এক মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের ভাতা পাওয়ার জন্য ঘুষ চাওয়ার কারণে সে আর কোনো দিন ভাতা আনতে যান নাই। সেই মুক্তিযোদ্ধার রিকসাচালক ছেলের সাথে কথা হয় সাংবাদিক হাসান মামুনের। নিজের ফেসবুক পেজে সেই করুণ কাহিনী বর্ণনা দিয়েছেন হাসান হাসান মামুন।
তিনি লিখেছেন, সেই রিকশাচালকের কথা মনে পড়ল কেন জানি, যে হোটেল সুন্দরবনের গলি থেকে আমাকে বয়ে নিয়ে গিয়েছিল ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে।
তখন সিটি নির্বাচনের আগ মুহূর্ত। সে নিজেই বলতে লাগল নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে। আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, ‘আমি জোনায়েদ সাকীরে লাইক করি’।
‘লাইক’ শব্দ শুনে আর তার কেতা দেখে জানতে চাই, পড়াশোনা কত দূর? – ‘উচ্চ মাধ্যমিক পার করতে পারি নাই, স্যার–অভাবে। এহন আপনাগো শহরে আইসা রিকশা চালাই। নগদ ইনকাম’।
অনেক বিষয়েই মত দিচ্ছিল সে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এতে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন আসে অবধারিতভাবে। সে হাসতে হাসতে বলে, ‘আমার এলাকার এমপি কেডা, হেরে আমি চিনি না। কী দুর্ভাগ্য বলেন’?
আমি বলি, এমপিকে চিনেই বা তোমার লাভ কী? – ‘কথা ঠিক বলছেন। কিন্তু আমি তারে চিনতে চাই–অমুক গ্রামের তমুকের ছেলে। তার কাছে গিয়া দুইটা কথা বলতে চাই, তাতে কাজ হোক না হোক। এহন যে এমপি হইছে, সে এলাকাতেই যায় না। মনে জোর নাই তো..’।
এসব বলতে বলতে তার বোধহয় মনে হয় যে, আমি না তাকে ‘সরকারবিরোধী’ লোক ভাবছি। তাই হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে বলে ওঠে, ‘আমি কিন্তু স্যার একজন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে’। বাবার পুরো নাম বলে সে, সেক্টর নম্বর জানায়। অতঃপর বলে, ‘আমার বাবা ঘাড়কাটা লোক ছিল। নিজে যা বুঝতো–করতো। মুক্তিযুদ্ধটাও সেভাবেই করছিল। আরও শুনবেন’?
আমি আগ্রহ দেখাই। ঝুঁকে-ঝুঁকে রিকশা চালাতে চালাতে সে বলতে থাকে, ‘মুক্তিযোদ্ধা ভাতা যখন চালু হইল, বাবা খুশি হইল। কইল, ভাতার লাইগা তো যুদ্ধ করি নাই। তয় সরকার দিতেছে যখন–এইডা আনন্দের কথা। বাবা তার কমান্ডারের কাছে গেল নাম লেখাইতে। সেই লোকও বড় মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু বাবার কাছে সে টাকা চাইল। টাকা মানে ঘুষ–বুঝছেন তো? বলল, অনেক খরচা আছে। সবাই দিতেছে; আপনেও দেন। এই কথা শুইন্যা বাবা মন খারাপ কইরা বাড়ি চইলা আসল। আর গেল না’।
আমি বলি, তোমরা বলো নাই যেতে?
– ‘আমরা ক্যান, সবাই বলছে। তারে বুঝাইছে, একবারই তো দিতে অইব। দেন; দিয়া একটা ব্যবস্থা করেন। কিন্তু উনার এক কথা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা আমি ঘুষ দিয়া নিমু না। অন্য কাজে ঘুষ দিতে কও–দিমু’!
তরুণ রিকশাচালক অতঃপর আমার দিকে ফিরে তাকায়। তার ঘর্মাক্ত মুখের দিকে চেয়ে থাকতে পারি না। আমার দৃষ্টি নত হয়ে আসে পিচঢালা পথের দিকে।
কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলি না।
রাপা প্লাজা পার হতে হতে স্বগোতক্তির মতো সে বলে, ‘সেই দুঃখ আর জিদ নিয়া লোকটা একদিন দুনিয়া থাইকা চইলা গেল’।










