আন্তর্জাতিক

ইন্দোনেশিয়ার দাবানলে বিষাক্ত ধোঁয়ার ছোবল, ক্ষুব্ধ সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার দাবানলে বিষাক্ত ধোঁয়ার ছোবল, ক্ষুব্ধ সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া

ছবিঃ সংগৃহীত

ইন্দোনেশিয়ার কালিমানতান, পাপুয়া ও সুমাত্রা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া দাবানলের ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ। বাতাসের সঙ্গে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায়। এতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শ্বাসকষ্ট ও মাথাব্যথাসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়ছেন এসব অঞ্চলের বাসিন্দারা। একই সঙ্গে দাবানল নিয়ন্ত্রণে ইন্দোনেশিয়ার ভূমিকা নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে তৈরি হয়েছে অসন্তোষ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দিক সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার সরকার। একদিকে নিজ দেশের নাগরিকদের ক্ষোভ সামাল দেওয়া, অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা।

সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইউজিন ট্যান বিবিসিকে বলেন, ‘মানুষ বিরক্ত, ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন। সরকারকে তাদের উদ্বেগের জবাব দিতে হবে। তা না হলে বাইরের এ সমস্যা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।’

ইন্দোনেশিয়ায় প্রতিবছরই দাবানলের ঘটনা ঘটে। কৃষিজমি সম্প্রসারণের জন্য বিশেষ করে পাম তেল উৎপাদনের উদ্দেশ্যে বড় পরিসরে বনভূমি পরিষ্কার করাকে এসব আগুনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়। তবে এ বছর শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে দেশটির বনাঞ্চল ও পিটভূমিতে খরা পরিস্থিতি আরও তীব্র হওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

আগের বছরগুলোতে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় দাবানলের ধোঁয়ার প্রভাব কয়েক দিন স্থায়ী হলেও এবার তা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে।

মালয়েশিয়ায় চলমান এ পরিস্থিতির প্রতিবাদে ইন্দোনেশিয়ার পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ। দেশটির আইনপ্রণেতা সিয়েদ সাদ্দিক দাবানলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মালয়েশীয়দের এসব প্রতিষ্ঠানকে আঞ্চলিকভাবে একঘরে করারও পরামর্শ দেন।

অন্যদিকে সিঙ্গাপুরেও সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশটির নাগরিকদের একাংশের অভিযোগ, এল নিনোর প্রভাব সম্পর্কে আগাম পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও সরকার ধোঁয়া মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

সিঙ্গাপুরের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী কে শানমুগাম বলেছেন, দাবানলের ধোঁয়া জনস্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন

ধোঁয়া পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিঙ্গাপুর সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। দ্বীপজুড়ে শত শত আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। শিশু, বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যমান আইন আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দাবানলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত ১০টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্তও চলছে।

গত সপ্তাহে সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান জাকার্তায় ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকটিকে তিনি ‘খোলামেলা’ ও ‘আন্তরিক’ আলোচনা হিসেবে বর্ণনা করেন। দুই দেশ দাবানলের ধোঁয়া মোকাবিলায় যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণাও দেয়।

তবে পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি কাটেনি। ইন্দোনেশিয়ার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বক্তব্যে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হয়। তিনি বলেন, দাবানল মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং প্রতিবেশী সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার অক্সিজেনও ইন্দোনেশিয়ার বন থেকে আসে।

এ বক্তব্যের সমালোচনা করে সিঙ্গাপুরের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী কে শানমুগাম বলেন, ধোঁয়া দুই দেশের মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। তাই এ সমস্যা সমাধানে দ্বিপক্ষীয় বিরোধের কোনো অবকাশ থাকা উচিত নয়।

এর কয়েক দিন পরই অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদার কথা উল্লেখ করে সিঙ্গাপুরে গ্যাস রপ্তানি কমানোর ঘোষণা দেয় ইন্দোনেশিয়া। অনেকেই একে সিঙ্গাপুরের সমালোচনার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। যদিও সিঙ্গাপুরের মোট দৈনিক গ্যাস চাহিদার ২ শতাংশেরও কম এ সিদ্ধান্তের আওতায় পড়বে বলে জানিয়েছে দেশটি।

মালয়েশিয়ার সতর্ক অবস্থান

সিঙ্গাপুরের তুলনায় এ ইস্যুতে মালয়েশিয়ার অবস্থান বেশ সংযত। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহামাদ হাসান ইন্দোনেশিয়ার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্ক ছিন্ন করার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

তবে দাবানল প্রতিরোধে সহযোগিতা বাড়াতে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টি বিবেচনা করছে মালয়েশিয়া। পাশাপাশি আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ২০০৩ সালে কার্যকর হওয়া আন্তসীমান্ত ধোঁয়াদূষণবিষয়ক চুক্তির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে দেশটি।

কিন্তু এ চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এশীয় অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক জেমস চিনের মতে, দাবানলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৃষি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় চুক্তিটি কার্যত অকার্যকর।

২০১৬ সালে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো ২০২০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলে ধোঁয়াদূষণ বন্ধের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। নির্ধারিত সময়ে তা অর্জিত না হওয়ায় পরে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়ার সংযত অবস্থানের পেছনে দেশটির নিজস্ব পাম তেল শিল্পের স্বার্থও রয়েছে। কারণ, বাণিজ্যিকভাবে পাম তেল উৎপাদনের জন্য বনভূমি পরিষ্কার ও আগুন ব্যবহারের সঙ্গে এ ধরনের দাবানলের সম্পর্ক রয়েছে।

মালয়েশিয়ার প্যাসিফিক রিসার্চ সেন্টারের প্রধান উপদেষ্টা ই সান ওহ বলেন, পাম তেল উৎপাদনকে গুরুত্ব দেওয়া অব্যাহত থাকলে এ ধরনের ধোঁয়াজনিত দূষণ বারবার ফিরে আসবে।

তাঁর মতে, ইন্দোনেশিয়ার ওপর সিঙ্গাপুরের মতো প্রভাব খাটানোর সুযোগ মালয়েশিয়ার নেই। কারণ, সিঙ্গাপুর ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং দেশটির অনেক বিত্তশালী নাগরিকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই ইন্দোনেশিয়াকে অতিরিক্ত ক্ষুব্ধ করতে চায় না মালয়েশিয়া।

বিশ্লেষকদের ধারণা, আপাতত বাতাসের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে ধোঁয়ার প্রকোপ কমার অপেক্ষায় রয়েছে দেশটির সরকার।

বিষয়:ইন্দোনেশিয়া দাবানল বিষাক্ত ধোঁয়া মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুর

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…