মতামত

গণতন্ত্রের খোলস ও আদর্শ রাষ্ট্রের স্বপ্ন

গণতন্ত্রের খোলস ও আদর্শ রাষ্ট্রের স্বপ্ন

ছবি: সংগৃহীত

একসময় রাজা ছিলেন রাষ্ট্রের প্রতীক, প্রজা ছিল তাঁর অনুগত। তারপর পৃথিবী অনেক রক্ত, বিদ্রোহ, বিপ্লব ও চিন্তার মধ্য দিয়ে হেঁটে এমন এক ধারণার কাছে পৌঁছাল যে রাষ্ট্র কোনো রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়—রাষ্ট্র জনগণের। কিন্তু রাজাকে সরিয়ে জনগণকে সিংহাসনে বসালেই কি রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয়ে যায়? ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যাপারটি এত সরল নয়। রাজতন্ত্রের মুকুট খুলে প্রজাতন্ত্রের টুপি পরালেই মানুষের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। স্বৈরাচার কখনো ইউনিফর্ম পরে আসে, কখনো নির্বাচিত সরকারের পোশাক পরে আসে; কখনো বন্দুক হাতে ক্ষমতা দখল করে, কখনো ব্যালট বাক্সের ভেতর দিয়ে ক্ষমতায় এসে ধীরে ধীরে সেই ব্যালটের অর্থই নিঃশেষ করে দেয়।

আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন তাই কে শাসন করবে—শুধু তা নয়; শাসককে কে শাসন করবে?

এই প্রশ্নটি যত সরল, তার উত্তর তত কঠিন। কারণ রাষ্ট্রের হাতে আইন আছে, পুলিশ আছে, কর আদায়ের ক্ষমতা আছে, কারাগার আছে, তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা আছে এবং আধুনিক যুগে এমন প্রযুক্তিও আছে যার সাহায্যে একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবনের অসংখ্য তথ্য রাষ্ট্র বা বৃহৎ প্রতিষ্ঠান জানতে পারে। অন্যদিকে নাগরিকের হাতে আছে একটি ভোট, কিছু সাংবিধানিক অধিকার এবং প্রতিবাদের ক্ষীণ অথচ গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। ফলে গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা শুধু ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকে আসে কি না, তা নয়; ক্ষমতা জনগণের কাছে জবাবদিহি করে কি না—সেটিই আসল প্রশ্ন।

গণতন্ত্র শব্দটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় বহু পুরোনো। এত পুরোনো যে শব্দটি এখন আর আমাদের চমকায় না; বরং অনেকটা সরকারি বিজ্ঞপ্তির মতোই নিরাসক্ত করে তোলে। বক্তৃতায় গণতন্ত্র আছে, নির্বাচনী ইশতেহারে গণতন্ত্র আছে, সংবিধানে গণতন্ত্র আছে, এমনকি গণতন্ত্রের নামে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধেও অনেক কিছু করা যায়। ফলে আজকাল গণতন্ত্রকে নিয়ে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—আমরা শব্দটিকে এত বেশি ব্যবহার করেছি যে তার অর্থটিই প্রায় হারিয়ে ফেলেছি।

গণতন্ত্র কি কেবল ভোট দেওয়ার অধিকার? যদি তাই হয়, তাহলে পাঁচ বছর পরপর একটি ব্যালট বাক্স বসিয়ে দিলেই একটি রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু মানুষ কেবল ভোট দেওয়ার জন্য মানুষ নয়। তার ক্ষুধা আছে, ভয় আছে, ভালোবাসা আছে, মত আছে, প্রতিবাদ আছে, ব্যক্তিগত মর্যাদা আছে। তার রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন করার অধিকার আছে। রাষ্ট্রের অন্যায়কে অন্যায় বলার অধিকার আছে। যে সরকারকে সে ভোট দিয়েছে, তার বিরুদ্ধেও দাঁড়ানোর অধিকার আছে। বরং প্রকৃত গণতন্ত্রের পরীক্ষা তখনই শুরু হয়, যখন নাগরিক সরকারের প্রশংসা না করে তার সমালোচনা করে।

আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল সম্ভবত এই যে আমরা রাষ্ট্রকে সরকার আর সরকারকে রাষ্ট্র বলে ধরে নিয়েছি। অথচ রাষ্ট্র একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠান; সরকার তার সাময়িক ব্যবস্থাপক মাত্র। সরকার বদলাবে, মন্ত্রী বদলাবে, দল বদলাবে, সংসদের আসন বদলাবে—কিন্তু রাষ্ট্র থাকবে। তাই রাষ্ট্রের শক্তি কোনো দলের শক্তি হতে পারে না। পুলিশ কোনো দলের বাহিনী নয়, প্রশাসন কোনো দলের কর্মীসংগঠন নয়, আদালত কোনো সরকারের অনুগত প্রতিষ্ঠান নয়। রাষ্ট্র যদি দলীয় স্বার্থের যন্ত্রে পরিণত হয়, তাহলে নির্বাচনের দিনটি গণতন্ত্রের উৎসব হলেও বাকি দিনগুলোতে নাগরিকের জীবন গণতান্ত্রিক থাকে না।

আধুনিক গণতন্ত্রের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন তাই—ক্ষমতায় কে আছে—এটি নয়; ক্ষমতাকে কীভাবে সীমাবদ্ধ রাখা হবে—এটি।

কারণ মানুষকে আমরা যতই মহৎ বলে কাব্য লিখি, ক্ষমতা মানুষকে পরীক্ষা করে। ক্ষমতা হাতে পেলে যে মানুষটি গতকাল স্বাধীনতার গান গেয়েছে, আজ সে অন্যের স্বাধীনতাকে অসুবিধা মনে করতে পারে। যে গতকাল রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, আজ সে রাষ্ট্রের চেয়ারে বসে নিজের সমালোচকের কণ্ঠস্বরকে রাষ্ট্রবিরোধিতা বলতে পারে। এই মানবিক দুর্বলতাকে বুঝেই আধুনিক গণতন্ত্র রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে—সংবিধান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সংসদীয় নজরদারি, মুক্ত গণমাধ্যম, স্বাধীন নির্বাচনব্যবস্থা, নাগরিক অধিকার এবং ক্ষমতার পৃথকীকরণের মাধ্যমে।

অর্থাৎ গণতন্ত্র মানুষের ভালো হওয়ার ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখে না; মানুষের খারাপ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাকেও হিসাবের মধ্যে রাখে। এখানেই গণতন্ত্রের প্রজ্ঞা।

একজন ভালো শাসক পাওয়া সৌভাগ্য হতে পারে, কিন্তু একটি ভালো রাষ্ট্র এমনভাবে নির্মিত হওয়া দরকার যাতে খারাপ শাসক এলেও নাগরিকের সব স্বাধীনতা একসঙ্গে কেড়ে নিতে না পারে। ব্যক্তির সততার চেয়ে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা তাই সভ্য রাষ্ট্রের প্রধান কাজ। যে রাষ্ট্র একজন মহৎ নেতার অপেক্ষায় থাকে, সে এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিণত হয়নি।

আদর্শ রাষ্ট্রে সরকারকে ভয় করবে না নাগরিক; বরং সরকার ভয় করবে আইনের সীমা অতিক্রম করতে। সেখানে একজন দরিদ্র কৃষক এবং একজন ক্ষমতাবান মন্ত্রীর আইনি মর্যাদা একই হবে। একজন সাধারণ নাগরিকের অভিযোগ শুনতে আদালতের দরজা যেমন খোলা থাকবে, তেমনি ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিরুদ্ধেও সেই দরজা বন্ধ হবে না। বিচার তখন ক্ষমতার অলংকার হবে না, হবে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ।

কিন্তু শুধু আইনের শাসন দিয়ে রাষ্ট্র আদর্শ হয় না। মানুষের পেটে যখন ক্ষুধা, হাতে যখন কাজ নেই, সন্তানের চিকিৎসার টাকা নেই, তখন তাকে শুধু স্বাধীনতার ভাষণ দিয়ে সন্তুষ্ট করা যায় না। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে গণতন্ত্রের অর্থ অনেক সময় একটি ভোটের চেয়েও বড়—একটি কাজ, একটি হাসপাতাল, একটি নিরাপদ রাস্তা, সন্তানের শিক্ষার সুযোগ, বৃদ্ধ বয়সে সামাজিক নিরাপত্তা।

এই কারণে আধুনিক গণতন্ত্রের সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচারের সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী করে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং যে রাষ্ট্র নাগরিককে রাজনৈতিক অধিকার দেয় কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে তাকে অসহায় করে রাখে, সেখানে গণতন্ত্রের সুফলও শ্রেণিভেদে ভিন্ন হয়ে যায়।

আবার রাষ্ট্র যদি নাগরিকের সব প্রয়োজন পূরণ করার নামে তার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়, তাহলেও বিপদ। রাষ্ট্রের কাজ মানুষকে পোষা প্রাণীতে পরিণত করা নয়। রাষ্ট্র নাগরিকের অভিভাবক নয়; নাগরিকের অধিকার রক্ষার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র যত বড় হবে, তার ক্ষমতার ওপর তত বেশি নজরদারি প্রয়োজন।

আজকের পৃথিবীতে গণতন্ত্রের নতুন সংকট এখানেই। পুরোনো স্বৈরাচারকে আমরা চিনতে পারতাম তার হাতে বন্দুক থাকত, সংবাদপত্র বন্ধ হতো, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ হতো। নতুন যুগের নিয়ন্ত্রণ অনেক সূক্ষ্ম। নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ করা যায়, তার পছন্দ-অপছন্দ বিশ্লেষণ করা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার চিন্তার ওপর প্রভাব বিস্তার করা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তি রাষ্ট্র ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে এমন ক্ষমতা দিচ্ছে, যার পূর্ণ সামাজিক পরিণতি এখনো আমরা বুঝে উঠতে পারিনি।

তাই ভবিষ্যতের গণতন্ত্র শুধু ব্যালট বাক্সের গণতন্ত্র হবে না; এটি হবে তথ্য, প্রযুক্তি ও ব্যক্তিস্বাধীনতার গণতন্ত্র। নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য কার হাতে যাচ্ছে, রাষ্ট্র তাকে কতটা নজরদারি করতে পারছে, অ্যালগরিদম কীভাবে মানুষের মতামতকে প্রভাবিত করছে এসব প্রশ্নও গণতন্ত্রের প্রশ্ন হয়ে উঠবে।

আদর্শ রাষ্ট্রের আরেকটি লক্ষণ হলো সে নিজের সমালোচককে সহ্য করতে পারে। যে রাষ্ট্র প্রশংসা শুনে খুশি হয় কিন্তু সমালোচনা শুনে ক্রুদ্ধ হয়, সে রাষ্ট্র যতই উন্নয়নের পরিসংখ্যান দেখাক, তার গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

কারণ সমালোচক রাষ্ট্রের শত্রু নাও হতে পারে; অনেক সময় সে রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় নাগরিক। প্রশংসা ক্ষমতাকে ঘুম পাড়ায়, সমালোচনা তাকে জাগিয়ে রাখে।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দুর্ভাগ্য হলো, আমরা প্রতিপক্ষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শিখিনি; তাকে শত্রু হিসেবে দেখতে শিখেছি। অথচ গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো আমি তোমার মতের বিরোধিতা করতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকার অস্বীকার করি না। আমি তোমার রাজনৈতিক কর্মসূচিকে প্রত্যাখ্যান করতে পারি, কিন্তু তোমাকে মানুষ হিসেবে অস্বীকার করি না।

গণতন্ত্র মূলত বিরোধিতার সঙ্গে সহাবস্থানের শিল্প। যে সমাজে সবাই একই কথা বলে, সেখানে হয় সবাই খুব জ্ঞানী, নয়তো কেউ সত্য কথা বলছে না।

আদর্শ রাষ্ট্র তাই একমতের রাষ্ট্র নয়; বহুমতের রাষ্ট্র। সেখানে সংসদে বিরোধী দল থাকবে, সংবাদপত্রে ভিন্ন মত থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক থাকবে, সাহিত্যিক সরকারের সমালোচনা করবেন, নাগরিক সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলবেন। রাষ্ট্রের সৌন্দর্য তার নীরবতায় নয় তার সুস্থ বিতর্কে।

সবশেষে মনে রাখা দরকার, গণতন্ত্র কোনো সমাপ্ত ভবন নয় যে একদিন উদ্বোধন করে আমরা তার চাবি তুলে রাখব। গণতন্ত্র একটি চলমান অনুশীলন। প্রতিটি প্রজন্মকে তাকে নতুন করে রক্ষা করতে হয়। প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হয়, আইনকে সংস্কার করতে হয়, নাগরিকের অধিকারকে নতুন প্রযুক্তি ও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হয়।

আদর্শ রাষ্ট্র বলে পৃথিবীতে হয়তো কোনো চূড়ান্ত বস্তু নেই। কারণ মানুষ যেমন অসম্পূর্ণ, তার নির্মিত রাষ্ট্রও অসম্পূর্ণ। কিন্তু সেই অসম্পূর্ণতার মধ্যেই একটি রাষ্ট্রকে ক্রমাগত ভালো করার চেষ্টা করা যায়।

আমার কাছে আধুনিক গণতন্ত্রের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা তাই হতে পারে।

রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বড় হবে, নাগরিকের অধিকার তার চেয়ে বড় হবে; সরকার যত শক্তিশালী হবে, আইনের সীমা তার চেয়ে শক্তিশালী হবে; আর সংখ্যাগরিষ্ঠতা যত প্রবল হবে, সংখ্যালঘুর স্বাধীনতা তত বেশি সুরক্ষিত থাকবে।

যে রাষ্ট্রে নাগরিক সরকারকে প্রশ্ন করতে পারে, আদালতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে, সংবাদপত্র ক্ষমতাবানের সমালোচনা করতে পারে, বিরোধী দল পরাজিত হয়েও টিকে থাকতে পারে এবং ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনে পরাজিত হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারে সেই রাষ্ট্রই গণতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যায়।

আর যেদিন আমরা বুঝতে পারব যে রাষ্ট্র আমাদের ওপর দয়া করে না; বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্বই নাগরিকের অধিকার রক্ষার জন্য সেদিন হয়তো গণতন্ত্র কেবল সংবিধানের একটি শব্দ থাকবে না।

সেদিন গণতন্ত্র মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে।

সেদিন রাষ্ট্র আর নাগরিকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে না নাগরিকের মর্যাদার ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে রাষ্ট্র।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিষয়:আদর্শ রাষ্ট্রের স্বপ্ন গণতন্ত্র

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…