সরকারের নানা উদ্যোগ নেয়ার খবরে তলানিতে নেমে আসা পুঁজিবাজারের সূচকের উত্থান শুরু হয়েছে। গত তিন কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ-ডিএসইর সূচক বেড়েছে প্রায় ৩১১ পয়েন্ট। একই সঙ্গে বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণও।
সূচকের এই ইতিবাচক ধারায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি আসলেও আস্থা বাড়েনি। এক ধরনের দুঃশ্চিন্তায়ও রয়েছেন তারা।
বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বেশ কয়েক বছর ধরে বাজারের আচরণ ভাল নয়। দুই-চার দিন সূচক বাড়লেও দুই-চার সপ্তাহ কমতে থাকে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা বেড়ে যায়।
সোহেল হোসেন নামের একজন বিনিয়োগকারী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে সর্বস্ব হারালাম। এখন সূচক কিছুটা বাড়লেও এই বাজারের কোনো স্থিতিশীলতা নেই। একদিনে যে পরিমাণ বাড়ে ১০ দিনে তার কয়েকগুণ কমে যায়।
“সরকারের কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়ার খবরে এখন সূচক বাড়ছে। কিন্তু কয়দিন টিকে তা দেখতে হবে। তবে বড় চিন্তার বিষয় হলো এসব সংবাদের কারণে বাজারকে কৃত্রিমভাবে তোলা হচ্ছে কি না। এটি নজরদারিরতে রাখতে হবে।”
তিনি বলেন: শেয়ার বাজারে কয়েকটি চক্র আছে। তাদের কারসাজির কারণে বিনিয়োগকারীরা মূলধন হারিয়েছে। সরকারের উচিত এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা। তাহলে বাজার স্থিতিশীল হবে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি শাকিল রিজভী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: লোভ আর হতাশা দুটোই থাকে শেয়ার বাজারে। কোম্পানিগুলো লভ্যাংশ দেবেই। অতএব উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নাই।
তিনি বলেন: সূচক তো একেবারে নিচে অবস্থান করছে। আর কত কমবে। এর বেশি কমবেও বা কিভাবে। যেই অবস্থায় সূচক নেমে গেছে, সেখান থেকে তা উঠে আসতো। হয়তো ১০/২০ পয়েন্ট করে বাড়তো। কিন্তু এখন সরকারের পদক্ষেপে তা দ্রুত বাড়ছে। এটাই পার্থক্য। এতে চিন্তার কোনো কারণ নাই।
সূচকের এই বৃদ্ধিকে স্বাভাবিক মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ।
তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: মূলত সূচক অনেক নিচে এসেছিল। বাজারে গতি আনতে প্রধানমন্ত্রী কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন, সরকারি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এসব কারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারে সক্রিয় হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে।
পুঁজিবাজারের এই বিশ্লেষক বলেন: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার মধ্যে একটা বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, মাল্টিন্যাশনাল বা বহুজাতিক ও সরকারি মালিকানাধীন লাভজনক কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তকরণের উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি এসব ভাল ও বড় কোম্পানিগুলোকে বাজারে তালিকাভূক্ত করা হয়, তাহলে বাজার চাঙ্গা হয়ে যাবে। স্থিতিশীলতা আসবে। কিন্তু এটা বাস্তবায়ন না করলে দাম কিছুদিন বেড়ে আবার কমতে শুরু করবে।
“প্রধান কথা হলো শেয়ারবাজারে গুণ সম্পন্ন অর্থাৎ ভাল কোম্পানি নেই। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এ কারণে মোটামুটি ভাল ও খারাপ সব কোম্পানির শেয়ারের দরই কমেছে। সেজন্যই সূচক তলানিতে নেমে গেছে। ভাল এবং টেকসই কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত না করলে আর স্থিরতা আসবে না।”
আবু আহমেদ আরও বলেন: প্রধানমন্ত্রী খুবই যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী নির্দেশনা দিয়েছেন, বহুজাতিক কোম্পানি আনতে হবে। এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভরসা জাগবে। বাজার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এর আগেও সরকারি কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত করার কথা বলা হলেও গত ১০ বছরে একটা কোম্পানিকেও অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি।
সূচক বাড়লেও অনেক বিনিয়োগকারী সন্দে করছেন কৃত্রিমভাবে সূচক বাড়ছে কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কৃত্রিমভাবে উঠলেও যারা ঝুঁকি নেয়ার তারা নিবেই। তবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করার জন্য কোম্পানির আর্থিক অবস্থা বোঝা উচিত বিনিয়োগকারীদের। যারা বোঝে না তাদের এই বাজারে প্রবেশ করা ঠিক নয়। অন্যের কথায় হুজুগে শেয়ার কেনা কখনই উচিৎ নয়।
১৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, পুঁজিবাজার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ানো; মার্চেন্ট ব্যাংকার ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য কতিপয় সহজ শর্তে ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা করা; আইসিবি’র বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়ানো; বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা ও দেশীয় বাজারে আস্থা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া; প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া এবং বাজারে মানসম্পন্ন আইপিও বাড়াতে বহুজাতিক ও সরকারি মালিকানাধীন লাভজনক কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তকরণের উদ্যোগ নেয়া।
এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ৪ চার বাণিজ্যিক ব্যাংক: সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এক বৈঠকের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তাদের বিনিয়োগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুঁজিবাজার উন্নয়নে সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছে। এসব ইতিবাচক খবরের কারণে শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
এর আগে ব্যাপক দরপতনে গত ১৩ জানুয়ারি সূচক কমে ৪ হাজার ১২৩ পয়েন্টে নেমেছিল; যা গত ৪ বছর ৭ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০১৫ সালের ৭ জুন এই সূচকের অবস্থান ছিল ৪ হাজার ১২২ পয়েন্ট।
সোমবারও বেড়েছে সূচক। এদিন ডিএসই প্রধান বা ডিএসইএক্স সূচক ৫২ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৪ হাজার ৪৩৪ পয়েন্টে। অন্য সূচকগুলোর মধ্যে ডিএসইএস বা শরীয়াহ সূচক ১৭ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে এক হাজার ১৪ পয়েন্টে এবং ডিএস৩০ সূচক ২৭ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫১১ পয়েন্টে।
ডিএসইতে আজ ৪৯৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। যা গত কার্যদিবস থেকে ৮৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বেশি। গতকাল লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪১১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
আজ ডিএসইতে ৩৫৪টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দর বেড়েছে ১৪৯টির, কমেছে ১৬১টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৪৪টির।
অপরদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৯১ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১৩ হাজার ৪৬৯ পয়েন্টে। সিএসইতে টাকার অংকে ৭৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।









