সিভিল সার্ভিসে নতুনদের অভিনন্দন জানানোর সাথে সাথে তাদের কিছু পরামর্শও
দিয়েছেন সিভিল সার্ভিসে কর্মরত সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী
ম্যাজিস্ট্রেট কাজী সায়েমুজ্জামান।
নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, গতকাল সন্ধ্যায় ৩৪তম বিসিএস এর গেজেট হয়েছে। এর মাধ্যমে নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে দুই হাজার ২০ জন ক্যাডার কর্মকর্তার। এদের অনেকে আমার ফেসবুকের সংগেও যুক্ত আছেন। অনেকের স্টাটাসে আমি অভিনন্দন জানিয়েছি। অনেকেই কাল থেকে ফোনে কল দিয়েছেন। কারো সঙ্গে কথা হয়েছে। অনেকের ফোন কল ব্যস্ততার কারণে ধরতে পারিনি।
সিভিল সার্ভিসে নতুনদের অভিনন্দন এবং সিভিল সার্ভিসের দুনিয়ায় স্বাগতম। আকাশ সমান স্বপ্ন নিয়ে তারা চাকুরি জগতে পা দিয়েছেন। নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়ের জীবনে তারা প্রবেশ করলেন। এটি একটি নতুন জীবন। এসময় তাদের কাছে কিছু প্রত্যাশার কথা জানানোর জন্যই এই স্টাটাস।
১.০
নতুনদেরকে আশাহত করবো না। স্বাধীনতার ৪০ বছরেও পাবলিক সার্ভিসকে মানুষের জন্য সহজলভ্য করা যায়নি। নতুনরা এই আধমরা সার্ভিসকে ঘা মেরে বাচাবেঁন এই প্রত্যাশা করি। আমরা আন্ত সার্ভিস নিয়ে একটি দ্বন্দ্ব উত্তারাধিকারসূত্রেই পেয়েছি। অবস্থা এমন যে- এখানে ক্যাডার নন ক্যাডার সবাই সমান অধিকার চান। নন ক্যাডাররাও ক্যাডারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে যা সাম্প্রতিক সময়ে দেখতে পেয়েছি। ক্যাডারের বিরুদ্ধে ক্যাডার তো অাছেই। কারণ হলো ক্যাডার সার্ভিসকে এখনো সম্মানের টেকসই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে আশাহত হলে চলবে না। নিজেকে কখনোই বঞ্চিত ভাববেন না। দেশের জন্য কাজ করলে সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠেই কাজ করা যায়। তখন কোন ক্যাডার বড় বা ছোট তা চোখে পড়বে না। সবার কাজই গুরুত্বপূর্ণ। নতুনরা এই প্রাচীন দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে পরশ্রীকাতরতা ফেলে দিয়ে শুধু দেশের জন্য কাজ করবেন- এই প্রত্যাশা করি।
২.০
আমার সাড়ে ৫ বছরের সরকারী চাকুরিতে সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছি- এখানে সততার খুব অভাব। সৎ মানুষকে অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সৎ হিসেবে টিকে থাকা খুব কঠিন। আমরাও ২৮ ব্যাচের একঝাঁক তরুণ ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে সততার প্রত্যয় নিয়ে যোগ দিয়েছিলাম। এর মধ্যে অনেকেই বিচ্যুত হয়েছেন। নতুনদেরকে বলবো- সৎ থাকতে হলে প্রথমেই নিজেকে চিনিয়ে দিতে হবে। প্রশাসন ক্যাডারে আছি বলে- এই সার্ভিসের ভেতরের কথা বলতে পারি। এখনো ইচ্ছা করলে সৎ থাকা যায়। অনেকেই আছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাদের মতো লোক খুজে পাওয়া কঠিন। মানুষের ভালোবাসা অর্জন করুন। দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে প্রশংসা অজর্ন করুন। দেখবেন- দুর্নীতিতে জড়াতে ইচ্ছা করবে না। তাছাড়া আপনারা এখন নতুন স্কেলে বেতন ভাতা পাবেন। ভদ্রস্থ জীবন যাপনের জন্য এই অর্থ যথেস্ট। আশা করবো নতুনরা নিজেরা দুর্নীতিমুক্ত থেকে নতুন বাংলাদেশ গঠনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করবে।
৩.০
প্রথমেই পোস্টিং নিয়ে মন খারাপ করা যাবে না। বলা হয়, পোস্টিং প্লেস স্থান দিয়ে নয় বস দিয়ে নির্ধারণ করা হয়। যার বস যত ভালো- তার পোস্টিং তত ভালো। এই বয়সে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য যাদের কাজ করার সুযোগ আছে- তারা করলে আত্মতৃপ্তি পাবেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “জীবনে জীবন যোগ করা, না হলে কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পসরা।” আসলেই চাকুরি জীবনে যোগ্য দক্ষ অফিসার হিসেবে সুনাম অর্জন করতে হলে মাঠ পর্যায়ে মানুষের সঙ্গে তাদের জন্যই কাজ করে যেতে হবে। কারো প্রত্যন্ত অঞ্চলে পোস্টিং হলে মন খারাপ করা যাবে না। এটাকে সৌভাগ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দেখবেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ একজন অফিসারকে কতটা সম্মান করেন।
৪.০
প্রত্যেক ক্যাাডারের নর্মস ও ইটিকেট রয়েছে। শুরু থেকেই এগুলো রপ্ত করে ফেলুন। একজন ক্যাডার অফিসার মুখে নয় তার আচরণে অন্যদের চেয়ে আলাদা এটি প্রমাণ করে দিন। সরকারী চাকুরি মানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাকুরি। সরকারকে তুষ্ট রাখতে হয়। তা অবশ্যই কাজের মাধ্যমে। অন্যকোনভাবে তুষ্ট করতে গেলে ফলাফল ভালো হয় না। ভিন্ন ক্যাডারের সিনিয়রদের সম্মান করবেন। নতুন হিসেবে তাদের কাছ থেকেও অনেক কিছু শেখার রয়েছে। অফিসের সকল স্টাফকে আপন করে নেবেন। তাদেরকে সহকর্মী হিসেবে সম্বোধন করবেন। আপনি করে বলবেন।
৫.০
আরেকটা বিষয়- আপনার টেবিলে অনেক লোকজন আসবেন। একবার ভাবুন- আমি একজন কর্মকর্তা। আমার আত্মীয়-স্বজন অনেকেই এই পর্যায়ে নেই। আমার সামনে একজন সেবা গ্রহীতা বসে আছেন। আমার বাবা, ভাইসহ স্বজনরাও অন্য কোন কর্মকর্তার টেবিলের সামনে এভাবে গিয়ে বসে আছেন। নিজের স্বজনদের জন্য ওই কর্মকর্তার কাছ থেকে যেরূপ ব্যবহার প্রত্যাশা করবেন- আপনার কাছে আগত ব্যক্তির প্রতিও তেমনি সম্মান প্রদর্শন করবেন এই প্রত্যাশা করছি।
আরেকটি নিবেদন, এইগুলোকে উপদেশ নয়- একজন সিনিয়র সহকর্মীর অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করবেন। পুরো দেশ আপনাদের দিকে চেয়ে আছে। আপনাদের যাত্রা শুভ হোক।










