চট্টগ্রাম

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে কাঠামোগত সংস্কার ও কার্যকর স্ব-নিয়ন্ত্রণের তাগিদ

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে কাঠামোগত সংস্কার ও কার্যকর স্ব-নিয়ন্ত্রণের তাগিদ

ছবি: সংগৃহীত

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে নীতিগত আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন চট্টগ্রাম বিভাগের গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা।

তারা বলেন, বিচ্ছিন্ন ও আংশিক পদক্ষেপের পরিবর্তে সামগ্রিক কাঠামোগত সংস্কার সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষা, সাংবাদিকদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য জরুরি। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও জোরদার করার তাগিদ দেন তারা।

তাদের মতে, স্পষ্ট সম্পাদকীয় নীতিমালা, ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং পাঠক-দর্শকের জন্য কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা সংবাদমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর উপায় হতে পারে।

বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের পেশাগত ও নৈতিক মানোন্নয়ন এবং কার্যকর স্ব-নিয়ন্ত্রণের একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো যাচাইয়ের লক্ষ্যে ধারাবাহিক আলোচনার অংশ হিসেবে আজ রোববার চট্টগ্রামে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। খুলনা, বরিশাল ও সিলেটের পর এটি এমআরডিআই-এর বিভাগীয় মতবিনিময় সভার চতুর্থ আয়োজন, যা হাইকমিশন অব কানাডা ইন বাংলাদেশ-এর অর্থায়নে কানাডা ফান্ড ফর লোকাল ইনিশিয়েটিভস (সিএফএলআই)-এর আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।

সভায় চট্টগ্রাম ও বিভাগের অন্যান্য জেলা থেকে সংবাদমাধ্যমের মালিক ও প্রকাশক, সম্পাদক, সংবাদ সিদ্ধান্তগ্রহীতা, সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় এমআরডিআই-এর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যত কার্যকর হবে, সংবাদমাধ্যমে বাইরের হস্তক্ষেপের সুযোগ তত কমবে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষায় নিজস্ব জবাবদিহির ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তার প্রতি পাঠক-দর্শকের আস্থার ওপর নির্ভরশীল। যতক্ষণ পাঠক, শ্রোতা ও দর্শকের সংবাদমাধ্যমের ওপর আস্থা থাকবে, ততক্ষণ সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবে। এই আস্থা ধরে রাখতে সংবাদমাধ্যমগুলোকে নিজেদের জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।”

তিনি সাংবাদিকদের পাশাপাশি সম্পাদক ও মালিকদের জন্য পৃথক আচরণবিধি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন। সংবাদমাধ্যম সংস্কারে এমআরডিআই-এর পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা (২০২৫-২০৩০)-এর অংশ হিসেবে স্ব-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে আশাবাদ ব্যাক্ত করেন তিনি।

সভায় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে নীতিগত আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, সুপারিশগুলো দেশের সাংবাদিক, সম্পাদক, মালিক ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত হওয়ায় এগুলো বাস্তবায়নে স্বচ্ছ, সমন্বিত ও সময়োপযোগী উদ্যোগ প্রয়োজন।

তারা মত দেন, সংস্কার বাস্তবায়ন কার্যক্রম নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সীমিত না রেখে মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। আইন, নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় সামগ্রিক সংস্কারই সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষা, সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জনআস্থা পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সংস্কারের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান এবং দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, ”সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালা শুধু আমাদের একার কথা নয়; সম্পাদক, মালিক ও সাংবাদিকসহ পুরো ইন্ডাস্ট্রির সম্মিলিত মতামত। আইন সংশোধন করে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নিলে বর্তমান নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতির টেকসই সমাধান হবে না। একটি স্বাধীন স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশন গঠনের মাধ্যমে কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে এবং নিজস্ব নৈতিক আচরণবিধির ভিত্তিতে কার্যকর স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, “আমরা যদি নিজেরা নিজেদের জবাবদিহির ব্যবস্থা না করি, তবে সরকার সাইবার আইনের মতো কঠোর ও বিতর্কিত বিধান চাপিয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পাবে।”

অংশগ্রহণকারীরা একমত হন, টেকসই স্ব-নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার, মালিকপক্ষ, বিজ্ঞাপনদাতা ও রাজনৈতিক পক্ষের চাপ প্রতিরোধে সক্ষম শক্তিশালী ও স্বাধীন সম্পাদকীয় নীতিমালা এবং কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থা প্রয়োজন।

সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ নিয়েও আলোচনা হয় সভায়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, নৈতিক সাংবাদিকতাকে আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এ জন্য সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষের প্রতি সময়মতো বেতন প্রদান, আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র, আইনানুগ সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তাঁরা।
জাতীয় পর্যায়ে স্ব-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা ও নীতিগত উদ্যোগে ঢাকার বাইরের সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা।

আলোচনায় আরও অংশ নেন এম এ মালেক, সম্পাদক, দৈনিক আজাদী; ডা. ম রমিজউদ্দীন চৌধুরী, সম্পাদক, দৈনিক পূর্বকোণ; রুশো মাহমুদ, সম্পাদক, সুপ্রভাত বাংলাদেশ; ওসমান গণি মনসুর, সম্পাদক, দৈনিক পিপলস ভিউ; জাহিদুল করিম কচি, সভাপতি, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব; এম আলী হোসেন, সভাপতি, চট্টগ্রাম এডিটরস ক্লাব; গোলাম মাওলা মুরাদ, সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম রিপোর্টাস ফোরাম; জেসমিন সুলতানা পারু, প্রধান নির্বাহী, ইলমা; ড. মো: আরিফুর রহমান, প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী, ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা); এস এম নাজির হোসেন, নির্বাহী পরিচালক, ইন্টিগ্রেটেড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট এফোর্ট (আইএসডিই); শাহাব উদ্দিন নিপু, বিভাগীয় প্রধান, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; ইয়াসের সিলমি, বিভাগীয় প্রধান, জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ, বিজেসি ট্রাস্ট ইউনির্ভাসিটি বাংলাদেশ; দিলরুবা আক্তার, বিভাগীয় প্রধান, জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি; শামসুল হক হায়দারী, সাবেক সভাপতি, টিভি জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন চট্টগ্রাম; আনোয়ার আল হক, সম্পাদক, দৈনিক রাঙ্গামাটি; আমিরুল ইসলাম হারুন, সম্পাদক, দৈনিক সচিত্র নোয়াখালী; রিপন চাকমা, নির্বাহী পরিচালক, তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থা; এবং মাহমুদুল হাসান, সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

বিষয়:এমআরডিআই-এর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান গণমাধ্যম চট্টগ্রামে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) সংস্কার স্বাধীনতা

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…