কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়তে শিক্ষকদের জাতীয়করণ ও মানসম্মত শিক্ষা জরুরি: সমাজকল্যাণমন্ত্রী

ময়মনসিংহ শিক্ষক সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে বলে জানিয়েছেন নারী ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুন্দর ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা লাভ করে দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে ময়মনসিংহ নগরীর টাউনহলের তারেক স্মৃতি অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষক সমিতি ময়মনসিংহ জেলা শাখার সংবর্ধনা ও ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, শিক্ষকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও জরুরি। শিক্ষকদের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ, শিশুশ্রম নির্মূল এবং মাদকের বিস্তার রোধেও তাদের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, এসব সামাজিক সমস্যা সমাধানে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শিক্ষকদের সরকারিকরণ, এমপিওভুক্তি বা জাতীয়করণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু এগুলো করলেই হবে না। শিক্ষকদের ভালো রাখতে হবে, শিক্ষার্থীদের ভালো পরিবেশ দিতে হবে এবং স্কুল-কলেজ থেকে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পেছনে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষকদের সামাজিক দায়িত্বের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, গ্রাম, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষকেরা সমাজের অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। সাধারণ মানুষ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা ও সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাদের পরামর্শ নিতে আসেন। তাই শিক্ষকদের ইতিবাচক পরামর্শ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ সমাজ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, এসব শিশুর জন্য শুধু শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা করলেই চলবে না, তাদের অভিভাবকদের প্রয়োজন ও কষ্টের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর যত্নে অনেক ক্ষেত্রে একাধিক সহায়তাকারীর প্রয়োজন হয়। তাই শিক্ষার পরিকল্পনা করতে হবে সামগ্রিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে।
পাঠ্যপুস্তকে বাংলাদেশের ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পাঠ্যবইয়ের কাজ ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়া নয়, বরং ইতিহাসকে ধারণ করা। বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো নতুন প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরতে হবে, যাতে তারা দেশের অতীত, সংগ্রাম ও অর্জন সম্পর্কে জানতে পারে। মহান মুক্তিযুদ্ধকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গর্বের অধ্যায় হিসেবে স্মরণ রাখার কথাও বলেন তিনি।
শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র যখন কোনো শিক্ষককে স্বীকৃতি দেয়, তখন সমাজের প্রতি তার দায়িত্বও বেড়ে যায়। শিক্ষকসমাজকে সম্মানিত করা জাতির দায়িত্ব। একই সঙ্গে শিক্ষকদের কাছেও জাতির প্রত্যাশা অনেক। তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের কর ও ভ্যাট থেকে আসে। তাই শিক্ষা খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ এবং তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়তে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী রেখে যাওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে। সরকার, শিক্ষক ও সমাজের অন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং সামাজিক সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে হবে।
বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষক সমিতি ময়মনসিংহ জেলা শাখার এ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনের সংসদ সদস্য ও শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়া, সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ, সংসদ সদস্য মো. আক্তারুজ্জামান, এবং ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. মোতাহার হোসেন তালুকদার। এসময় বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষক সমিতির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও স্কুল-কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষিকা উপস্থিত ছিলেন।






