মতামত

তৈরি পোশাকশিল্প শুধু একটি খাত নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন

তৈরি পোশাকশিল্প শুধু একটি খাত নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বা রেডিমেড গার্মেন্টস (আরএমজি) খাতকে শুধু পোশাক কারখানার মালিক কিংবা শ্রমিকদের স্বার্থের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ নেই। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, আমদানি সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের স্থিতিশীলতা। অর্থাৎ তৈরি পোশাকশিল্পের সংকট মানে শুধু কয়েকটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়, এর প্রভাব পড়ে দেশের প্রায় প্রতিটি পেশা ও শ্রেণির মানুষের জীবনে।

অনেকের ধারণা, গার্মেন্টসশিল্পের সমস্যা মূলত মালিক ও শ্রমিকদের বিষয়। বাস্তবতা হলো, এই শিল্পের সঙ্গে দেশের অর্থনীতির এমন একটি বিস্তৃত যোগসূত্র তৈরি হয়েছে, যেখানে একজন কৃষক, রিকশাচালক, দোকানি, পরিবহন শ্রমিক, বাড়িওয়ালা কিংবা সাধারণ চাকরিজীবীও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর ওপর নির্ভরশীল। তাই এই শিল্পের স্থায়িত্ব ও অগ্রগতি নিশ্চিত করা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার বিষয় নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস তৈরি পোশাকশিল্প। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে এই খাত থেকে। একই সময়ে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এই আয়ের মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে। আমদানি করা জ্বালানি তেল, গ্যাস, খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, ওষুধ, শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির মূল্য পরিশোধে যে ডলারের প্রয়োজন হয়, তার অন্যতম প্রধান উৎস পোশাক রপ্তানি। ফলে এই খাতে রপ্তানি আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, উৎপাদন খরচ এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর।

দেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়। তাদের বড় একটি অংশ নারী। এই শ্রমিকদের মাসিক আয় শুধু তাদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যয় মেটায় না, সচল রাখে স্থানীয় অর্থনীতির বড় একটি অংশ।

একজন পোশাকশ্রমিকের বেতন থেকে যে অর্থ ব্যয় হয়, তা যায় মুদি দোকান, বাজার, বাড়িভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবায়। শ্রমিকদের আবাসনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে খাবারের দোকান, ছোট ব্যবসা, পরিবহনসেবা ও নানা ধরনের পেশা। একজন কারখানাশ্রমিকের আয় কমে গেলে বা চাকরি হারালে তার প্রভাব পড়ে পরিবারের পাশাপাশি এসব ব্যবসা ও সেবার ওপরও।

অর্থাৎ গার্মেন্টসশিল্পের কর্মসংস্থান শুধু কারখানার ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একটি বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি। এই শিল্পে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কমে গেলে সেই ধাক্কা বহন করতে হয় বহু মানুষকে, যারা সরাসরি কোনো পোশাক কারখানায় কাজ করেন না।

বাংলাদেশের নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনে তৈরি পোশাকশিল্পের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গ্রাম থেকে আসা বহু নারী এই শিল্পে কাজ করে নিজেদের এবং পরিবারের জন্য নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা করেছেন।

নিজস্ব আয় তাদের পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়িয়েছে। সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টি ও পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে তাঁরা অবদান রাখছেন। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

নারীর কর্মসংস্থান বাড়লে তাদের আর্থিক স্বাধীনতার সুযোগ তৈরি হয়। এর সঙ্গে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, মেয়েদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা এবং পরিবারে নারীর অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। ফলে পোশাকশিল্পের সংকট নারীর কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে দেশের টেক্সটাইল, সুতা, কাপড়, ডাইং, প্রিন্টিং, ফিনিশিং, বোতাম, জিপার, লেবেল, কার্টন ও প্যাকেজিং শিল্পের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি শিপিং, বন্দর, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, কাস্টমস ক্লিয়ারিং ও লজিস্টিকস খাতও এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।

একটি পোশাক কারখানার উৎপাদন কমে গেলে শুধু ওই কারখানার শ্রমিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হন না। কারখানাটির কাঁচামাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহন ঠিকাদার, প্যাকেজিং ব্যবসায়ী এবং পণ্য রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সেবাপ্রতিষ্ঠানও কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।

এই সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে রয়েছে উদ্যোক্তা, কর্মচারী ও শ্রমজীবী মানুষ। ফলে তৈরি পোশাকশিল্পের সংকট অন্য শিল্প ও সেবা খাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তৈরি পোশাকশিল্প দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যতম বড় গ্রাহক খাত। কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলা, কার্যকরী মূলধন সংগ্রহ, রপ্তানি ঋণ, বীমা এবং বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে এই শিল্পের নিয়মিত সম্পর্ক রয়েছে।

কোনো কারখানা দীর্ঘদিন উৎপাদন চালাতে না পারলে কিংবা রপ্তানি আদেশ অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে তার আর্থিক দায়ও তৈরি হতে পারে। এতে ব্যাংকের ঋণ আদায়, নতুন ঋণ বিতরণ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনে চাপ সৃষ্টি হয়।

বড় পরিসরে এই সংকট তৈরি হলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ও তারল্য ব্যবস্থাপনাতেও প্রভাব পড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত অন্যান্য ব্যবসা ও বিনিয়োগ খাতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই পোশাকশিল্পের আর্থিক স্থিতিশীলতা ব্যাংকিং খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের অবদান শুধু রপ্তানি আয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের নামমাত্র জিডিপিতে এই খাতের সরাসরি অবদান ছিল ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ।

এই শিল্পে শ্রমিক, কর্মকর্তা ও উদ্যোক্তাদের আয় দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ায়। তাদের ব্যয় থেকে উপকৃত হন কৃষক, দোকানি, বাড়িওয়ালা, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, চিকিৎসক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ।

একটি শিল্পের উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়লে বাজারে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। বিপরীতে উৎপাদন কমে গেলে আয় ও ব্যয় সংকুচিত হয়। এর প্রভাব পড়ে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।

তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্ব তুলে ধরার অর্থ এই নয় যে এই খাতের মালিকপক্ষের সব সিদ্ধান্ত সমর্থন করতে হবে কিংবা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করতে হবে। বরং শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের জন্য মালিক, শ্রমিক, সরকার, ক্রেতা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সময়মতো বেতন-ভাতা এবং চাকরির নিশ্চয়তা যেমন জরুরি, তেমনি কারখানার উৎপাদন, বিনিয়োগ, ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখাও প্রয়োজন। শ্রমিকের অধিকার ও শিল্পের সক্ষমতাকে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না।

একই সঙ্গে শ্রমিক অসন্তোষ, সহিংসতা, চাঁদাবাজি, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর কিংবা পরিকল্পিত নাশকতার অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। কোনো পক্ষের অপরাধ বা অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি শ্রমিক ও উদ্যোক্তা উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে পণ্যের মান, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লে তার মূল্য দিতে হবে পুরো অর্থনীতিকে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক খাত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, আমদানি সক্ষমতা, লাখো মানুষের কর্মসংস্থান, নারীর আর্থিক স্বাধীনতা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার।

তাই এই শিল্পের সংকটকে শুধু মালিক ও শ্রমিকের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর প্রভাব পড়ে দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকায়। শিল্পটি সচল থাকলে তার সুফল বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ পান। আবার শিল্পটি সংকটে পড়লে তার নেতিবাচক প্রভাবও সবার ওপর পড়ে।

তৈরি পোশাকশিল্পকে টিকিয়ে রাখা মানে শুধু রপ্তানি আয় বাড়ানো নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তিকে সুরক্ষিত রাখা। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে শিল্পের স্বার্থ, শ্রমিকের অধিকার এবং জাতীয় অর্থনীতির প্রয়োজনকে সমন্বয় করেই এগিয়ে যেতে হবে।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিষয়:অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আমদানি সক্ষমতা আরএমজি খাত কর্মসংস্থান ক্ষুদ্র ব্যবসা তৈরি পোশাকশিল্প

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…