাধ্যম আবার এগুলোকে খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রচারও করে। শোনা যায়, এসব অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেয়ার বিনিময়ে কেউ কেউ আয়োজকদের ভালো পয়সাও দেন। ফলে দোকানে মালের ঘাটতি পড়ে না কখনোই।
এরকম দোকান শুধু রাজনীতি বা মানবাধিকারের নামে নয়, বরং বেশ কয়েক বছর ধরেই জলবায়ু পরিবর্তনের নামেও অনেক দোকান খুলেছে। যেখানে কিছু ‘বুদ্ধিজীবী’ ইংরেজি থেকে অনুবাদ করা কিছু তত্ত্ব এবং বাংলাদেশ কেন জলবায়ু ঝুঁকিতে আছে এবং কেন শিল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ দেয়া উচিত—সেই ইস্যুতে বড় বড় সবক দেন। আবার টিভির টকশোতেও যান। এসব দোকানেও প্রচুর বিদেশি পণ্য আসে বলে শোনা যায়।
এই যে এত এত দোকান, মানবাধিকারের প্রশ্নে, রাজনীতির প্রশ্নে, মুক্তচিন্তা কিংবা জলবায়ু প্রশ্নে; এই যে এত এত বক্তৃতা, এত এত টিভি কাভারেজ, এত এত মানববন্ধন—তাতে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির কতটা উন্নতি হচ্ছে? সরকার কি এসব কথাবার্তাকে আদৌ কোনো পাত্তা দেয়?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







