বাংলাদেশ

সৌর বিদ্যুতে আসল চ্যালেঞ্জ কী?

সৌর বিদ্যুতে আসল চ্যালেঞ্জ কী?

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা অনেক হলেও নানা কারণে সেই সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে: জমির সংকট, উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, গ্রিড-সুবিধার দুর্বলতা এবং নীতিগত জটিলতা। আমদানিনির্ভর জ্বালানির চাপ কমাতে এবং বিদ্যুৎ খাতকে আরও টেকসই করতে সৌরশক্তিকে সামনে আনা হলেও দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এর অবস্থান এখনো সীমিত। তবে শিল্পকারখানার ছাদ, সৌরসেচ এবং বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এই খাতকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। 

এমন প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হয়েছে দুই দিনের বাংলাদেশ সোলার এক্সপো ২০২৬। প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং আইডকল যৌথভাবে প্রথমবারের মতো এই আয়োজন করেছে। আয়োজকদের ভাষ্য, সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি, সরকারি প্রণোদনা, অর্থায়নের সুযোগ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্র তুলে ধরাই এই এক্সপোর মূল উদ্দেশ্য।

এক্সপোটির প্রতিপাদ্য রাখা হয়েছে: ছাদের প্রতিটি ইঞ্চি কাজে লাগান, সৌরবিদ্যুতে আয় বাড়ান। এতে নীতিনির্ধারক, সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি সরবরাহকারী ও উদ্যোক্তারা অংশ নিচ্ছেন। প্রদর্শনীতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সৌরসেচ, কর-শুল্ক সুবিধা, গ্রিন ফাইন্যান্স, কার্বন ক্রেডিট এবং দক্ষতা উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়ও তুলে ধরা হচ্ছে।

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত বিদ্যুৎবিহীন এলাকায় সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে। পরে গ্রিডভিত্তিক সৌরকেন্দ্র, শিল্পকারখানার ছাদে সৌরপ্যানেল এবং নেট মিটারিংয়ের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে খাতটি ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়। কিন্তু জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার তুলনায় এই অগ্রগতি এখনো অনেক কম।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিপিডিবির বিদ্যুৎকেন্দ্রভিত্তিক স্থাপিত সৌর সক্ষমতা ৭৯৭ মেগাওয়াট। অন্যদিকে সরকারি হিসাবে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ছিল ৪১৮ দশমিক ১ মেগাওয়াট। তবে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইইএফএর হিসাবে, শুধু ২৩৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পগোষ্ঠীতেই ছাদভিত্তিক সৌর সক্ষমতা ৬৬৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে; ছোট স্থাপনাগুলো যুক্ত করলে তা প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি হতে পারে। এতে বোঝা যায়, সৌরবিদ্যুতের প্রকৃত বিস্তার সরকারি নিবন্ধনের তুলনায় আরও বেশি হবে।

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য পূরণে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক এবং ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান অগ্রগতি বিবেচনায় এই লক্ষ্য অর্জনে বাস্তবায়নের গতি অনেক বাড়াতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ওষুধ ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পে দিনের বেলায় বিদ্যুতের বড় চাহিদা থাকে। সেই চাহিদার একটি অংশ ছাদে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, উৎপাদন ব্যয়ও দীর্ঘমেয়াদে কমবে।

কৃষি খাতেও সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা বড়। আইইইএফএর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে সৌরসেচে রূপান্তর করা গেলে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট নতুন সৌর সক্ষমতা যোগ হতে পারে। এর ফলে বছরে প্রায় ২৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ডিজেল আমদানি ব্যয় সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে।

তবে বাস্তবতার জায়গায় বড় বাধা হয়ে আছে জমি। ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বড় সৌরকেন্দ্রের জন্য উপযুক্ত জমি পাওয়া কঠিন। এর পাশাপাশি রয়েছে উচ্চ সুদের ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, আমদানিনির্ভর যন্ত্রপাতি, অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা এবং গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযোজনের সীমাবদ্ধতা। সৌরবিদ্যুৎ দিনের বেলায় উৎপাদিত হলেও চাহিদা থাকে দিন-রাতজুড়ে, ফলে ব্যাটারি সংরক্ষণ ও গ্রিড আধুনিকায়নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

জ্বালানি আমদানি ব্যয় এবং বৈশ্বিক দামের অস্থিরতার মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য কেবল পরিবেশবান্ধব বিকল্প নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনও বটে। কিন্তু এই খাতকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু প্রদর্শনী বা নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট হবে না; দ্রুত বাস্তবায়ন, সাশ্রয়ী অর্থায়ন, নির্ভরযোগ্য ডাটা, কর-শুল্ক সহায়তা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য কার্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সেই অর্থে আজকের সোলার এক্সপো আলোচনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করলেও, এর সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাস্তবে কত দ্রুত নতুন সৌর সক্ষমতা যুক্ত হয় তার ওপর।

বিষয়:আমদানিনির্ভর জ্বালানি চ্যালেঞ্জ টেকসই সৌর বিদ্যুৎ

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…