অপরাধ

মিরপুরে ‘মামুন বাহিনীর’ দখল-চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য

শেষে বিএনপি থেকে বহিষ্কার

মিরপুরে ‘মামুন বাহিনীর’ দখল-চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য
অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন

রাজধানীর মিরপুরে জমি দখল থেকে শুরু করে পোশাক কারখানায় চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, মাদক কারবার এবং নির্মাণপ্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ‘মামুন বাহিনীর’ বিরুদ্ধে।

পল্লবী, মিরপুর-১২, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকায় এই বাহিনীর তৎপরতার কথা বলছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে, মালয়েশিয়ায় অবস্থান করেই বাহিনীটি নিয়ন্ত্রণ করেন মফিজুর রহমান মামুন। দেশে তার দুই ভাই জামিল রহমান ও মশিউর রহমান মাঠপর্যায়ে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।

প্রায় ২৫ কোটি টাকা মূল্যের ২৮ কাঠা জমি দখল, চাঁদা না পেয়ে ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া, পাঁচ কোটি টাকা দাবি করে নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং টাকা না দিলে গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে বিদেশে অবস্থানরত মামুনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার ভাই মশিউর রহমান অবশ্য চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

আবাসন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলীর অভিযোগ, পল্লবী থানার বাইগারটেক এলাকায় তার প্রায় ২৮ কাঠা জমির সীমানাপ্রাচীর ও পাঁচটি টিনের ঘর গত ৩০ এপ্রিল রাতে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে জমিটি দখল করে নেওয়া হয়। জমিটির আনুমানিক মূল্য ২৫ কোটি টাকা বলে দাবি তার। মামুনের ছোট ভাই মশিউর রহমান তাকে সেখানে যেতে নিষেধ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সাগুফতা হাউজিং এলাকাতেও জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। সেখানে ছয় বছর আগে পাঁচ কাঠা জমি কিনে ঘর নির্মাণ করেছিলেন ১৮টি পরিবার। এরমধ্যে বেশিরভাগ শেয়ারহোল্ডারই ছাত্রদল ও বিএনপির সাবেক-বর্তমান নেতাকর্মী। তাদের অভিযোগ, চাঁদা না পেয়ে গত ২৯ জুলাই রাতে খননযন্ত্র দিয়ে ঘরগুলো ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন দপ্তরে এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় একাধিক নেতার কাছে গিয়েও তারা কোনো সমাধান পাননি।

পাশের আরও পাঁচ কাঠা জমির মালিক মো. ইউনুস মিয়ার দাবি, তার জমিও দখল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ১০ কাঠা জমিতে বাহিনীর সদস্যরা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, মিরপুরের অন্তত সাতটি জমি দখলের ঘটনায় এই বাহিনীর নাম এসেছে।

জমি কেনাবেচা ও ভবন নির্মাণ ঘিরেও চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পল্লবীতে বাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার পর জাহিদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি গত ৩০ এপ্রিল দুটি বিদেশি নম্বর থেকে ফোন পান। তাকে ৫০ লাখ টাকা দিতে বলা হয়। পাঁচ দিনের মধ্যে টাকা না দিলে গুলি করে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে পল্লবী থানায় করা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই প্রতিবেদনে পল্লবীর কালশী এলাকার একটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তার অভিযোগ তুলে ধরা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান, গত রমজানে মামুন বাহিনীর লোকজন তার কার্যালয়ে গিয়ে মাসে এক লাখ টাকা দাবি করেন। পুলিশকে বিষয়টি জানানোর পর মামুন বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে তাকে হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে স্থানীয় এক নেতার মধ্যস্থতায় মাসিক চাঁদার পরিমাণ ২০ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয়। এরপর প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বাহিনীর লোকজন এসে টাকা নিয়ে যেতেন বলে দাবি ওই কর্মকর্তার।

এর আগে গত বছরের ১২ জুলাই পল্লবীতে এ কে বিল্ডার্স নামের একটি আবাসন নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে অস্ত্রধারীদের হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশ তখন জানিয়েছিল, পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে তা না পেয়ে হামলা চালানো হয়। হামলায় প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, এ ঘটনার সঙ্গে মামুনের সংশ্লিষ্টতা ছিল।

মিরপুরের পোশাক কারখানাগুলোতেও চাঁদাবাজি ও ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের তালিকা ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মামুন বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় শতাধিক পোশাক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা থেকে মাসে ২০ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি কারখানার উৎপাদিত ঝুট বিক্রির ব্যবসা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার অভিযোগও রয়েছে বাহিনীটির বিরুদ্ধে।

অভিযোগ শুধু জমি ও কারখানায় সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পল্লবী, মিরপুর-১২, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকায় কেবল টেলিভিশন ও ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ বস্তির ঘর থেকে ভাড়া আদায়ের সঙ্গেও বাহিনীটির নাম জড়িয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এসব কর্মকাণ্ডের অভিযোগ বেড়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থান করা চার ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে মিরপুরে ‘ফোর স্টার গ্রুপ’ নামে পরিচিত চারটি পৃথক অপরাধী দলের তৎপরতা রয়েছে। মামুন ছাড়াও মো. ইব্রাহিম ওরফে ‘কিলার ইব্রাহিম’, পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মিরপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহাদত হোসেন এবং মোক্তার নামের আরেক ব্যক্তি পৃথক দল নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের অনুসারীরা মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ভাগ করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালান বলে পুলিশের সূত্র জানিয়েছে।

চারটি দলের মধ্যে মামুনের বাহিনীকে সবচেয়ে বড় বলে উল্লেখ করেছে পুলিশ। দেশে তার দুই ভাই জামিল রহমান ও মশিউর রহমান বাহিনী পরিচালনায় যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। বাহিনীর আরও কয়েকজন সদস্যের নাম পুলিশের কাছে রয়েছে। তাদের মধ্যে জনি ও রোকন যুবদল নেতা কিবরিয়া হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তৈরি চাঁদাবাজদের তালিকায় মিরপুরের সাত থানা এলাকায় ৭২ জনের নাম রয়েছে। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হিসেবে চিহ্নিত ২৫ জনের মধ্যে মামুন ও তার দুই ভাইয়ের নামও রয়েছে বলে পুলিশের সূত্রের বরাতে জানা গেছে। মিরপুর এলাকায় ফুটপাত, বাজার, নির্মাণপ্রতিষ্ঠান, পোশাক কারখানা ও ঝুট ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি অপরাধ পর্যালোচনা সভায় সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনতে মাঠপর্যায়ের পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন বাহিনীর মহাপরিদর্শক (আইজপি) আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেন, “এক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনার কোন সুযোগ নেই, অপরাধীর একমাত্র পরিচয় অপরাধীই।”

মামুনের বিরুদ্ধে আগেও একাধিক মামলা থাকার কথা জানিয়েছিল পুলিশ। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশের ভাষ্য ছিল, পল্লবী থানায় খুন, চাঁদাবাজি, মাদক, ডাকাতি ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ২৭টি মামলা, ১৫টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং দুটি সাজা পরোয়ানা ছিল। এর আগে ভারতে পাসপোর্ট জালিয়াতি ও অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলায় ১০ বছর সাজা ভোগ করেন বলেও পুলিশ সূত্রের দাবি। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আবার বিদেশে চলে যান বলে জানা গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে মামুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার ভাই মশিউর রহমান চাঁদাবাজি, জমি দখল ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বৈধ কাগজপত্র থাকা পক্ষকে তারা সহায়তা করেন। তবে জমির মালিকানা নির্ধারণ ও দখল বুঝিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার আদালত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর, কোনো ব্যক্তিগত গোষ্ঠীর নয়।

এতসব অভিযোগের মধ্যে গত ২৯ সেপ্টেম্বর বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে মফিজুর রহমান মামুনকে। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির পল্লবী থানাধীন ৯১ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি ছিলেন তিনি। দলের সহদপ্তর সম্পাদক মুহম্মদ মুনির হোসেনের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অনৈতিক কার্যকলাপ ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের দায়ে তার প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের দলীয় পদ বাতিল করা হয়েছে। তবে বিজ্ঞপ্তিতে বহিষ্কারের কারণ হিসেবে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগের বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি। তবে মিরপুরের ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও এবং ওই ভবনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় তার বাহিনীর নাম এসেছিল। এরপরই বিএনপির দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার হন মামুন বাহিনীর প্রধান মফিজুর রহমান মামুন।

বিষয়:চাঁদাবাজি দখল পুলিশ মামুন বাহিনী মিরপুর

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…