ফুটবল

কোচ থমাস ডুলি আজ হাসবেন না কাঁদবেন

কোচ থমাস ডুলি আজ হাসবেন না কাঁদবেন

এইতো কদিন আগে শেষ হওয়া ফিফা আসিয়ান কাপ ফুটবলে ইন্দোনেশিয়ার কাছে বাংলাদেশের ৯-২ গোলের ব্যবধানের এক দুঃসহ পরাজয় একেবারে কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে। বহু বহুদিন পর এমন পরাজয় বাংলাদেশের ফুটবলের সার্বিক সক্ষমতাকে নানাবিধ প্রশ্নে জর্জরিত না করে পারেনি। বিশেষ করে নতুন ফুটবল কোচ থমাস ডুলির জন্য এই টুর্নামেন্ট ছিল বড় এক পরীক্ষা।

সেই পরীক্ষার রেশ কাটতে না কাটতেই আবার ফুটবল দুয়ারে এসে হাজির সাফ ফুটবল। আজ ঢাকায় পর্দা উঠেছে সাফ ফুটবলের ১৫তম আয়োজনের। সাফ ফুটবল মানেই ‘সাউথ এশিয়ার বিশ্বকাপ ফুটবল’। একসময় এই টুর্নামেন্ট ঘিরে উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না। সাফ ফুটবল বরাবরই আমাদেরকে আলোড়িত ও শিহরিত করে। দীর্ঘ আট বছর পর বাংলাদেশে ফিরল সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফুটবল লড়াই। সর্বশেষ ২০১৮ সালে বাংলাদেশে সাফ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেবার মালদ্বীপ ২-১ গোলে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কাজী সালাহউদ্দিন জামানায় স্বাগতিক বাংলাদেশকে গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নিয়ে বেদনা বিধুর ইতিহাস লিখতে হয়েছিল।

এবারের টুর্নামেন্টে সূচি অনুযায়ী, আজ বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ ভুটানের বিপক্ষে। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে ১১ নভেম্বর শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি হবে স্বাগতিকরা। ‎দুটি ম্যাচই হবে ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে। আজকের ম্যাচ শুরুর সময় রাত ৮টা। মানে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। গ্রুপ বিন্যাসে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ অনেকটাই সহজ গ্রুপে পড়েছে। গ্রুপে দুই প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা এবং ভুটান। দুটি দলই র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে। আবার বাংলাদেশ খেলবে নিজ মাটিতেই। আজ প্রথম ম্যাচে খেলতে পারছেন না দলের পোস্টারবয় বলে খ্যাত হামজা চৌধুরী এবং ফারহান আলী ওয়াহিদ। কোচ থমাস ডুলি তাই দলকে অন্যভাবে অন্য কৌশলে সাজাচ্ছেন। নিজের ইমেজকে সংহত করতে তিনি অঙ্গীকারাবদ্ধ।

আজকে ভুটানের সাথে ম্যাচ খুব বেশি কঠিন মনে করছেন না প্রাক্তন তারকা ফুটবলাররাও। যেমনটি বলছিলেন সাবেক তারকা ফুটবলার শেখ মোহাম্মদ আসলাম। সাবেক তারকা ফুটবলার আসলাম বলেন, ‘আসিয়ান গেমসে হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধারের সুন্দর সুযোগ এসেছে বাংলাদেশের সামনে। এখানে চ্যাম্পিয়নের বাইরে আর কিছুই ভাবা উচিত নয়। আজকের ম্যাচে নিঃসন্দেহে সবদিক দিয়েই ফেভারটি বাংলাদেশ। জয় ছাড়া আর কিছুই ভাবার অবকাশ নেই।’

ফুটবল বিশ্লেষকদের ভাষায়, এবারের সাফ ফুটবল বাংলাদেশের নবাগত কোচ থমাস ডুলির জন্য এক বাঁচামরার লড়াই। এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ খারাপ করলে কোচ থমাস ডুলির পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাবে। আর বাংলাদেশ সাফে চ্যাম্পিয়ন হলে নিঃসন্দেহে আরও নতুন আশাবাদ তৈরি হবে। তবে আজকের ম্যাচটি দিয়ে বোঝা সম্ভব হবে বাংলাদেশের সক্ষমতা।

সাফ ফুটবলে আমাদের সাফল্য খুব একটা নেই। তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে এই সত্য উন্মোচিত হয় যে এই টুর্নামেন্ট আমাদের যতটা পাওয়ার কথা ছিল তা আমরা একেবারেই পায়নি। ৯৩ সাল থেকে এপর্যন্ত মোট ১৫ বার সাফ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমরা সর্বসাকুল্যে মাত্র একবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছি। সেটা ২০০৩ সালের কথা। সেবার তৎকালীন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে বসেছিল সাফ ফুটবল প্রতিযোগিতা। সাউথ এশিয়ার এই মর্যাদাকর ফুটবল লড়াইয়ে নিজ গ্রুপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল নেপাল, মালদ্বীপ এবং ভুটান। সেবার গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই বাংলাদেশ দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল। এরপর সেমিফাইনালে শক্তিশালী চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশ উঠেছিল ফাইনালে। শেষমেশ ঘাম ঝরানো ফাইনালে মালদ্বীপকে টাইব্রেকারে হারিয়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নশিপের বিজয়মাল্য পরার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। তবে সেই অসম্ভব কাজটি মুঠোবন্দি হয়েছিল কোচ জর্জ কোটানের কারণেই।

২০০৩ সালে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশকে শিরোপা জেতানো কোচ জর্জ কোটান প্রয়াত হয়েছেন ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। একথা সত্য কখনও কখনও ভিনদেশী কোন কোন কোচ আমাদের ফুটবলে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট থেকেছেন। সব অন্ধকার পেরিয়ে দেখিয়েছেন আলোর পথ। নিরন্তর দুঃখের মাঝে কিছুটা হলেও সুখের পরশ বুলিয়ে দিতে সচেষ্ট থেকেছেন। তাদেরই অন্যতম একজন ছিলেন প্রয়াত ফুটবল কোচ জর্জ কোটান। ফুটবলে যখন সাফল্য একেবারেই অধরা ছিল, তখন অস্ট্রিয়ান এই কোচ সাফ ফুটবলে বাংলাদেশকে চ্যাম্পিয়ন করে এক নতুন ইতিহাসের সূচনা করেছিলেন। এরপর ২০১৫ সালে তিনি সর্বশেষ কোচ হয়ে এসেছিলেন আবাহনী ক্লাব লিমিটেডের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে। সেসময় তার দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকার নেয়ার সুযোগ হয়েছিল। একদিন কফি খেতে খেতে তিনি অকপটে বলেছিলেন, বাংলাদেশের ফুটবলের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ কিন্ত ফুটবলাররা নন, কর্মকর্তারা। বোঝাতে চেয়েছিলেন রাজনীতিকরণ, সঠিক পরিকল্পনা আর বিনিয়োগের অভাবের কারণে ফুটবল প্রত্যাশিত জায়গাতে যেতে পারছে না।

যাক, সে অনেক পুরনো কথা। জর্জ কোটানের পর আরও অনেক ফুটবল কোচ বাংলাদেশে এসেছেন। কিন্তু সেভাবে সাফল্য দেখাতে পারেননি। অবশ্য পরেরবার ২০০৫ সালেই পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত সাফ ফুটবলে চ্যাম্পিয়নশিপের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশের আর্জেন্টাইন কোচ আন্দ্রেস ক্রুসিয়ানি। কিন্ত ফাইনালে ভারত ২-০ গোলে বাংলাদেশকে পরাজিত করলে ক্রুসিয়ানির স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে যায়। এরপরের নির্মমতা হল ২০০৫ সালের পর যে আটটি সাফ গেমস অনুষ্ঠিত হয়েছে তার একটিতেও বাংলাদেশ আর কখনই ফাইনালে উঠতে পারেনি। সুতরাং কোচ থমাস ডুলির জন্য দুই চ্যালেঞ্জ এক বাংলাদেশকে ফাইনালে নিয়ে যাওয়া এবং দুই. দলকে চ্যাম্পিয়ন করা। সেই কাজটি দূরহ না কঠিন সময় বলে দেবে। তবে আজকের ম্যাচটি থমাস ডুলিকে ভীষণ রকম চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বললে ভুল হবে না। মনে রাখা প্রয়োজন ভুটান কিন্তু দুবার বাংলাদেশকে পরাজিত করেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে ভুটানের কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ। এর আগে ২০১৬ সালেও একবার হেরেছিল। ভুটানের বিপক্ষে ১০ বার জয়ের রেকর্ড রয়েছে বাংলাদেশের। আবার র‌্যাঙ্কিং-এও ১০ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বড় ব্যবধানে জয়ী হলে থমাস ডুলির জন্য হবে আর্শীবাদ। আর ড্র বা অন্যকিছু ঘটলে কোচের উপর আরও চাপ বাড়বে।

বিষয়:থমাস ডুলি বাংলাদেশ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ-২০২৬

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…