সরকার পতনের আন্দোলনের জন্য সংগঠনকে শক্তিশালী করা, নেতাকর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণের লক্ষ্যে মাঠে নামা বিএনপির ৫১ টিম নানা সমস্যার মুখে পড়েছে। বিভিন্ন জেলায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে পদ-পদবির দ্বন্দ্বে সংঘর্ষ-সংঘাত ও রক্তারক্তিতে পণ্ড হয়ে পড়ছে কর্মীসভাগুলো। সেই সঙ্গে কোন কোন স্থানে পাচ্ছে প্রশাসনিক বাধারও অভিযোগ করছে বিএনপি নেতারা।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যলয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকার বিএনপির কর্মীসভা আয়োজনে বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, বিএনপি কর্মীসভার মাধ্যমে দলকে উজ্জীবিত করছে এবং আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে তা বুঝতে পেরে এই অগণতান্ত্রিক সরকার বাধা দিচ্ছে। নাটোরে প্রশাসন আমাদের কর্মীসভা পণ্ড করে দিয়েছে। সরকার মূলত বিএনপিকে ভয় পায়।
২৪ এপ্রিল থেকে বিএনপি মহাসচিব, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা, যুগ্ম মহাসচিবসহ দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের নের্তৃত্বে ৫১ টিমের জেলায় জেলায় কর্মীসভার প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়। এসব সফরের প্রায় অধিকাংশ জায়গায় হয় নিজেদের মধ্যে সংঘাত, নয়তো প্রশাসনিক বাধার মুখোমুখি হচ্ছে বিএনপি।
আজ পর্যন্ত ঝিনাইদহ, নীলফামারীর সৈয়দপুর, চট্টগ্রাম উত্তর-দক্ষিণসহ বিভিন্ন জায়গায় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ-সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে।
সমস্যার শুরু শুক্রবার রাতে সৈয়দপুর জেলা বিএনপি কার্যালয়ে কর্মীসভায় ভাঙচুর ও সংঘর্ষ এর মধ্যদিয়ে। উপজেলায় বিএনপি নেতা ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ওবায়দুর রহমানকে লাঞ্ছিত করার ঘটনার জের ধরে কার্যালয়ের চেয়ার ভাঙচুর করা হয়।
চট্টগ্রামে ২ মে মঙ্গলবার থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে দু’গ্রুপের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ, গাড়ি ভাঙচুর চলছে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরীর সমর্থকদের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।ওই দুই নেতার আধিপত্যকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে উত্তর জেলা বিএনপির কর্মীসভায় মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। কাজীর দেউড়িতে বিএনপির কার্যালয় নাসিমন ভবনে এই সংঘর্ষে কর্মীসভা পণ্ড হয়ে যায়; আহত হন অন্তত ৪ ছাত্রদল কর্মী। এ সময় মঞ্চে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড.খন্দকার মোশারফ হোসেনসহ নগর বিএনপির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
৩ মে বুধবার দু’গ্রুপের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ, গাড়ি ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের পটিয়াতে হয় দক্ষিণ জেলা বিএনপির কর্মীসভা। দুপুর ২টার দিকে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এনামুল হক এনামের নের্তৃত্বে শতাধিক নেতাকর্মী সমাবেশস্থলে মিছিল নিয়ে পৌঁছলে সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান জুয়েল গ্রুপের সমর্থকরা তাদের দিকে চেয়ার ছুঁড়ে মারে। এসময় দুপক্ষের মধ্যে চেয়ার ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। ধাওয়া এবং ব্যাপক পিটুনি দিয়ে সভাস্থল থেকে বিতাড়িত করা হয় এনাম গ্রুপের নেতাকর্মীদের। এসময় এনাম গ্রুপের সমর্থকরা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে অবস্থান নিয়ে অন্তত ৮ থেকে ১০টি যানবাহন ভাঙচুর করে। এ ঘটনায় এনামসহ অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন আহত হয়েছেন। প্রতিনিধিসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন।
একই দিন ঝিনাইদহ বিএনপির প্রতিনিধি সভায় দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫ জন। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অধ্যাপক জয়নাল আবেদিন। সকালে ঝিনাইদহ শহরের পৌর কমিউনিটি সেন্টারে এ ঘটনা ঘটে।
কোন কোন স্থানে প্রশাসনিক বাধার সম্মুখীনও হয়েছে বিএনপির কর্মীসভা। মঙ্গলবার নাটোরে বিএনপি আয়োজিত কর্মীসভা পণ্ড করে দিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। দলের সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর বাসভবনে পুলিশ এবং সরকার সমর্থকরা তালা লাগিয়ে সেখানে অবস্থান নেয় এবং কর্মীসভা পণ্ড করে দেয়। বাগেরহাটেও পুলিশ কর্মীসভা করতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির দপ্তর সেলের সদস্যরা।
৪ মে বৃহস্পতিবার যশোরে কর্মীসভা করতে গেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এ্যাড. সৈয়দ মুহায়েজ্জম হোসেন আলাল। সেখানকার সর্বশেষ পরিস্থিতি এখনো জানা যায়নি। এছাড়া ৬ মে খুলনায় বিএনপির কর্মীসভা অনুষ্ঠিত হবে। সেই সভাকে ঘিরে দুই গ্রুপের মধ্যে টানটান উত্তেজনা চলছে বলে জানা গেছে। ওই সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
এবিষয়ে রিজভী আহমেদ বৃহস্পতিবার দুপুরে চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এসব সংঘর্ষ-সংঘাতের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে এক্ষেত্রে অনেকাংশে ক্ষমতাসীনদের উস্কানি থাকে। তারা চায় আমরা যেন সুষ্ঠুভাবে কোন কর্মসূচি পালন করতে না পারি এবং নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে না পারি সেই চেষ্টা সরকার সবসময় অব্যাহত রেখেছে বলে অভিযোগ করেন রিজভী আহমেদ। খুলনার কর্মীসভা সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিএনপির এই মুখপাত্র।
বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে একই সঙ্গে মহাসচিব ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তরের কর্মিসভার সময়সূচি ঘোষণা করেন। চলতি মাসের ৭মে ঢাকা দক্ষিণের কর্মিসভা অনুষ্ঠিত হবে মহানগর নাট্যমঞ্চে এবং ৮ মে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা উত্তরের কর্মিসভা। তবে এই সভাগুলো পুলিশের অনুমতির ওপর নির্ভর করছে বলেন জানান মহাসচিব।







