চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পজিটিভ ভাবনা থাকলে জীবন থমকে যায় না

সবার জীবনের গল্প এক হয় না। বহতা নদীর মতো মানুষের জীবনের বাঁকে বাঁকে থাকে উত্থান পতন। কিন্তু আমাদের সমাজে নারীদের প্রতি আরোপিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে ওঠে সমালোচনার ঝড়। যার প্রমাণ সাম্প্রতিক সময়ে গুলতেকিন খানের ৫৬ বছর বয়সের বিয়ে।

দিন বদলেছে তবে মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি বলে গুলতেকিনের বিয়ে কারো কারো দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। স্বামীর সাথে ডির্ভোসের দীর্ঘ সময় পার করার পরেও তাকে পরিচয় দিতে হয় হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রী হিসাবে। যার কোন যুক্তি বা ব্যাখ্যা নেই। গুলতেকিন সমাজের ট্যাবু ভাঙতে পেরেছে তার জন্য সাধুবাদ।

বিজ্ঞাপন

একজন নারী স্বামী ছাড়া জীবনে সন্তানদের আগলে রেখে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিবে এটাই যেন চিরাচরিত নিয়ম। তার ব্যক্তি জীবনের ভালো লাগা মন্দ লাগা কিংবা আপন জগত বলে কিছু থাকতে পারে না।

‘দ্বিতীয় বিয়ে’ শব্দটা নারীদের জন্য সহজ নয়। পরিবার, সমাজ লোকের কানাকানির অন্ত থাকে না এ নিয়ে। মানুষ ভুলে যায় বিয়ে বা বিচ্ছেদ নারী ও পুরুষের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। সেখানে দুজন মানুষের আবেগ অনুভূতি বাস্তবতার অংকটা মেলাতে গিয়ে গরমিল হলে বিচ্ছেদ আসে। আর বিচ্ছেদ হলে জীবন থমকে যায় না।

প্রতিটি সম্পর্ককে একভাবে বিচার করা যায় না। সময় ও জীবনের চাওয়া পাওয়ার সাথে মনের ভাবনা, আবেগ, ভালোবাসা জড়িত। আর এক্ষেত্রে বয়সের হিসাবটা তুচ্ছ। তাই গুলতেকিনকে নিয়ে কটাক্ষ করার আগে একবার অনুধাবন করুন বিয়ে শব্দটার গভীরতা।

সামাজিক বিধিবিধানে নারী পুরুষ সাধারণত বিয়ে করে সংসার গড়ে। বিয়ের মাধ্যমে সন্তান জন্ম, তাদের লালন পালন ও পরিবারিক সম্পর্কের বন্ধন হয় ভালোবাসার বাঁধনে। তবে এ বাঁধনের সুর যখন কেটে যায়, তখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায় সবগুলো সম্পর্ক। স্বামী স্ত্রীর দোষগুণ বিশ্লেষণ করার চেয়ে মুখ্য হয় আগামী দিনের পথ চলা। সেক্ষেত্রে আসে দ্বিতীয় বিয়ের বিষয় সেখানে বিপত্তি ঘটে নারীর বেলায়। কোন নারীর দ্বিতীয় বিয়েকে খুব সহজে মানতে চায় না সমাজ।

গুলতেকিনের দ্বিতীয় বিয়ে
হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে গুলতেকিন

বিজ্ঞাপন

এ অবস্থায় মধ্য বয়সের নারী সন্তানদের বিয়েথার পর আবার বিয়ে করবে এটা কল্পনাতীত বিষয়। কারণ এ সমাজের চোখে তার জীবন ফুরিয়ে গেছে। এ বয়সে নাতি-নাতনি ছেলে মেয়েদের ঘর সংসার দেখভাল করবে৷ বিয়ে করার কি দরকার-এমনটাই মনে করে মানুষ। কিন্তু পরিণত বয়সের একজন নারীর জীবনে আবেগ ভালোবাসা, অনুভূতি, চিন্তা চেতনার জন্য যদি পাশে কেউ থাকে তাকে ভিন্ন চোখে দেখার কোন যুক্তি নাই। আর সে পাশে থাকা মানুষটি যদি চলার সাথী হয় তা নিয়ে পজিটিভ ভাবনার জন্য সাহস লাগে।

এমনই সাহস ছিল বলেই গুলতেকিন সুন্দর সাবলীলভাবে বুন্ধত্বকে সামাজিকভাবে বিয়েতে রূপ দিতে পেরেছেন। যেখানে পরিবারের মুক্তচিন্তার প্রকাশ দেখা যায় গণমাধ্যমে তার ছেলে নুহাশের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘মা শক্ত হাতে আমাদের বড় করেছেন। কখনও কোনও অভাব বুঝতে দেননি। মা সবসময়ই আমাদের কাছে আইডল। মা যখন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তখন আমার কোনও দুঃখবোধ ছিল না। বরং আমি অনেক খুশি হয়েছি। আমি মায়ের সঙ্গেই ছিলাম এ ব্যাপারে। তাদের জন্য সকলের কাছে দোয়া চাচ্ছি। আমি নিজে থেকে মায়ের বিয়ে দিয়েছি। আর এটা লুকানোর কিছু নেই। সামনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানও হবে। এটা নারীদের জন্য নতুন একটা দ্বার উন্মোচন হলো বলতে পারেন।’

উন্নত বিশ্বে এমন ঘটনায় অবাক বা হতবাক হবার মতো কিছু নয়। উদারমনা সে সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তিজীবনের প্রাধান্য থাকে। সে নারী বা পুরুষ যেই হোক। তবে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় নারীর থমকে যাওয়া জীবনের ট্যাবু ভাঙতে গুলতেকিন একটি উদাহরণ। প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সাথে ডিভোর্সের ১৬ বছর পর জীবনসাথী হিসাবে কবি আফতাব আহমদকে নিয়ে আগামীর পথচলা কতটা মনের টানে তা উঠে এসেছে তাদের কাব্যিক মনের ভাবনায়। আত্মিক প্রশান্তি খুঁজে তাই দুজনে কাছে থাকার আলাপচারিতাকে আফতাব আহমদ তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে কাব্যময় করে বলেন: ‘তিনি আমাকে তার সামনে বসালেন এবং আমার হাতে হাত রেখে বললেন, ‘প্রত্যেকেরই মৃত্যুর স্বাদ পেতে হবে। কিন্তু আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাই না। আমি নিঃশ্বাস নিতে চাই। তবে নিশ্চিত নই ভবিষ্যৎ কোন নিয়তিতে গাঁথা’।’

আফতাব আহমদ জবাবে বললেন, ‘আমি চেষ্টা করব তোমাকে বাঁচাতে কিন্তু তোমাকে বিয়ে করা ছাড়া এটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’গুলতেকিনের দ্বিতীয় বিয়ে

এ সময় একটু বিরতি নিয়ে গুলতেকিন বললেন, ‘‘তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?’ এবং আমি অনুমান করতে পারি, আমরা দুজনেই কোনো কারণ ছাড়া এক সঙ্গে হতে পারব না।’ ( ইংরেজি অনুবাদ)

সর্বোপরি একজন নারীর সন্তান পরিবার নিয়ে লড়াই সংগ্রামের সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার রয়েছে। আর সে অধিকারকে ধারণ করার মতো সাহস যেমন তার থাকা দরকার। তেমনি এ নারীদের নিয়ে পজিটিভ চিন্তা করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে সমাজকে। তবেই গুলতেকিনের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে সকলে বলতে পারবে ‘এবার বাতাস উঠুক তুফান ছুটুক’।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)