ঢাকার বাতাসে বিষাক্ত কণা: উন্নয়ন না পরিবেশ বিপর্যয়

শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে ঢাকার আকাশে আবারও বাড়ছে বায়ু দূষণ। ভোর কিংবা সকালে দূর থেকে তাকালে শহরটিকে কুয়াশার চাদরে ঢাকা মনে হলেও বাস্তবে এর বড় অংশজুড়ে রয়েছে ধূলিকণা, ধোঁয়া ও ক্ষতিকর বায়ুদূষণ।
আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, ৮ নভেম্বর সকালে ১৭৯ একিউআই স্কোর নিয়ে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে ছিল ঢাকা। এটি কেবল একটি দিনের দূষণ পরিস্থিতির চিত্র নয়, বরং রাজধানীর দীর্ঘদিনের পরিবেশগত সংকটেরও প্রতিফলন।
ঢাকার বায়ুদূষণকে শুধু শীতকালীন সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বছরের বিভিন্ন সময়ে দূষণের মাত্রা ওঠানামা করলেও শীতকালে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। এর পেছনে রয়েছে আবহাওয়াগত পরিস্থিতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং মানবসৃষ্ট দূষণের সম্মিলিত প্রভাব।
দূষণের প্রধান উৎস: উন্নয়ন না পরিবেশের বিপর্যয়?
রাজধানীতে চলমান অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি এবং নির্মাণকাজ বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস। নির্মাণস্থলে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সিমেন্ট, বালু ও মাটির সূক্ষ্ম কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণসামগ্রী খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হচ্ছে। নিয়মিত পানি ছিটানো কিংবা নির্মাণস্থল ঢেকে রাখার মতো পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।
এর পাশাপাশি রাজধানীর আশপাশের ইটভাটাগুলো দূষণের বড় উৎস। শুষ্ক মৌসুমে এসব ভাটা চালু হলে বায়ুতে ক্ষতিকর ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম কণার পরিমাণ বেড়ে যায়। পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং খোলা জায়গায় বর্জ্য ও প্লাস্টিক পোড়ানো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঢাকার দূষণ শুধু শহরের ভেতরে তৈরি হচ্ছে না। আশপাশের শিল্পাঞ্চল, ইটভাটা ও অন্যান্য দূষণের উৎস থেকেও দূষিত বায়ু রাজধানীতে প্রবেশ করছে। ফলে সমস্যাটির সমাধানে শুধু ঢাকা শহরের প্রশাসনিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিকল্পনা।

দক্ষিণ এশিয়ায় বায়ুদূষণের অভিন্ন চিত্র
ঢাকার পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক বায়ুদূষণ সংকটের অংশ। একই সময়ে পাকিস্তানের লাহোর, ভারতের দিল্লি ও কলকাতাও দূষণের উচ্চমাত্রার মুখে রয়েছে। লাহোরে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং শীতকালীন আবহাওয়াজনিত কারণে দূষণ বাড়ছে। দিল্লি ও কলকাতাতেও যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজ এবং শিল্পকারখানার নির্গমন বড় ভূমিকা রাখছে।
শীতকালে বাতাসের গতি কমে যাওয়া এবং বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরে দূষিত কণা আটকে থাকার কারণে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। অর্থাৎ, ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পুরো অঞ্চলকে একই ধরনের সংকটে ফেলেছে।
স্বাস্থ্যের ওপর নীরব আঘাত
বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্যে। বাতাসে থাকা অতি সূক্ষ্ম কণা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং রক্তপ্রবাহেও মিশে যেতে পারে। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাসের প্রভাব তাৎক্ষণিক অসুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের কর্মক্ষমতা, জীবনযাত্রার মান এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা, শিল্পকারখানার নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ। এসব দূষণের মধ্যে দীর্ঘদিন বসবাস ও কাজ করার কারণে মানুষের শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বায়ুদূষণ সিওপিডি বা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসনালির বাধাজনিত ফুসফুসের রোগের অন্যতম ঝুঁকির কারণ। যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলা এবং গৃহস্থালি বায়ুদূষণ এ রোগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ইটভাটাগুলোকে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাঠ ও কেরোসিনের মতো দূষণকারী জ্বালানি দিয়ে রান্নার প্রবণতা কমাতে বিকল্প পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের চলাচল বন্ধ করতে হবে। সর্বোপরি, নির্মল বায়ু নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সমাধান কোথায়?
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিন (রুনু) চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে রাস্তাঘাট ও কনস্ট্রাকশনের নির্মাণস্থলে নিয়মিত পানি ছিটানো নিশ্চিত করতে হবে। বড় বড় কনস্ট্রাকশনের নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সেগুলো থেকে ধুলাবালি ছড়িয়ে পরিবেশ দূষিত করতে না পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং আইন অমান্যকারীদের জরিমানার আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকি ও কঠোর নজরদারিও জরুরি।

তিনি বলেন, বায়ুদূষণ মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। নির্মাণকাজ পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এবং বড় নির্মাণপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (ইএমপি) বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ইটভাটা ও কলকারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানান্তর বা বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু এবং খোলা জায়গায় ময়লা ও প্লাস্টিক পোড়ানো বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। নগর পরিকল্পনায় পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা সংরক্ষণ ও গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি।
ঢাকার সড়কগুলো বাতাস চলাচলের পথ হিসেবে কাজ করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সড়ক বিভাজকে অপরিকল্পিতভাবে গাছ লাগালে বাতাসে ভেসে থাকা ধূলিকণার স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে ধূলিকণা আশপাশের ঘরবাড়িতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নগরায়ণের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণেও পরিকল্পনা ও পরিবেশগত বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। যত্রতত্র বর্জ্য না পোড়ানো, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব আচরণে অভ্যস্ত হওয়ার মাধ্যমে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা সম্ভব।





