ধর্ম ও জীবন

ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহের গুরুত্ব, উদ্দেশ্য ও বিধান

ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহের গুরুত্ব, উদ্দেশ্য ও বিধান

ছবি: সংগৃহীত

ইসলামে বিবাহ শুধু সামাজিক বন্ধন নয়, এটি ভালোবাসা, দায়িত্ব, পারস্পরিক সম্মান ও মানসিক প্রশান্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। ইসলামি শিক্ষায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে এমন এক বন্ধন হিসেবে দেখা হয়, যেখানে দুজন মানুষ একে অপরের সহযোগী হয়ে জীবন পরিচালনা করেন এবং পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করেন।

১. বিবাহের মূল উদ্দেশ্য: প্রশান্তি ও ভালোবাসা

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
“আর তার নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।”
— সুরা আর-রুম, আয়াত ২১
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামে বিবাহের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানসিক প্রশান্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক মমতার পরিবেশ তৈরি করা। দাম্পত্য সম্পর্ক কেবল দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এতে আবেগ, সহমর্মিতা ও একে অপরের প্রতি যত্নও গুরুত্বপূর্ণ।

২. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব

ইসলামে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে।
কোরআনে বলা হয়েছে: “আর নারীদের জন্য ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমন রয়েছে তাদের ওপর দায়িত্ব।”
— সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২২৮
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান, সদাচরণ, বিশ্বস্ততা এবং দায়িত্বশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পক্ষের অধিকার উপেক্ষা করা বা অন্যায় আচরণ করাকে দাম্পত্য সম্পর্কের আদর্শ হিসেবে দেখা যায় না।

৩. বিবাহে সম্মতির গুরুত্ব

ইসলামে বিবাহের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে নারীর অনুমতি ছাড়া তাঁকে বিবাহ দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
অর্থাৎ, বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ইচ্ছা ও সম্মতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। জোরপূর্বক বিবাহ ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

৪. মোহর নারীর অধিকার

ইসলামে বিবাহের সময় স্ত্রীকে মোহর প্রদান করা স্বামীর দায়িত্ব।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে: “আর তোমরা নারীদের তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করো।”
— সুরা আন-নিসা, আয়াত ৪
মোহর স্ত্রীর নিজস্ব অধিকার ও সম্পদ। এটি কোনো প্রতীকী উপহারমাত্র নয়, বরং বিবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি স্বীকৃত আর্থিক অধিকার।

৫. ভালো আচরণ ও পারিবারিক দায়িত্ব

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।”
— জামে আত-তিরমিজি
ইসলামের দৃষ্টিতে একজন ভালো জীবনসঙ্গী হওয়ার অর্থ শুধু আর্থিক দায়িত্ব পালন করা নয়, বরং সম্মান, সহানুভূতি, ধৈর্য ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে সম্পর্ককে সুস্থ রাখা। একইভাবে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই একে অপরের প্রতি সদাচরণ করা উচিত।

৬. বিবাহ কি সবার জন্য বাধ্যতামূলক?

ইসলামি আইনশাস্ত্রে বিবাহের বিধান ব্যক্তির পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। ব্যক্তির সামর্থ্য, দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা এবং অন্যায়ের আশঙ্কার মতো বিষয় বিবেচনা করে আলেমরা বিবাহের বিধান ব্যাখ্যা করেছেন। তাই বিবাহকে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য সব পরিস্থিতিতে একইভাবে বাধ্যতামূলক বলা সঠিক নয়।

৭. দাম্পত্য জীবনে সমস্যা হলে ইসলামের নির্দেশনা

প্রতিটি দাম্পত্য সম্পর্কে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে। ইসলাম এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য, আলোচনা, ন্যায়বিচার এবং প্রয়োজনে মধ্যস্থতার ওপর গুরুত্ব দেয়। কোরআনের সুরা আন-নিসার ৩৫ নম্বর আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ মীমাংসায় উভয় পরিবারের পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের নির্দেশনা রয়েছে।

তবে কোনো সম্পর্কে নির্যাতন বা নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে শুধু সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য তা সহ্য করাকে ধর্মীয় দায়িত্ব বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং উপযুক্ত সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ হলো ভালোবাসা, দায়িত্ব, পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্ধন। এর উদ্দেশ্য শুধু সংসার প্রতিষ্ঠা করা নয়, বরং এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তোলা, যেখানে উভয়েই প্রশান্তি, মর্যাদা ও সহযোগিতা লাভ করেন।

ইসলামে সফল বিবাহের ভিত্তি শুধু একসঙ্গে থাকা নয়, বরং একে অপরের অধিকার রক্ষা করে ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে জীবনযাপন করা।

বিষয়:ইসলাম বিধান বিবাহ

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…