অনেক পাওয়া না পাওয়া, দু:খ-কষ্ট এবং অত্যাচার-নিপীড়নের খবরের মধ্যে আজ যে খবরটি আমাদের মনটিকে আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছে- তা হচ্ছে, আমাদের মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার সংবাদ, দেশজুড়ে এসএসসিতে তাদের সাড়া জাগানো ফলাফল করার সংবাদ। এত বাধা-বিঘ্ন পার হয়ে মেয়েরা যে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে একদিকে যেমন গর্বে বুকটা ভরে যাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি আশার আলো দেখতে পারছি। মনে হচ্ছে আমাদের জয় সুনিশ্চিত।
আমি জানিনা একজন নারী বলেই কিনা অথবা একটি কন্যা শিশুর মা বলেই কিনা, বিশ্বের বিশেষ করে নিজের দেশের মেয়েদের প্রতি, নারীদের আমার একটা পক্ষপাতিত্ব থেকেই যায়। তাই যখন দেখি কোন প্রতিযোগিতায় মেয়েরা এগিয়ে থাকে, তখন অজান্তেই চোখের কোণ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। এ আনন্দাশ্রু।
অধিকাংশ সময়ই শুনছি মেয়েদের প্রতি অত্যাচার-অবিচারের কথা, অপহরণ, ধর্ষণ, হত্যা, আত্মহত্যার কথা। কিশোরী, তরুণী, মধ্যবয়সী থেকে শিশু কেউই বাদ যাচ্ছেনা। ছাত্রী, চাকরিজীবী, শ্রমিক, মডেল, তারকা বা অন্য যেকোন পেশাজীবীই হোক না কেন- কেউ দুস্কৃতকারীদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেনা। পত্রিকার পাতায় চোখ রাখা যায়না। একজন নারীর সাফল্যেও একটি কাহিনী বা একদল মেয়ের অর্জনের একটি গল্প ছাপা হওয়ার পরপরই ১০/১২ টি নির্যাতনের কাহিনী চোখে পড়বে। নিজেদের সম্ভ্রম বাঁচানোর জন্য অনেক কিছু করেও মেয়েরা ঐসব অমানুষের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেনা।
আমরা সবাই জানি এই সমাজ ছোটবেলা থেকেই মেয়েশিশুদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করে। মেয়েদের জন্য বিধিনিষেধের শেষ নেই। কথা বলা যাবেনা, হাসা যাবেনা, আড্ডা মারা যাবেনা, বাইরে বেরুনো যাবেনা, বের হলেও পর্দা মানতে হবে, বেশি খেলা যাবেনা, রাস্তায় মনমতো হাঁটা যাবেনা, ছেলেদের সাথে কথা বলা যাবেনা, চাকরি করা যাবেনা, চাকরি করলেও নিজের হাতে পয়সা রাখা যাবেনা, বেশি পড়াশোনা করা যাবেনা, সবধরণের চাকরি করা যাবেনা, গান শেখা যাবেনা, নাচা যাবেনা, নাটক করা যাবেনা, স্বামীর কথার অবাধ্য হওয়া যাবেনা জাতীয় অনেক না না না, এমনকি মুরগী বা মাছের মাথাও খাওয়া যাবেনা টাইপের অনেক ‘না’ এর মধ্যে একটি মেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
পরিবার, এই সমাজ, এমনকি মাঝেমাঝে রাষ্ট্রও একটি মেয়েকে এমনভাবে বড় করার চেষ্টা করে, যেন মেয়েটি বড় হবে ঠিকই কিন্তু মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস করবেনা, নিপীড়িত হবে কিন্তু প্রতিবাদ করবেনা, শিক্ষা অর্জন করবে কিন্তু পড়া শেষ করবেনা, মেয়েদের গুণ থাকবে কিন্তু সেটা কাজে লাগাবেনা। তবে এরপরও কোন কোন পরিবার চায়, তাদের কন্যাকে আকাশ ছোঁয়াতে।
এরমধ্যে আবার নতুন উপদ্রব শুরু হয়েছে মৌলবাদি গ্রুপগুলোর পক্ষ থেকে। তারাতো নারীকে পণ্য ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারেনা। তারা চেষ্টা করছে নারীকে মোড়কজাত করে বাজারে নামাতে। তারা মনে করে মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষা নিলেই চলে, এর বেশি নয়। দিনে দিনে বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদিদের যে আগ্রাসন শুরু হয়েছে- তার সবচেয়ে বড় ভিকটিম এদেশের মেয়েরা। আর সেখানেই আমাদের ভয়, আমাদের শংকা।
এরকম একটি প্রতিকূল পরিবেশও আমাদের মেয়েদের পরাস্ত করতে পারেনি, পারবেও না। মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বারগতিতে। বাধা-বিঘ্ন পার হয়ে তারা ছুটছে কারণ তাদের আকাশ ছুঁতে হবে। আমরা তাদের অভিনন্দন জানাই। প্রার্থনা করি, ওরা এগিয়ে যাক। জয়ী হোক জীবনের সকল ক্ষেত্রে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







