শ্রীমঙ্গলের সবুজে দুদিন: চা-বাগান, মাধবপুর লেক ও শাড়ির মায়া

প্রতিনিধির পাঠানো ছবি
হুটহাট বেরিয়ে পড়ার মধ্যে একটা আলাদা আনন্দ আছে। কোথায় যাব, কী দেখব, কী খাব এসব নিয়ে বেশি হিসাব-নিকাশ করলে ভ্রমণের অর্ধেক আনন্দ আগেই মাটি হয়ে যায়। আমাদের ভ্রমণদর্শন সহজ: আগে বেরিয়ে পড়ো, তারপর দেখা যাবে! সেই দর্শন অনুসরণ করেই এবার ছয়জনের একটি দল পাড়ি জমালাম চায়ের দেশ শ্রীমঙ্গলে। রংপুর থেকে এসেছেন ডা. হরিপদ সরকার, আমাদের প্রিয় হিমেনদা, সঙ্গে শিলা বৌদি। ববি, আমি, ত্রিদিব ও পরিমল সব মিলিয়ে ছয়জনের দল। একটি ভাড়া করা মাইক্রোবাসও জুটে গেল। ভ্রমণের জন্য এর চেয়ে আদর্শ ব্যবস্থা আর কী হতে পারে! অবশ্য চালক মহাশয় আমাদের আনন্দের অংশীদার হয়েছিলেন, নাকি যাত্রীদের উচ্ছ্বাসে মনে মনে বিরক্ত, তা জানার উপায় ছিল না।
শুক্রবার সকালে ঢাকার যানজট, হর্ন আর নাগরিক জীবনের যাবতীয় বিরক্তি পেছনে ফেলে রওনা হলাম। দুপুর প্রায় দুইটায় পৌঁছলাম শ্রীমঙ্গলে। আমাদের আবাসস্থল ব্র্যাক বিএলসি ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন, চমৎকার সাজানো-গোছানো একটি জায়গা। সেখানে ঢুকেই মনে হলো, এমন পরিবেশে কয়েক দিন কাটালে শরীর-মন দুটোই নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে। যদিও আমাদের সেখানে থাকার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল খাওয়া আর রাতে ঘুমানো। পর্যটনস্থল ঘুরতে এসেছি, ঘরবন্দি হয়ে থাকার জন্য নয়। ভ্রমণকারীদের কাছে সুন্দর আবাসস্থলও অনেকটা বিলাসবহুল খাঁচা—রাত কাটানোর জন্য চমৎকার, কিন্তু দিনের আলোয় যার দরজা খোলা রাখাই শ্রেয়।

বিএলসিতে আগেই খাবারের অর্ডার দেওয়া ছিল। ভাজি, ভর্তা, মাছ, মাংস, ডাল, সবজি—বাংলাদেশি ভ্রমণকারীর পেট ও মন জয় করার যাবতীয় আয়োজন। ভ্রমণের প্রথম শর্তই হলো পেটকে সন্তুষ্ট রাখা। খালি পেটে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে গেলে পাহাড়, গাছপালা, লেক—সবকিছুকেই সম্ভাব্য খাদ্যবস্তু বলে মনে হতে পারে! পেটপুরে খেয়ে আমরা রওনা দিলাম মাধবপুর লেকের দিকে।
শ্রীমঙ্গল থেকে মাধবপুর যাওয়ার পথটিও ভ্রমণের বাড়তি আকর্ষণ। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের কাছ দিয়ে যেতে হয় ঘন বনভূমির ভেতর দিয়ে। দুপাশে উঁচু গাছ, নিবিড় ছায়া আর রহস্যময় সবুজ। কোথাও মনে হয়, প্রকৃতি নিজেই রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। আবার কোথাও এমন গা ছমছমে পরিবেশ যে, হঠাৎ কোনো বাঘ সামনে এসে দাঁড়ালে তাকে দোষ দেওয়া যাবে না। বাঘ না থাকলেও বনভূমির গভীরতা কল্পনাকে যথেষ্ট উত্তেজিত করে।
মাধবপুর লেকে পৌঁছে বুঝলাম, প্রকৃতির সৌন্দর্যের জন্য খুব বেশি সাজসজ্জার প্রয়োজন হয় না। চারদিকে সবুজ পাহাড়, চা-বাগানের ঢেউখেলানো বিস্তার আর জলের ওপর আকাশের প্রতিবিম্ব—সব মিলিয়ে অপূর্ব এক দৃশ্য। লেক যেন প্রকৃতির আয়না, আর চারপাশের সবুজ তার নিখুঁত ফ্রেম। হেমন্তের বিকেল। সূর্য পশ্চিম আকাশে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। আলো কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে লেকের সৌন্দর্যে যোগ হলো এক ধরনের মায়াবী রহস্য। এমন পরিবেশে ছবি তোলার চেয়ে চোখ দিয়ে দৃশ্যটিকে মনের মধ্যে ধরে রাখাই বেশি জরুরি মনে হচ্ছিল। অবশ্য আমাদের দলের ছবি তোলার উৎসাহও কম নয়। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নিজেদের সৌন্দর্যও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা দরকার!

লেকের সৌন্দর্য চোখে-মনে জমিয়ে ফেরার পথে শ্রীমঙ্গলের বিখ্যাত ছোট আকারের আনারসের সন্ধান পেলাম। আকারে ছোট, কিন্তু স্বাদে বেশ বড়সড়! এমন মিষ্টি, রসালো আনারস সামনে থাকলে খাদ্যসংযমের পরীক্ষা নেওয়া রীতিমতো নিষ্ঠুরতা। আমরা আনারসের স্বাদ নিলাম। প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখার পর প্রকৃতির এই মিষ্টি উপহার মুখে পুরে দেওয়ার মধ্যে আলাদা আনন্দ আছে। শ্রীমঙ্গল যেন বলল, চা-বাগান দেখিয়েছি, লেক দেখিয়েছি, এবার একটু ফলের রসেও ডুব দাও!
আনারস পর্ব শেষ হতেই শুরু হলো মণিপুরি শাড়ির অভিযান। এই অভিযানের প্রধান সেনাপতি শিলা বৌদি এবং আমার জীবনসঙ্গী ববি। দোকানে ঢোকার পর তাঁদের চোখেমুখে যে উচ্ছ্বাস দেখলাম, তাতে মনে হলো, তাঁরা শাড়ি কিনতে আসেননি, শ্রীমঙ্গলের গোটা তাঁতশিল্পকে ব্যক্তিগত সংগ্রহে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন! একটার পর একটা শাড়ি বের হচ্ছে, রং দেখা হচ্ছে, নকশা বিচার হচ্ছে, গায়ে ধরে দেখা হচ্ছে। দোকানদারও সম্ভবত মনে মনে হিসাব কষছিলেন, আজকের বিক্রিতে তাঁর দোকানের ভবিষ্যৎ কয়েক মাসের জন্য সুরক্ষিত হয়ে গেল কি না।
শাড়ির সৌন্দর্যের কাছে আমাদের পুরুষ সদস্যদের যুক্তি, ধৈর্য ও সময়জ্ঞান ক্রমশ পরাজিত হতে লাগল। মনে হচ্ছিল, দোকানের প্রতিটি শাড়িই তাদের কাছে সমানভাবে অপরিহার্য। আরেকটি শাড়ি দেখার আবদার মানেই ফেরার সময় আরও একটু পিছিয়ে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি শাড়ি কেনা হলো। তবে দোকানের সব শাড়ি যে কেনা হয়নি, সেটাই বোধ হয় দোকানদারের সৌভাগ্য এবং আমাদের মাইক্রোবাসের স্বস্তি! শাড়ি বাছাইয়ের মহাযজ্ঞ শেষ হতে হতে রাত প্রায় নয়টা। লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যে সন্ধ্যা নেমেছিল, শাড়ির সৌন্দর্য বিচার করতে করতে সেই সন্ধ্যা প্রায় রাতের কাছে আত্মসমর্পণ করল।

এরপর বিএলসিতে ফিরে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার। রুটি, সবজি, হাঁসের মাংস—চমৎকার আয়োজন। খাবার শেষে খানিক আড্ডা। ভ্রমণে আড্ডা ছাড়া আনন্দ অসম্পূর্ণ। আড্ডা ছাড়া ভ্রমণ অনেকটা চা ছাড়া চা-বাগানের মতো। দিনের অভিজ্ঞতা, হাসি-ঠাট্টা, পুরোনো স্মৃতি আর নতুন পরিকল্পনায় রাত কখন গভীর হয়ে আসে, বোঝাই যায় না। তারপর ঘুম। পরদিন আবার নতুন অভিযান।
শনিবার সকালে নাশতা সেরে আমাদের গন্তব্য দেওরাছড়া চা-বাগান। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল মির্তিঙ্গা চা-বাগানে যাওয়ার। কিন্তু সেখানে শ্রমিক ধর্মঘট চলায় পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হলো। ভ্রমণের একটি বড় শিক্ষা—পরিকল্পনাকে ভালোবাসতে হবে, তবে তার সঙ্গে বিয়ে করা চলবে না। জীবন যেমন সব সময় নিজের ইচ্ছামতো চলে না, ভ্রমণও তেমনই।
ঢাকা-মৌলভীবাজার সড়ক ধরে প্রায় বিশ কিলোমিটার যাওয়ার পর দেওরাছড়া চা-বাগানের রাস্তা। তারপর যেন সবুজের রাজ্যে প্রবেশ। দুপাশে শুধু চা আর চা, মাঝখানে সরু রাস্তা। একদিকে সবুজ টিলার পর টিলা, অন্যদিকে চায়ের সারি। মনে হচ্ছিল, কোনো দক্ষ চিত্রকর বিশাল ক্যানভাসে সবুজের হাজার রকম ছায়া দিয়ে ছবি এঁকেছেন। কোথাও চা-গাছের সারি নিখুঁতভাবে সাজানো, কোথাও টিলার ঢালে ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। চা-বাগানের সৌন্দর্য এতটাই জীবন্ত যে, মনে হচ্ছিল প্রকৃতি বলছে, ‘আরেকটু থাকো, এত তাড়াহুড়ো কীসের?’ কিন্তু ভ্রমণকারীর সময় সীমিত, আর চা-বাগানের সৌন্দর্য অসীম।

এখানে প্রেমনগর নামে আরেকটি চা-বাগান রয়েছে। নামটিও চমৎকার! প্রেমনগর যেখানে শেষ, সেখান থেকেই শুরু দেওরাছড়া। মনে হলো, প্রকৃতি বুঝি প্রেমেরও সীমানা নির্ধারণ করে রেখেছে—এক বাগানের প্রেম শেষ হলে আরেক বাগানের শুরু!
দেওরাছড়া চা-বাগানের ম্যানেজার মেফাজ্জেল ভাই আমাদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানালেন। তাঁর সৌজন্যে চা তৈরির কারখানা দেখার সুযোগ হলো। চা-পাতা নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কীভাবে আমাদের পরিচিত পানীয় হয়ে ওঠে, তা কাছ থেকে দেখা বেশ আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে আমরা সাধারণত ভাবি না, এর পেছনে কত শ্রম, সময় ও প্রযুক্তি রয়েছে। কারখানায় গিয়ে বুঝলাম, এক কাপ চায়ের পেছনে শুধু গরম পানি আর চিনি নয়, রয়েছে শ্রমিকের ঘাম, প্রকৃতির দান এবং দীর্ঘ উৎপাদনপ্রক্রিয়া।
এরপর মেফাজ্জেল ভাই আমাদের নিয়ে গেলেন টিলার ওপর তাঁর বাংলোয়। চারদিকে সবুজ চা-বাগান, দূরে টিলার সারি, নির্মল বাতাস—বাংলোর পরিবেশ যেন শহুরে জীবনের ক্লান্তির ওপর এক মুঠো শান্তি ছড়িয়ে দেয়। সেখানে সিঙ্গারা, চা ও বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করা হলো। চা-বাগানের ম্যানেজারের বাংলোয় বসে চা খাওয়ার মধ্যে একটা বিশেষ মর্যাদার অনুভূতি আছে। মনে হয়, আমরা বুঝি চায়ের রাজ্যের রাজকীয় অতিথি! অবশ্য সিঙ্গারা খাওয়ার সময় রাজকীয়তা কিছুটা কমে গিয়ে সাধারণ ক্ষুধার্ত নাগরিকত্ব ফিরে আসে।
বাংলো থেকে আবার বাগানে ফিরলাম। প্রেমনগর ও দেওরাছড়ার সবুজে মন ভরে ছবি তুললাম। চারদিকে এত সৌন্দর্য যে, মনে হচ্ছিল ক্যামেরার মেমোরি শেষ হওয়ার আগেই আমাদের চোখের মেমোরি শেষ হয়ে যাবে। তারপর শহরে ফিরে ন্যাশনাল টি বোর্ডের দোকান থেকে চা কেনা। চায়ের দেশে এসে চা না কিনে ফিরলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। যেমন সমুদ্রে গিয়ে ঝিনুক না কুড়ালে কিংবা পাহাড়ে গিয়ে ছবি না তুললে অনেকের মন ভরে না।
সবশেষে ব্র্যাক বিএলসিতে ফিরে দুপুরের খাবার। করলা ভাজি, ডাল, ভর্তা, টাকি মাছের ভর্তা, বোয়াল মাছ, দই-মিষ্টি—সব মিলিয়ে আবারও পেটের জয়জয়কার। দুপুর সাড়ে তিনটা নাগাদ খাওয়া শেষ করে এবার ফেরার প্রস্তুতি। ভ্রমণের সবচেয়ে দুঃখের মুহূর্ত হলো, যখন সুন্দর জায়গা ছেড়ে ফিরতে হয়। অথচ আমাদের দেশে ছুটি এত সীমিত যে, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কটিও অনেক সময় অফিসের হাজিরা খাতার কাছে পরাজিত হয়।
বিকেল পাঁচটায় ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু। মাইক্রোবাসে গল্প, গান, হাসি-ঠাট্টা চলতে থাকল। রাত এগারোটায় ঢাকায় পৌঁছলাম। দুই দিনের ভ্রমণ শেষ। স্মৃতির ঝুলি ভর্তি চা-বাগান, লেক, শাড়ি, আনারস, সিঙ্গারা, চা আর আড্ডা।

তবে শ্রীমঙ্গলের অপূর্ব সৌন্দর্যের পাশে একটি বড় দুঃখ রয়ে গেল—ঢাকা-শ্রীমঙ্গল সড়কের দুরবস্থা। রাস্তার অবস্থা এমন যে, কয়েকবার যাতায়াত করলে আত্মারাম খাঁচা ছেড়ে পালানোর প্রস্তুতি নিতে পারে। গাড়ির ঝাঁকুনিতে শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন আলাদা করে প্রতিবাদ জানায়। সড়কের কাজ চলছে বহুদিন ধরে। দেখে মনে হয়, কাজটি শেষ হওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। হয়তো কিয়ামতের দিন ফেরেশতারা এসে শেষ স্তরটির পিচ ঢেলে দেবেন!
এত সুন্দর একটি পর্যটন অঞ্চল, অথচ সেখানে পৌঁছাতে এমন দুর্ভোগ কেন? শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান, লেক, বন, পাহাড়—সবই প্রকৃতির উপহার। কিন্তু সেই উপহার উপভোগ করতে গিয়ে যদি যাত্রাপথেই মানুষের ধৈর্য, কোমর, হাঁটু ও আত্মবিশ্বাসের পরীক্ষা দিতে হয়, তাহলে পর্যটনের উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
শ্রীমঙ্গল আমাদের মুগ্ধ করেছে। প্রকৃতি তার সবুজ হাত বাড়িয়ে আমাদের স্বাগত জানিয়েছে। আমরা ফিরেছি চা, শাড়ি, আনারস, গল্প, ছবি আর আনন্দের স্মৃতি নিয়ে। শুধু সড়কটি যেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের আগে একটু সুস্থ হয়ে ওঠে। কারণ শ্রীমঙ্গলে যেতে চাই আবারও—কিন্তু আত্মারামকে প্রতিবার খাঁচা ছেড়ে পালানোর সুযোগ দিয়ে নয়!






