আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ অবৈধ সরকার মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘আপনারা মানুষ মারেন, খুন করেন-গুম করেন। আমরা আপনাদের শুদ্ধ করবো। আমরা সহিংস রাজনীতি করি না। তবে আপনাদের মানুষ করার জন্য আমরা শুদ্ধি অভিযান চালাবো।’
৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির জনসভায় তিনি এমন মন্তব্য করেন। খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমরা আওয়ামী লীগের মতো গুম-খুনের রাজনীতি করি না। তারা বাস পোড়ায়। মানুষ মারে।’
বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, ‘আপনাদের অনেক মন্ত্রী বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশে মানুষ হত্যা করবে। এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত কথা, অপপ্রচার। আমরা সহিংস রাজনীতি করি না। আমরা প্রতিশোধের রাজনীতি করি না। তবে আপনাদের শুদ্ধ মানুষ করবো আমরা। কারণ আপনারা মানুষ মারেন, খুন করেন। সম্প্রতি ফেনীতে গাড়ি পুড়িয়েছে আওয়ামী লীগ। শেরাটনের সামনে যাত্রীবাহী বাসে গান পাউডার দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে। তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে আওয়ামী লীগ জামায়াত ১৭৩ দিন হরতালের নামে দেশে আগুন জ্বালিয়ে অরাজকতা চালিয়েছিলো।’
তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের অনেকে বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আপনাদের চাকরি থাকবে না। একথা আপনারা বিশ্বাস করবেন না। আমি জানি, আপনাদেরকে সরকারের নির্দেশ মেনে চলতে হয়। আমরা হিংসাত্মক রাজনীতি করি না। কিন্তু আমরা দক্ষতা আর যোগ্যতা বিবেচনা করে আপনাদের পদায়ন, পদোন্নতি করবো। আমি বলছি, আপনারা নির্ভয়ে কাজ করুন।’
খালেদা জিয়া অারো বলেন, ‘আমাদের রাজনীতি হলো জাতীয় ঐক্যের। আমরা বিশ্বাস করি বহুদলীয় গণতন্ত্রে। দেশে বহু মত, বহু পথ, বহু বহুদল থাকবে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থে সবাইকে এক হতে হবে। আমরা দেশের মানুষের জন্য জাতীয় ঐক্যের কথা বলছি। কিন্তু আওয়ামী লীগ তা চায় না। কারণ তারা মানুষকে ভয় পায়। তাই তারা মানুষের সমাবেশ করতে দিতে চায় না। বিএনপি শক্তি হলো দেশের মানুষ। আওয়ামী লীগ ৭ নভেম্বরকে ভয় পায়। কারণ এদিন দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তিত হয়। আর তারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় মানুষকে। তাই আজ সমাবেশে আসতে বাধা দিয়েছে। যানবাহন বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি আমি যেন সমাবেশে আসতে না পারি তার জন্য রাস্তায় খালি, চালকবিহীন বাস দিয়ে যানজট সৃষ্টি করেছে সরকার।’
‘গত দশ বছর ধরে আওয়ামী লীগ দেশের মানুষকে জুলুম নির্যাতন করছে। তারপরও আমি বলেছি, তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। কিন্তু দেশের মানুষ তা মানতে রাজি নয়। তারপরও আমরা বলছি, দেশে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে। দেশে কথা বলার স্বাধীনতা, ন্যায় বিচার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
বিএনপির চেয়ারপার্সন আরো বলেন, ‘আজ দেশের ঘরে ঘরে হাহাকার, কান্নার রোল। মানুষ অত্যাচারিত। মানুষ তাই পরিবর্তন চায়। এই পরিবর্তন হতে হবে নির্বাচনের মাধ্যমে। অবশ্য তা একটি নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। কোনভাবেই শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হতে পারবে না। নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। পুলিশ বাহিনীর ওপর আমাদের কোনো ক্ষোভ নেই। তারাও তাদের দায়িত্ব পালন করবে। তবে হাসিনার গুণ্ডাবাহিনী থেকে মানুষের ভোটকে নিরাপদ রাখতে হবে। মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।’
শেখ হাসিনার অধীনে ২০১৪ সালে কিভাবে নির্বাচন হয়েছে মানুষ দেখেছে। তেমন কোনো নির্বাচন হবে না। তারা ভোট চুরি করে। চুরি করে জেতার মধ্যে কোন আনন্দ নেই। যারা চুরি করে তারা জনগণকে পাশ কেটে যায়। জনগণের প্রতি তাদের কোন দায়িত্ব নেই। আমরা জনগণের ভোট নিশ্চিত করতে চাই।’
বিচার বিভাগে সরকারি নিয়ন্ত্রণের তীব্র সমালোচনা করেন খালেদা। বলেন, ‘আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যাওয়ায় আজ প্রধান বিচারপতিও রেহাই পায়নি। বিদায় নিতে হয়েছে।’
সরকার উন্নয়নের নামে লুটপাট চালাচ্ছে মন্তব্য করে খালেদা বলেন, ‘রাস্তা আর ব্রিজ নির্মাণে ইউরোপ আমেরিকার চেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে। শুধু ২০১৫ সালেই ৫ হাজার কোটি টাকা আওয়ামী লীগের পকেটে গেছে। ১০ বছরে সাড়ে চার লক্ষ কোটি টাকার বেশি বিদেশে পাচার করেছে। এসব বিদেশি সংস্থার তথ্য। আমাদের মনগড়া তথ্য নয়। শেয়ারবাজার শেষ করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার নামে করেছে বিশাল দুর্নীতি। মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে চায় না। নিরাপদ নয় বলে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। কিন্তু এর বিচার হয় না। দুর্নীতি দমন কমিশন এসব চোখে দেখে না। তারা আছে আমাদের নিয়ে ব্যস্ত।’
বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, ‘বেকার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বলা হয়েছিলো ঘরে ঘরে চাকরি দিবে। তার পরিবর্তে সরকার ঘরে ঘরে বেকার সৃষ্টি করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সন্ত্রাস চলছে। তারা শিক্ষকের ওপরও আক্রমণ চালায়। ছাত্রীরা নিরাপদ নয়। নারী নির্যাতন করে। এসব বন্ধ করতে হবে। গুম-খুন বন্ধ করতে হবে। বিদেশিরা সব জানে। গুম খুন হয় তার তথ্য আছে সবার কাছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের মানুষের কোন ভবিষ্যৎ নেই মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, দেশের মানুষ বাঁচলো কি মরলো তাতে আওয়ামী লীগের কিছু যায় আসে না। তাই দেশে আইনের শাসন দরকার। পরিবর্তন দরকার। তার জন্য অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে হবে।
খালেদা জিয়া এসময় নির্বাচিত হলে কি কাজ করবেন তা বলেন। ২০৩০ ভিশনের কথা উল্লেখ করে বলেন, আমরা দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে চাই। আলাপ-আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখতে চাই। আমরা গণতান্ত্রিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবো। বেকার-নারী-পুরুষের জন্য দেশে বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবো। ১ বছর বেশি বেকারদের বেকার ভাতা দিব। সকল ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক করবো। ছাত্রীদের উপবৃত্তি, নাগরিকদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করবো, কৃষি বিপ্লবে কাজ করবো, গ্রামের উন্নয়নে পদক্ষেপ নেয়া হবে। সর্বোপরি টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। দেশকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে হবে।’
তিনি সবশেষে বিএনপির প্রতি মানুষকে আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। লন্ডনে চিকিৎসার জন্য গেলে অনেকে বলেছে আমি নাকি দেশে আসবো না। কিন্তু আমি ফিরে এসেছি। কারণ আমার যাওয়ার আর কোন জায়গা নেই। বাংলাদেশই আমার ঠিকানা।’
দুপুর আড়াইটায় গুলশান বাসা থেকে বের হয়ে বিকেল সাড়ে ৩টায় খালেদা জিয়া সমাবেশে এসে পৌঁছেন। ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে দুপুর ২টায় জনসভা শুরু হয় বিএনপির।
ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক, মহিলা দলের নেতৃবৃন্দের বক্তব্যের মধ্যদিয়ে শুরু জনসভা শুরু হয়। এরপর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টারা, ভাইস চেয়ারম্যানবৃন্দ, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।









