মতামত

নাসিমা খান ও হারিয়ে যাওয়া এক স্বর্ণালি সময়

নাসিমা খান ও হারিয়ে যাওয়া এক স্বর্ণালি সময়

‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’ কথাটি যথার্থ। এমন মূল্যবান উপলব্ধি পাঠ্যবইয়ে যেমন মানায়, তেমনি জীবনের নানা ক্ষেত্রেও এর তাৎপর্য রয়েছে। একজন শিক্ষককে পাঠদানরত অবস্থায় যতটা সুন্দর ও মানানসই দেখায়, অন্য সময় বা অন্য কোনো কাজে তাকে হয়তো ততটা মানায় না। প্রত্যেক মানুষ যখন নিজ নিজ দায়িত্ব ও পেশায় নিষ্ঠার সঙ্গে নিয়োজিত থাকেন, তখন তার ব্যক্তিত্ব ও কর্মদক্ষতা সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশ পায়।

তেমনি একজন চিকিৎসক রোগীর সেবায়, একজন আইনজীবী আইনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনে, একজন সংবাদকর্মী সত্য তুলে ধরতে এবং একজন সেবিকা মমতা দিয়ে রোগীর পাশে দাঁড়ালে তাদের পেশাগত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। একইভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালন, জেলের মাছ ধরা, কৃষকের মাঠে ফসল ফলানো, কামারের লোহা পেটানো কিংবা কুমারের হাতে মাটির পাত্র তৈরির দৃশ্যেও রয়েছে নিজস্ব সৌন্দর্য। প্রত্যেকের কাজের মধ্যে যে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নিষ্ঠা লুকিয়ে থাকে, তা-ই তাদের স্বতন্ত্র করে তোলে।

তবে অভিনয়শিল্পীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। তারা অভিনয়ের মাধ্যমে অন্যের জীবনকে ধারণ করেন। কখনো কৃষক, কখনো চিকিৎসক, কখনো আইনজীবী, আবার কখনো শ্রমজীবী মানুষের চরিত্রে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন। তাদের সাফল্য এখানেই, পর্দায় তারা যখন কোনো চরিত্র হয়ে ওঠেন, দর্শক তখন অভিনেতাকে ভুলে চরিত্রটির সঙ্গেই একাত্ম হন।

সদ্য প্রয়াত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী নাসিম খানও তার অভিনয়ের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রজগতে অবদান রেখে গেছেন। ষাট ও সত্তরের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি উর্দু চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি। তার সিনেমা খুব বেশি দেখা হয়নি আমার। ছোটবেলায় চিত্রালী কিংবা ঝিনুকে কলসি কাঁখে তার একটি ছবি দেখেছিলাম বলে মনে পড়ে। তখন সবে বানান করে পড়তে শিখেছি। ঢেউয়ের পরে ঢেউ সিনেমাটিও হলে গিয়ে দেখেছিলাম, কিন্তু সেখানে নাসিমা খান কোন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, তা মনে নেই।

নাসিমা খানের মতো শিল্পীদের অবদান বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় ষাট ও সত্তরের দশকের দিকে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংগীতের ইতিহাসে এ সময়কে স্বর্ণালি অধ্যায় বলা হয়। অভিনয়শিল্পী ও সংগীতশিল্পীরা তাদের মেধা, শ্রম ও সৃষ্টিশীলতা দিয়ে যে ভিত্তি গড়ে গেছেন, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাদের কাজের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে দর্শক-শ্রোতার রুচি, তৈরি হয়েছে স্মরণীয় চরিত্র ও গান, সমৃদ্ধ হয়েছে আমাদের সাংস্কৃতিক ভুবন।

সংগীতের কথাই ধরা যাক। সাবিনা ইয়াসমিন কিংবা রুনা লায়লা হওয়া কি চাইলেই সম্ভব? তাদের কণ্ঠ, গায়কির স্বাতন্ত্র্য, সাধনা ও দীর্ঘদিনের পরিশ্রমই তাদের কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছে। একবার আড়ালে সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে গান শুনে কেউ একজন বলেছিলেন, ‘সাবিনা ইয়াসমিন হইবার চায়।’ কথাটির মধ্যে কৌতুক থাকলেও একজন শিল্পীর স্বতন্ত্র পরিচয়ের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আবার রুনা লায়লার কণ্ঠে ‘দমাদম মস্ত কালান্দার’ শুনে আমরা ছোটবেলা থেকেই তাকে চিনেছি। চলচ্চিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা পর্দায় ঠোঁট মিলিয়েছেন, আর কণ্ঠের জাদুতে গানকে প্রাণ দিয়েছেন সংগীতশিল্পীরা। এখানে প্রত্যেকের অবদান আলাদা, কিন্তু পরস্পরের পরিপূরক।

চলচ্চিত্রে অভিনয়শিল্পীদের বহুরূপী হয়ে ওঠার বিষয়টি আরও বিস্ময়কর। ছুটির ঘণ্টা ছবিতে শাবানাকে ঝাড়ুদারের ভূমিকায় দেখে চরিত্রটিকে বাস্তব বলে মনে হয়। মানসী ছবিতে রোজিনার নার্সের চরিত্র কিংবা রংবাজ ছবিতে রাজ্জাকের পকেটমারের ভূমিকাও দর্শকের মনে আলাদা ছাপ ফেলে। চোখের জল ছবিতে কবরীকে আইনজীবীর চরিত্রে দেখলেও দর্শক তার অভিনয়ের বিশ্বাসযোগ্যতার মধ্য দিয়ে চরিত্রটিকে গ্রহণ করেন। একজন শিল্পী যখন নিজেকে আড়াল করে চরিত্রটিকে সামনে নিয়ে আসতে পারেন, তখনই তার অভিনয় সার্থক হয়ে ওঠে। দর্শক ভুলে যান, পর্দার মানুষটি আসলে একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রী। তারা চরিত্রটির হাসি-কান্না, দুঃখ-বেদনা ও সংগ্রামের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়েন।

চলচ্চিত্র ও নাটক শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, মানুষের জীবন ও সমাজকে বোঝারও মাধ্যম। একজন শিল্পীর অভিনয়ের মধ্য দিয়ে আমরা মানবিকতা, ত্যাগ, নৈতিকতা ও জীবনসংগ্রামের নানা দিক জানতে পারি। কখনো একটি চরিত্রের কষ্ট কিংবা একটি সংলাপ মানুষের মনে এমনভাবে দাগ কাটে, যা দীর্ঘ উপদেশেও সম্ভব হয় না।

নাসিমা খানের মতো শিল্পীদের বিদায়ে তাই শুধু একজন মানুষের প্রয়াণ ঘটে না, একটি সময়ের স্মৃতিরও বিদায় ঘটে। তাদের কাজের সবটুকু হয়তো আমরা দেখিনি, তাদের জীবনের সব গল্পও জানি না। তবু চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাদের অংশগ্রহণ, অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়া এবং আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সমৃদ্ধ করার অবদান তাদের স্মরণীয় করে রাখে।

বিষয়:ছুটির ঘণ্টা নাসিমা নাসিমা খান রুনা লায়লা শবনম শাবানা

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…