যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন: যেভাবে প্রভাবিত হতে পারে পুঁজিবাজার ও তেলের দাম

ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল সে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই নির্ধারণ করে না, বরং এর প্রভাব পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও।
মার্কিন কংগ্রেসের (প্রতিনিধি সভা ও সিনেট) নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে যাচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে ওয়াল স্ট্রিটের পুঁজিবাজার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম পর্যন্ত ওঠানামা করে।
পুঁজিবাজারে ‘রাজনৈতিক অচলাবস্থা’র প্রভাব
পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নীতিগত স্থিতিশীলতা পছন্দ করেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনে যদি হোয়াইট হাউস (প্রেসিডেন্ট) এক দলের কাছে থাকে এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ অন্য দলের (বিরোধী দল) হাতে চলে যায়, তবে তাকে বলা হয় ‘রাজনৈতিক গ্রিডলক’ বা অচলাবস্থা।
কেন এটি বাজারের জন্য ইতিবাচক:
গ্রিডলক থাকলে সরকার চাইলেই হুট করে কর বৃদ্ধি বা বড় কোনো করপোরেট আইন পরিবর্তন করতে পারে না। এই নীতিগত অনিশ্চয়তা কমে যাওয়ার কারণে ঐতিহাসিকভাবেই দেখা গেছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর মার্কিন শেয়ারবাজার ভালো পারফর্ম করে।
দলের ভিত্তিতে প্রভাব:
যদি রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তবে তারা করপোরেট কর হ্রাস এবং ব্যবসার ওপর থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমানোর পক্ষে অবস্থান নেয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে পুঁজিবাজারকে চাঙ্গা করতে পারে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন নীতিমালার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা সংশ্লিষ্ট খাতের শেয়ারে প্রভাব ফেলে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ
জ্বালানি নীতি নিয়ে ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকানদের মধ্যে স্পষ্ট আদর্শিক পার্থক্য রয়েছে। ফলে নির্বাচনের ফলাফলের ওপর তেলের বাজারের ওঠানামা অনেকাংশে নির্ভরশীল।
রিপাবলিকানদের আধিপত্য ও তেলের দাম: রিপাবলিকানরা সাধারণত ‘ড্রিল, বেবি, ড্রিল’ নীতিতে বিশ্বাসী। অর্থাৎ, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জীবাশ্ম জ্বালানি বা তেল ও গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে আগ্রহী। কংগ্রেসে তাদের নিয়ন্ত্রণ এলে মার্কিন তেল উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে। বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে তেলের দাম কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
ডেমোক্র্যাটদের নীতি ও প্রভাব: ডেমোক্র্যাটরা পরিবেশ রক্ষা এবং গ্রিন এনার্জি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দেয়। তারা জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলনে কঠোর নিয়মকানুন আরোপ করতে পারে। এর ফলে মার্কিন অভ্যন্তরীণ তেল উৎপাদন সীমিত হলে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের পূর্বাভাস থাকলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে।
ভূ-রাজনীতি ও নিষেধাজ্ঞা: কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের ওপর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও বিভিন্ন দেশের (যেমন ইরান বা রাশিয়া) ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও জড়িত। কঠোর নিষেধাজ্ঞার নীতি বজায় থাকলে বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যায়, যা দাম বাড়িয়ে দেয়।
ডলারের মান ও বৈশ্বিক বাজারের সংযোগ
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যয় এবং বাজেট ঘাটতি কেমন হবে। যদি নতুন দল ক্ষমতায় এসে সরকারি ব্যয় কমানোর চাপ দেয়, তবে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক (Fed) সুদের হার নিয়ে তাদের নীতি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। এর ফলে মার্কিন ডলারের মান শক্তিশালী বা দুর্বল হতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে এশিয়াসহ বিশ্ব পুঁজিবাজারে এবং সোনা ও তেলের মতো আন্তর্জাতিক পণ্যের মূল্যে।
ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নির্বাচনের আগের দিনগুলোতে বাজারে এক ধরণের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা কাজ করে। তবে ভোটের ফলাফল পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পর সাধারণত বাজার তার নিজস্ব গতিতে ফিরে আসে। বিনিয়োগকারীরা এখন গভীর নজর রাখছেন ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে মোড় নেয়, কারণ সেখান থেকেই নির্ধারিত হবে আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ।






