সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ডাক
‘ঘোর আঁধারে পথ দেখাবে আগুনের নিশান’- স্লোগানে উদীচীর চতুর্দশ ঢাকা মহানগর সম্মেলন

“সাম্প্রদায়িক অপশক্তির প্রত্যক্ষ মদদে এদেশে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ঘটেছে”- বাংলাদেশের বৃহত্তম সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচীর চতুর্দশ ঢাকা মহানগর সম্মেলনের উদ্বোধনে এমন মন্তব্যই করেছেন আগত অতিথিরা।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে দিনব্যাপী শুরু হয়েছে চতুর্দশ ঢাকা মহানগর সম্মেলন। সংগঠনটির সম্মেলনকে কেন্দ্র করে এইবারের স্লোগান- “ঘোর আঁধারে পথ দেখাবে আগুনের নিশান”।
অনুষ্ঠানে সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে সংস্কৃতির বিকাশের প্রয়োজনীয়তাকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দেন সংগঠন সংশ্লিষ্ট সকলে।
এসময় তারা বলেন, সাম্প্রদায়িক অপশক্তির প্রত্যক্ষ মদদে এদেশে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ঘটেছে। আর বিভিন্ন সময়ে দেশের সরকার নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িকতাকে বাড়তে দিয়েছে। এমতাবস্থায় অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিকাশের প্রয়োজনীয়তার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন সংগঠনের নেতারা।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নন্দনমঞ্চের পাশের চত্ত্বরে দলীয় গান পরিবেশনের মাধ্যমে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এরপর উপস্থিত বিভিন্ন অতিথিরা ও সংগঠনটির সদস্যদের সাথে জাতীয় সংগীতের সাথে জাতীয় পতাকা ও সংগঠনটির পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন বাউলশিল্পী আবুল সরকার মহারাজ।
এরপরই সংগঠনটির একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা শিল্পকলা একাডেমি থেকে প্রেসক্লাব, পুরানা পল্টন, সেগুন বাগিচা এলাকা প্রদক্ষিণ করে পুনরায় শিল্পকলা একাডেমিতে ফিরে আসে।
শোভাযাত্রা শেষে জাতীয় নাট্যশালা ভবনের সেমিনার হলে সম্মেলনের আলোচনা পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। উদীচী ঢাকা মহানগর সংসদের আহ্বায়ক ইকবাবুল হক খানের সভাপতিত্বে ও আরিফ নূরের সঞ্চালনায় আলোচনা পর্বে বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি তামজিদ হায়দার চঞ্চল, বাংলাদেশ আবৃত্তি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক গণসংগীতশিল্পী আমিরুন নুজহাত মনীষা, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সহসভাপতি কবি কামরুজ্জামান ভুঁইয়া, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন, সম্মেলনের উদ্বোধক বাউলশিল্পী আবুল সরকার মহারাজ, বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নৃত্যগুরু সাজু আহমেদ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম প্রমুখ।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি তামজিদ হায়দার চঞ্চল উদীচীর বিভিন্ন শাখায়, ছায়ানটে হামলা, বাউলশিল্পী আবুল সরকার মহারাজের কারাবরণ প্রভৃতি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, আজকের সম্মেলন লড়াইয়ের বার্তা দেওয়ার সম্মেলন।
যেখানে তিনি সকল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিগত স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে উদীচী, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহের ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক ও গণসংগীতশিল্পী আমিরুন নুজহাত মনীষা বলেন, এদেশের মাটিটাই এমন এদেশে শান্তি দীর্ঘদিন বিরাজ করে না, শান্তিতে থাকতে চাইলে লড়াই করেই সেই শান্তি আনতে হবে।
আশি, নব্বইয়ের দশকের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জেও ভোরবেলা শিশুদের গান গাওয়ার রেওয়াজ শোনা যেত, নুপূরের ধ্বনি শোনা যেত। আমরা এগুলি হারিয়ে ফেলিনি, হারিয়ে ফেলতে হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের মত প্রকাশের জন্যও লড়াই করতে হয়। এসময় তিনি সংস্কৃতিচর্চার জন্য লড়াইয়ের কথা বলেন।
সম্মেলনের উদ্বোধক বাউলশিল্পী আবুল সরকার মহারাজ তার বক্তব্যে বলেন, তিনি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নন। তিনি দীর্ঘদিন কারাবন্দী ছিলেন। গানকে তার প্রতিবাদের ভাষা বানিয়েছেন।
তিনি গানে গানে বলেছেন,“বিচারের নামেও বিচার গেল না/ বিবেক-বুদ্ধি হারাইয়া জ্ঞানীরা সব দিনকানা/ বিচারের নামেও বিচার গেল না।/ এদেশের যত আইনজীবী, সর্বোচ্চ ধোকাবাজী/ তাদের মতো এত পাজি, কামলা কৃষাণ কয়জ না…।”
এভাবেই সকল বক্তা সংস্কৃতিচর্চার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, দেশের স্বার্থে সংস্কৃতি চর্চাকে লড়াইয়ের হাতিয়ার বানাতে বলেছেন।
বিকেল তিনটায় কাউন্সিল অধিবেশনে নতুন কমিটি নির্বাচন করে সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শেষ হবে উদীচীর ঢাকা মহানগরের চতুর্দশ সম্মেলন।
ছবি: সালজার সালেকিন






