এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে পুলিশ হেনস্তার অভিযোগের ঘটনায় একটি বাক্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। থানায় নেওয়ার পর খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমান তাকে বারবার বলেছিলেন, ‘চোখ নিচু করে কথা বলতে।’ ঘটনাটির তদন্ত ও বিচারিক দিক গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর পাশাপাশি এই বাক্যটিও আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতার সংস্কৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দেয়।
‘চোখ নিচু করে কথা বলুন’ বাংলা ভাষায় কেবল একটি আচরণগত নির্দেশনা নয়। এর মধ্যে নিহিত থাকে একটি মানসিক ও সামাজিক বার্তা। সাধারণত এই বাক্য ব্যবহার করা হয় তখনই, যখন একজন ব্যক্তি অন্যজনের ওপর নিজের কর্তৃত্ব, প্রভাব বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান। অর্থাৎ এখানে শুধু কথোপকথন নয়, সম্পর্কের ক্ষমতার ভারসাম্যও প্রকাশ পায়।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় চোখে চোখ রেখে কথা বলা আত্মবিশ্বাস, মর্যাদা এবং সমমর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। বিপরীতে চোখ নিচু করে কথা বলা অনেক সময় আনুগত্য, ভীতি, আত্মসমর্পণ কিংবা অধস্তন অবস্থানের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ফলে একজন নাগরিককে যখন বলা হয়, ‘চোখ নিচু করে কথা বলুন’, তখন সেটি কেবল ভদ্রতার অনুরোধ নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি ক্ষমতার একটি প্রতীকী প্রদর্শন হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে কোনো থানায়, আদালতে বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের মন্তব্যের তাৎপর্য আরও গভীর। কারণ রাষ্ট্রের কর্মকর্তা ও নাগরিকের সম্পর্ক মূলত সেবাদাতা ও সেবাগ্রহীতার। সেখানে কোনো নাগরিক অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি সম্মান ও মর্যাদা পাওয়ার অধিকার রাখেন। আইনও সেটিই বলে। একজন ব্যক্তি অভিযুক্ত হলেও তাকে অপমান করা বা ভীত করার অধিকার কারও নেই।
নাঈম হাসানের ঘটনা তাই একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। যদি একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার, যার পরিচয় বহু মানুষ জানেন, তিনি নিজেকে পরিচয় দেওয়ার পরও এমন আচরণের অভিযোগ করেন, তাহলে সাধারণ নাগরিকরা প্রতিদিন কী ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, সেই প্রশ্নও স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে।
বাংলাদেশে পুলিশের ভাবমূর্তি নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। একদিকে পুলিশ সদস্যরা অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ, দুর্ব্যবহার কিংবা নাগরিককে হেয় করার অভিযোগও প্রায়ই সামনে আসে। এসব অভিযোগের কারণে জনগণের সঙ্গে পুলিশের আস্থার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শক্তি তাদের অস্ত্র বা কর্তৃত্বে নয়, বরং জনগণের আস্থায়। একজন পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্ব শুধু আইন প্রয়োগ করা নয়; একই সঙ্গে নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করাও তার দায়িত্ব। তাই একজন নাগরিকের সঙ্গে কথা বলার সময় ব্যবহৃত শব্দও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক সময় একটি বাক্যই একটি প্রতিষ্ঠানের মানসিকতা প্রকাশ করে।
‘চোখ নিচু করে কথা বলুন’—এই বাক্যটি তাই কেবল একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অংশ নয়। এটি আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতির একটি প্রতিচ্ছবি হতে পারে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতা এখনও সেবার চেয়ে কর্তৃত্বের ভাষায় প্রকাশ পায়।
নাঈম হাসানের অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হবে। দায়ী কেউ থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও প্রয়োজন। তবে ঘটনার বাইরেও একটি প্রশ্ন রয়ে যায়, রাষ্ট্রের একজন নাগরিক কি থানায় গিয়ে মাথা উঁচু করে নিজের কথা বলার অধিকার রাখেন না?
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ হওয়া উচিত।
এদিকে, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগে চট্টগ্রামে পুলিশের এক উপপরিদর্শক (এসআই)সহ তিন সদস্যকে নগরের খুলশী থানা থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।







