আসামে বাদ পড়া ১৯ লাখ মানুষ, বাংলাদেশের কোনো উদ্বেগ আছে কি?

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের ১৯ লাখেরও বেশি মানুষ তাদের জাতীয় নাগরিক পঞ্জী বা এনআরসি থেকে বাদ পড়েছে। আজ শনিবার এই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। ওই তালিকায় অনুসারে, ৩ কোটি এগারো লাখ ২১ হাজার ৪ জন ভারতের নাগরিক পঞ্জীতে অন্তর্ভূক্ত হবেন, আর ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন ওই তালিকায় স্থান পান নি।
বিষয়টি নিয়ে ভারতসহ সারাবিশ্বে আলোড়ন তৈরি হয়েছে, প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে বাদ পড়া এই বিপুল সংখ্যক মানুষের কী হবে? আলোচনার ঢেউ ছড়িয়েছে বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমসহ মূলধারার গণমাধ্যমে।
আসামের ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস বা এনআরসির প্রথম তালিকাটি প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে। বিপুল সংখ্যক মুসলমানদের আগমন হিন্দু-প্রধান আসামের জনসংখ্যার ভারসাম্যকে বদলে দিতে পারে এই আশঙ্কায় সেখানকার অসমীয়া জাতীয়তাবাদী দলগুলো আন্দোলন শুরু করে এবং নাগরিকত্বের প্রথম তালিকাটি তৈরি হয়। এরপরে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ওই ইস্যু আবারও চাঙ্গা হয়। প্রাণ বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নেয়া বাংলাদেশী শরনার্থীদের মধ্যে একটি বিরাট অংশ আশ্রয় নেয় আসামে। তাদের অনেকে সেসময় আসামে রয়ে গেছে দাবি করে অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু) ১৯৭৯ সালে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। ১৯৮৩ সালে এই আন্দোলন সহিংস রূপ নেয় যাতে ২০০০ সন্দেহভাজন অবৈধ অভিবাসী প্রাণ হারান। এদের বেশিরভাগই ছিলেন মুসলমান।
এই অবস্থায় ১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে একটা চুক্তিতে আসে। চুক্তিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চ আগে থেকে আসামের বাসিন্দা কেউ এমনটা প্রমাণ করতে না পারলে তাকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হবে এবং তাকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু চুক্তিটি কখনই বাস্তবায়ন করা হয়নি। এরপরে বিষয়টি ভারতের আদালত পর্যন্ত গড়ায়, তারপরে ২০১৪ সালে আদালত তালিকা ২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে হালনাগাদ করার জন্য কেন্দ্র সরকারকে আদেশ দেয়। নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য রাজ্যের সব অধিবাসীকে তাদের জমির দলিল, ভোটার আইডি এবং পাসপোর্টসহ নানা ধরনের প্রমাণপত্র দাখিল করতে বলা হয়। সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে প্রায় তিন কোটি ২০ লাখ মানুষের দলিলপত্র যাচাই করার পরে আসাম সরকার ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম খসড়া তালিকা প্রকাশ করে। যাচাই বাছাইয়ের পর ঐ খসড়ার দ্বিতীয় তালিকাটি প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই। ওই এনআরসিতে যাদের নাম রয়েছে তারা প্রমাণ করতে পেরেছেন যে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে তারা আসামে এসে হাজির হয়েছেন। এই প্রক্রিয়ায় ৪০ লাখ মানুষ এই তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান। এরপরে নির্বাচনের শোরগোল আর আন্দোলনের মুখে আবার তালিকা হাল নাগাদের কাজ হাতে নেয়া হয়, সেই তালিকাই প্রকাশ হয়েছে ৩১ আগস্ট। সেখানেও বাদ পড়েছে ১৯ লাখ মানুষ।
এইসব বাদ পড়াদের অধিকাংশই বাংলা ভাষাভাষী আর অনেকেই মুসলমান হওয়ায়, এদের তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ হিসেবে চিহ্নিত করে নিয়মিত উল্লেখ করে থাকেন আসামের স্থানীয় রাজনীতিবিদদের একটি অংশ। তাদেরকে ‘বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে’ বলে রাজনীতিবিদরা ঘোষণাও দিয়েছেন অনেকবার। তবে আশার কথা আসাম সরকার তালিকায় বাদ পড়াদের বিষয়ে জানিয়েছে, এনআরসি থেকে বাদ পড়া মানুষদের এখনই বিদেশী বলে ঘোষণা করা হবে না অথবা গ্রেপ্তারও করা হবে না। এদের বিদেশী ট্রাইবুনালে আবেদন করতে হবে আজ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে। তারা যদি বিচার করে বিদেশী বলে রায় দেন, তারপরেও হাইকোর্ট আর সুপ্রীম কোর্টের কাছে যে কেউ আবেদন জানাতে পারবেন।
এই পরিস্থিতিতে বর্তমান তালিকার পরে এই ১৯ লাখ মানুষের ঠিকানা কোথায় হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে নানা শঙ্কা তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে। তালিকা প্রকাশের পরপরই ৩১ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন, ‘আমরা মনে করি না যে তারা বাংলাদেশি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এস জয়শঙ্কর আমাকে বলেছেন যে এটি পুরোপুরি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং বাংলাদেশকে এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তিনি আরো বলেছেন যে কোনো পরিস্থিতিতেই বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না। তাই আমরা বিষয়টিকে সেভাবেই দেখছি’। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সফরে এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর একইসুরে কথা বলেছেন। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা মেনে নিলে ও বিশ্বাস করলে, বাংলাদেশের শঙ্কার কিছু নেই। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে অনেকাংশ মিল থাকায় আসামের বাদ পড়াদের নিয়েও স্বাভাবিকভাবে উদ্বেগ থাকছেই।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দায়িত্বশীলরা এই বিষয়ে কার্যকর মনোযোগ আর কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন বলে আমাদের আশাবাদ।






