বাংলাদেশ

প্রবারণা পূর্ণিমা ও লক্ষ্মী পূজা: ফানুসে ফানুসে রাতের ঢাকা

প্রবারণা পূর্ণিমা ও লক্ষ্মী পূজা: ফানুসে ফানুসে রাতের ঢাকা

রাজধানী ঢাকার রাত যেন হয়ে উঠছিল এক উৎসবের নগরী। একদিকে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা। অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব লক্ষ্মী পূজা। লক্ষ্মী পূজা ঘরে ঘরে পালিত হয়। প্রবারণা পূর্ণিমা আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে পালন করা হয়। 

প্রবারণা পূর্ণিমায় ঢাকার আকাশ ছিল ফানুসে ফানুসে ভরা। ‘আশ্বিনী পূর্ণিমা’ নামেও পরিচিত এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ আকাশে রঙিন ফানুস ওড়ানো।

আয়োজকদের মতে, বাসাবো ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারে শুভ প্রবারণাপূর্ণিমায় প্রায় ১৫ শ ফানুস উড়ানো হয়।

(২৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী ফানুস উৎসবের উদ্বোধন করেন। এরপর আকাশে একের পর এক ফানুসের উড্ডয়ন শুধু দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যই তৈরি করেনি, পরিণত হয়েছে উৎসবের রজনী হিসেবে।

বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের কাছে এর রয়েছে বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্য। ফানুস ওড়ানোর মধ্য দিয়ে গৌতম বুদ্ধের ত্যাগ, সংকল্প ও বুদ্ধত্ব লাভের সাধনার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।

বৌদ্ধ পঞ্জিকা অনুযায়ী, আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বর্ষাব্রত পালন করেন। এ সময় তারা ধ্যান, শাস্ত্র অধ্যয়ন ও আধ্যাত্মিক সাধনায় মনোনিবেশ করেন। বর্ষাব্রত শেষে প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপিত হয়। দিনটি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পরিচিত।

ফানুস ওড়ানোর পেছনের কাহিনি

বৌদ্ধধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রাজকুমার সিদ্ধার্থ পরবর্তী সময়ে গৌতম বুদ্ধ দুঃখমুক্তির পথ অনুসন্ধানে রাজ্য, রাজত্ব ও ভোগবিলাস ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাতে তিনি সারথি ছন্দককে সঙ্গে নিয়ে অশ্ব কন্থকের পিঠে চড়ে অনোমা নদীর তীরে পৌঁছান। সেখানে রাজকীয় পোশাক ও অলংকার সারথির হাতে তুলে দিয়ে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেন।

কথিত আছে, সন্ন্যাস গ্রহণের পর সিদ্ধার্থ নিজের রাজকীয় কেশগুচ্ছ তরবারি দিয়ে কেটে ফেলেন। এরপর তিনি সংকল্প করেন, বুদ্ধত্ব লাভের যোগ্যতা তার মধ্যে থাকলে কেশগুচ্ছ মাটিতে না পড়ে আকাশে স্থির থাকবে। সেই সংকল্পে তিনি কেশগুচ্ছটি ঊর্ধ্বে নিক্ষেপ করেন। বৌদ্ধধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কেশগুচ্ছটি মাটিতে পড়েনি।

জনশ্রুতি অনুসারে, দেবরাজ ইন্দ্র সেই কেশগুচ্ছ একটি রত্নখচিত স্বর্ণপাত্রে ধারণ করে তাবতিংস স্বর্গে নিয়ে যান। সেখানে কেশধাতুটি সংরক্ষণের জন্য নির্মাণ করা হয় চুলামনি চৈত্য। দেবতারা সেই চৈত্যের পূজা করেন বলে বৌদ্ধদের বিশ্বাস।

এই বিশ্বাস থেকেই বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা বিশেষ ধর্মীয় আচার পালনের মধ্য দিয়ে আকাশে ফানুস ওড়ান। এর মাধ্যমে তারা স্বর্গে অবস্থিত চুলামনি চৈত্যের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ধর্মীয় মন্ত্র উচ্চারণ, প্রদীপ প্রজ্বালন ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে ফানুস উৎসব পালিত হয়।

আষাঢ়ী পূর্ণিমার পরিবর্তে প্রবারণায় কেন

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সিদ্ধার্থের কেশগুচ্ছ ত্যাগের স্মৃতির সঙ্গে আষাঢ়ী পূর্ণিমার সম্পর্ক রয়েছে। তবে বর্ষাকালে বৃষ্টি ও আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় ফানুস ওড়ানোর পরিবেশ অনুকূল থাকে না। এ কারণে অনেক বৌদ্ধ সম্প্রদায় প্রবারণা পূর্ণিমায় ফানুস ওড়ানোর আয়োজন করে থাকেন।

দেশজুড়ে উৎসবের আয়োজন

প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে বিশেষ প্রার্থনা, ত্রিপিটক পাঠ, ধ্যান, পঞ্চশীলন, অষ্টশীলন, প্রদীপ প্রজ্বালন ও ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় বিহারগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। পাশাপাশি আকাশে ওড়ানো হয় অসংখ্য ফানুস।

রাজধানী ঢাকায় মেরুল বাড্ডার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার, বাসাবো ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারসহ বিভিন্ন বিহারে ভক্তদের সমাগম ঘটে। বাংলাদেশ বৌদ্ধ ফেডারেশনও দিনটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করে। প্রার্থনা ও অন্যান্য ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ফানুস ওড়ানোর মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।

বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের কাছে ফানুস তাই কেবল উৎসবের অনুষঙ্গ নয়; এটি ত্যাগ, সংকল্প, শ্রদ্ধা ও আধ্যাত্মিক সাধনার প্রতীক। সন্ধ্যার আকাশে আলোকিত ফানুসের উড্ডয়ন তাদের কাছে গৌতম বুদ্ধের জীবন ও সাধনার স্মৃতি স্মরণ করার একটি বিশেষ ধর্মীয় আয়োজন।

গৌতম বুদ্ধকে অনুসরণ করলে মানুষ মানবিক-বিবেকবান হয়ে উঠবে: রিজভী

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা অনুসরণ ও চর্চা করলে মানুষ শুদ্ধ, মানবিক ও বিবেকবান হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, গৌতম বুদ্ধের বাণী কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য। এতে সমাজে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় হবে।

রোববার (২৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর বাসাবো ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারে শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

‘মানবিক মূল্যবোধের দৃষ্টিতে প্রবারণার গুরুত্ব’ শীর্ষক এক সভার আয়োজন করে শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা ও কঠিন চীবর দান উদযাপন পরিষদ এবং বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ, ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার।

রিজভী বলেন, প্রবারণা পূর্ণিমার তাৎপর্য শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে মানুষের চিত্তের শুদ্ধি, নিজের ভুল উপলব্ধি করা এবং অনুশোচনার মধ্য দিয়ে নিজেকে সংশোধনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। বর্ষাবাস শেষে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নিজেদের কোনো ভুল, অন্যায় বা বিচ্যুতি হয়ে থাকলে তা স্বীকার করার মধ্য দিয়ে আত্মশুদ্ধির চর্চা করেন। এই শিক্ষা শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য নয়, বরং সব মানুষের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ।

বিশ্ব বৌদ্ধ সৌভ্রাতৃত্ব সংঘ থাইল্যান্ডের সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সভাপতি ও ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারের অধ্যক্ষ শ্রীসদ্ধর্মসাসনধ্বজ বুদ্ধপ্রিয় মহাথের সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য রাখেন রেল ও সড়ক প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব; প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃগোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার প্রমুখ।

বিষয়:আশ্বিনী পূর্ণিমা কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা প্রবারণা পূর্ণিমা ফানুস উৎসবের রাত বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ বিশ্ব বৌদ্ধ সৌভ্রাতৃত্ব সংঘ

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…