মতামত

চিরন্তন মেসি: একজন মানুষের বিদায়, একটি যুগের অবসান

চিরন্তন মেসি: একজন মানুষের বিদায়, একটি যুগের অবসান

ছবি: সংগৃহীত

অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন

কিছু মানুষ ফুটবল খেলেন। আর কিছু মানুষ ফুটবলকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেন। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি সেই দ্বিতীয় ঘরানার। যেখানে খুব বেশি খেলোয়াড় নেই।

মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন; মেসি এমন এক শিল্পী, যিনি সবুজ ঘাসের ক্যানভাসে পায়ের তুলিতে একে গেছেন অসংখ্য অমর ছবি। তার খেলা দেখতে গিয়ে মানুষ কখনো মুগ্ধ হয়েছে, কখনো কেঁদেছে, কখনো হাততালি দিয়েছে, আবার কখনো নীরব হয়ে গেছে। কারণ মেসির ফুটবল কেবল চোখের আনন্দ নয়, হৃদয়ের গভীরে দাগ কাটার মতো এক অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতা। সেই মানুষটির আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘোষিত হলো এক ঐতিহাসিক রাতে, যা ফুটবল-ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বুয়েনস আয়ার্সের ঐতিহাসিক মনুমেন্টাল স্টেডিয়াম। নীল-সাদা পতাকার ঢেউয়ে ভাসছে গ্যালারি। হাজার হাজার মানুষের চোখে আনন্দ ও বেদনার অশ্রু। মুখে একটিই নাম, মেসি। বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেললেন ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি। বিদায়ী ম্যাচেও তিনি ছিলেন সেই চেনা মেসি। একটি গোল, দুটি গোলে সহায়তা এবং পুরো মাঠজুড়ে তার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও সৃষ্টিশীলতার ছাপ। মনে হচ্ছিল, বিদায়ের মুহূর্তেও মানুষটি যেন বিদায় নিতে রাজি নন। কিন্তু সময়ের নিজস্ব নিয়ম আছে, ফুটবলেরও আছে। আর্জেন্টিনার হয়ে এটাই মেসির শেষ আন্তর্জাতিক অধ্যায়; কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে মেসির গল্প শেষ হওয়ার নয়।

মনুমেন্টালের গ্যালারিতে বসে থাকা এক বৃদ্ধ দর্শক হয়তো মনে মনে ফিরে গিয়েছিলেন ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট, বুদাপেস্টের সেই সন্ধ্যায়। তখন মেসির বয়স মাত্র ১৮। জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেকের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। কে জানত, সেই কিশোর একদিন আর্জেন্টিনার ফুটবলের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ প্রতীক হয়ে উঠবেন? কে জানত, সেই লাল কার্ডের অপমান থেকে শুরু হয়ে একদিন বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি হাতে তুলে নেওয়া পর্যন্ত এক মহাকাব্যিক যাত্রা অপেক্ষা করছে?

২৪ জুন ১৯৮৭ সালে আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে জন্ম নেওয়া সেই ছোট্ট ছেলেটি মাত্র ১৩ বছর বয়সে পাড়ি জমিয়েছিল বার্সেলোনার বিখ্যাত ফুটবল একাডেমি লা মাসিয়ায়। শারীরিক গড়নে তিনি ছিলেন তুলনামূলকভাবে ছোট; কিন্তু তার বা পায়ে ছিল এমন এক জাদুকরি শক্তি, যা ফুটবলের প্রচলিত ব্যাকরণকে বারবার নতুন করে লিখেছে। লা মাসিয়ার কোচরা প্রথম দিনেই বুঝেছিলেন, এই ছেলেটি সাধারণ নন। তার মধ্যে ছিল এমন এক বলনিয়ন্ত্রণ সহজাত ক্ষমতা, যা প্রশিক্ষণে শেখানো যায় না; যা জন্মগত, ঈশ্বরপ্রদত্ত। ২০০৪ সালে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেকের পর শুরু হয় এমন এক অধ্যায়, যা ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য মানদণ্ড তৈরি করেছে।

গোল করা, গোল করানো, আক্রমণ তৈরি করা, প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দেওয়া, ফ্রি-কিক থেকে গোল করা কিংবা মাঝমাঠ থেকে খেলার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা। মেসি একই ক্যারিয়ারে এতগুলো ভূমিকাকে এমনভাবে ধারণ করেছেন যে তাঁকে শুধু একজন গোলদাতা বা আক্রমণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা অসম্ভব। তিনি একই সঙ্গে স্রষ্টা ও প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ বিধ্বংসী; একই সঙ্গে স্থপতি ও শিল্পী; একই সঙ্গে যোদ্ধা ও জাদুকর।

বার্সেলোনার হয়ে ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল, ১০টি লা লিগা, চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং অসংখ্য ব্যক্তিগত ও দলীয় পুরস্কার তার পরিসংখ্যানের একটি অংশমাত্র। এক পঞ্জিকাবর্ষে ৯১ গোলের রেকর্ড তার গোল করার ক্ষমতার বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত। কিন্তু মেসিকে কেবল সংখ্যায় বোঝা যায় না। তার সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো একটি ট্রফি, কোনো একটি রেকর্ড বা কোনো একটি ব্যক্তিগত পুরস্কার নয়। তার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো তিনি ফুটবলকে সুন্দর করে তুলেছেন। তার পায়ের সঙ্গে বলের সম্পর্ক ছিল যেন কোনো শিল্পীর তুলির সঙ্গে ক্যানভাসের সম্পর্ক; আর তার খেলা ছিল যেন গতিশীল শিল্পের এক অনবদ্য প্রকাশ। যে মানুষটি একবার মেসির খেলা দেখেছেন, তিনি জানেন ফুটবল কেবল গোল করার খেলা নয়; ফুটবল হলো মুহূর্ত সৃষ্টি করার খেলা, সৌন্দর্য সৃষ্টি করার খেলা, আর সেই সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় নাম মেসি।

কিন্তু এমন একজন খেলোয়াড় হয়েও মেসির সঙ্গে জন্মভূমি আর্জেন্টিনার সম্পর্ক সব সময় এত সহজ ছিল না। জাতীয় দলের হয়ে তার পথ ছিল দীর্ঘ, কঠিন এবং অনেক সময় বেদনাদায়ক। ২০০৫ সালে অভিষেকের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাল কার্ড পাওয়া দিয়ে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক যাত্রা পরে পরিণত হয় এক দীর্ঘ সংগ্রামে। ২০০৭ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল, ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে বারবার শিরোপার খুব কাছে গিয়েও তাকে ফিরে আসতে হয়েছে খালি হাতে।

প্রতিবারই উঠেছে প্রশ্ন, ক্লাব ফুটবলে এত সফল মেসি কেন আর্জেন্টিনার জার্সিতে একই সাফল্য এনে দিতে পারছেন না। সমালোচনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ২০১৬ সালে তিনি জাতীয় দল থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তও জানিয়েছিলেন। সেই রাতে তাকে দেখা গিয়েছিল বিধ্বস্ত, ক্লান্ত, অপমানিত এক মানুষ হিসেবে, যিনি তার দেশের জার্সিতে সবকিছু দিয়েও পেয়েছেন কেবল অভিযোগ আর অবিশ্বাস।

কিন্তু আর্জেন্টিনা তাকে ছাড়েনি, তিনিও আর্জেন্টিনাকে ছাড়েননি। এখানেই মেসির দেশপ্রেমের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তিনি ফিরে এসেছেন, আবার হেরেছেন, আবার চেষ্টা করেছেন, আবার স্বপ্ন দেখেছেন। ২০২১ সালে ব্রাজিলের মারাকানায় কোপা আমেরিকা জয় যেন তার দীর্ঘ অপেক্ষার প্রথম বড় পুরস্কার। এরপর ওয়েম্বলিতে আন্তঃমহাদেশীয় শিরোপা এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই বিশ্বকাপ ফাইনাল শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ ছিল না; সেটি ছিল মেসি বনাম ইতিহাস, মেসি বনাম দীর্ঘদিনের সংশয় এবং মেসি বনাম নিজের অপূর্ণতার এক মহাকাব্যিক লড়াই। সেই রাতে লুসাইল স্টেডিয়ামে বসে থাকা কোটি মানুষ দেখেছিলেন একজন মানুষ কীভাবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলেছেন, কীভাবে তিনি হারতে হারতে জিততে শিখেছেন, কীভাবে তিনি প্রতিটি বাধাকে অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের শিখর সিঁড়িতে পৌঁছে গেছেন। বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে তুলে নেওয়ার মুহূর্তে যেন আর্জেন্টিনার সঙ্গে তার সম্পর্ক পূর্ণতা পেল। ২০২৪ সালে আরও একটি কোপা আমেরিকার শিরোপা তার আন্তর্জাতিক উত্তরাধিকারকে আরও শক্তিশালী করে।

মেসির দেশপ্রেমের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়তো কোনো বক্তৃতায় নয়, বরং তার ফিরে আসার সিদ্ধান্তে। তিনি চাইলে ২০১৬ সালের পর আর কখনো আর্জেন্টিনার জার্সি পরতে পারতেন না। কিন্তু তিনি তা করেননি। পরাজয়ের পরও তিনি থেকেছেন, সমালোচনার মধ্যেও থেকেছেন, বারবার নতুন করে চেষ্টা করেছেন। তার জন্য আর্জেন্টিনা শুধু একটি জাতীয় দল ছিল না; ছিল পরিচয়ের অংশ, আবেগের অংশ, শৈশবের স্মৃতি এবং নিজের অস্তিত্বের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই কাতারের সেই বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসির চোখের জল ছিল শুধু একজন বিজয়ী অধিনায়কের আনন্দের অশ্রু নয়; তা ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা, অপমান, হতাশা, ব্যর্থতা ও প্রত্যাবর্তনের একসঙ্গে মুক্তি। সেই অশ্রুতে ভেসে গিয়েছিল ২০১৪ সালের মারাকানার বেদনা, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপার হাহাকার, ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের হতাশা, সবকিছু। মেসি কাঁদছিলেন, আর তার সঙ্গে কাঁদছিল গোটা আর্জেন্টিনা, গোটা ফুটবল-বিশ্ব।

মেসির ক্যারিয়ারের আরেকটি বিস্ময়কর দিক তার দীর্ঘস্থায়িত্ব। একজন ১৮ বা ২০ বছর বয়সী ফুটবলারের পক্ষে অসাধারণ হওয়া কঠিন হলেও সম্ভব। কিন্তু ৩০, ৩৫ কিংবা ৩৯ বছর বয়সেও বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। মেসি সেটিই করেছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার খেলার ধরন বদলেছেন। তরুণ মেসির প্রধান অস্ত্র ছিল বিস্ফোরক গতি, দ্রুত বল নিয়ে এগিয়ে যাওয়া এবং একের পর এক প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে গোল করা। পরিণত বয়সে এসে তিনি শিখেছেন কখন দৌড়াতে হবে, কখন থামতে হবে, কখন বল চাইতে হবে এবং কখন একটি মাত্র স্পর্শে পুরো আক্রমণের গতিপথ বদলে দিতে হবে। তিনি হয়তো আগের মতো বেশি দৌড়ান না, কিন্তু আগের চেয়ে বেশি দেখেন। তিনি হয়তো কম জায়গা অতিক্রম করেন, কিন্তু তার একটি পাস আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বহন করে। এটিই অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ রূপ।

এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পেছনে রয়েছে শারীরিক প্রস্তুতি, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, অনুশীলনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক দৃঢ়তা। তবে শুধু শরীরকে সুস্থ রাখাই যথেষ্ট নয়। একজন খেলোয়াড়কে সময়ের সঙ্গে নিজের খেলার ধরন বদলাতে হয়। মেসি সেটি অসাধারণভাবে পেরেছেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি ছিলেন দুরন্ত বল-জাদুকর; পরে হয়েছেন ভয়ঙ্কর গোলদাতা; এরপর খেলার নির্মাতা; আর পরিণত বয়সে হয়েছেন এমন এক অভিজ্ঞ পরিচালক, যিনি অনেক সময় মাঠে দাঁড়িয়ে থেকেই খেলার গতিপথ নির্ধারণ করতে পারেন। নিজেকে সময়ের সঙ্গে বদলে নেওয়ার এই ক্ষমতাই তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় রহস্য। ফুটবল-ইতিহাসে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় এসেছেন, যারা কয়েক মৌসুম আলো ছড়িয়ে হারিয়ে গেছেন। কিন্তু মেসি দুই দশকের বেশি সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে টিকে আছেন। এটি কেবল প্রতিভার ফল নয়, এটি পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, বুদ্ধিমত্তা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির যোগফল।

মেসির খেলার সবচেয়ে বড় দিক তার সরলতায়। তাকে দেখে মনে হয় তিনি খুব সহজ কিছু করছেন। অথচ সেই সহজতার আড়ালে রয়েছে অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রণ, ভারসাম্য, শরীরের নানা ভঙ্গি দিয়ে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার ক্ষমতা, বা পায়ের নিখুঁত ব্যবহার এবং সর্বোপরি অসাধারণ দূরদৃষ্টি। মেসি অনেক সময় বল পাওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। তিনি শুধু যেখানে বল আছে সেখানে তাকান না; তিনি দেখেন বলটি কোথায় পৌঁছাবে। অন্যরা যে জায়গাটি এখনও দেখতে পায়নি, মেসি সেটি কয়েক মুহূর্ত আগেই দেখতে পান। তাই তার একটি পাস অনেক সময় একটি গোলের চেয়েও সুন্দর হয়ে ওঠে। তার ড্রিবলিং কেবল পায়ের খেলা নয়; তিনি জানেন কখন কোন দিকে বাঁক নিলে প্রতিপক্ষ বিভ্রান্ত হবে, কখন কোন মুহূর্তে বল ছেড়ে দিলে সতীর্থের সামনে গোলের পথ খুলে যাবে। এই বুদ্ধিমত্তা, এই দূরদৃষ্টি, এই নিখুঁত এক্সিকিউশন, এসব মিলেই মেসি।

এই জায়গাতেই মেসির সঙ্গে পেলে, দিয়েগো ম্যারাডোনা, ইয়োহান ক্রুইফ, জর্জ বেস্ট, ডেভিড বেকহাম, জিনেদিন জিদান, রোনালদো নাজারিও কিংবা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর তুলনা চলে আসে। প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ যুগের অসাধারণ ফুটবলার। পেলে ছিলেন ফুটবলের প্রথম বৈশ্বিক মহাতারকাদের একজন এবং তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে নিজেকে ইতিহাসে অমর করেছেন। ম্যারাডোনা ছিলেন প্রতিভা, বিদ্রোহ ও ব্যক্তিগত সৃষ্টিশীলতার প্রতীক; ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ তার নেতৃত্বের চিরন্তন দলিল। ক্রুইফ ছিলেন শুধু একজন খেলোয়াড় নন, একটি ফুটবল-দর্শনের নির্মাতা। জর্জ বেস্ট ছিলেন স্বাভাবিক প্রতিভা ও ব্যক্তিত্বের বিস্ময়কর সমন্বয়। বেকহাম তার পাস, ক্রস ও ফ্রি-কিকের জন্য অনন্য। জিদান ছিলেন সৌন্দর্য, ভারসাম্য ও বড় ম্যাচের শিল্পী। রোনালদো নাজারিও ছিলেন গতি, শক্তি ও গোল করার অসাধারণ ক্ষমতার বিস্ফোরণ। আর ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং গোল করার ধারাবাহিকতাকে অন্য এক মাত্রায় নিয়ে গেছেন।

কিন্তু মেসির বিশেষত্ব হলো, তিনি তাদের কারও বিকল্প নন। তিনি তাদের কারও অনুকরণও নন। তিনি নিজেই একটি পৃথক অধ্যায়। তার মধ্যে ম্যারাডোনার মতো বল নিয়ে ছুটে যাওয়ার ক্ষমতা, ক্রুইফের মতো মাঠের জায়গা বোঝার বুদ্ধি, জিদানের মতো সৌন্দর্য এবং রোনালদোদের মতো মুহূর্তের বিস্ফোরণ দেখা যায়; কিন্তু এসব দিয়ে মেসিকে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ মেসি অন্য কারও সমষ্টি নন। মেসি নিজেই একটি স্বতন্ত্র ফুটবল-ভাষা। তিনি এমন এক ভাষায় কথা বলেন, যা কেবল তার খেলা দেখেই বোঝা যায়; অনুবাদ করা যায় না, বর্ণনা করা যায় না, কেবল অনুভব করা যায়।

তাঁকে সর্বকালের সেরা বলা হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকবেই। ফুটবল এমন একটি খেলা, যেখানে প্রজন্ম, যুগ, কৌশল ও ব্যক্তিগত পছন্দের পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু মেসির পক্ষে যুক্তিটি অসাধারণ শক্তিশালী। ব্যক্তিগত প্রতিভা, দলীয় সাফল্য, দীর্ঘস্থায়িত্ব, অসাধারণ পরিসংখ্যান, আন্তর্জাতিক সাফল্য, ধারাবাহিকতা, সৃষ্টিশীলতা এবং নেতৃত্ব সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করলে তার মতো সম্পূর্ণ ফুটবলার খুঁজে পাওয়া কঠিন। আটটি ব্যালন দ’অর, চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, ১০টি লা লিগা, দুটি কোপা আমেরিকা, একটি বিশ্বকাপ, অলিম্পিক স্বর্ণপদক এবং অসংখ্য রেকর্ড তার শ্রেষ্ঠত্বের পক্ষে শক্তিশালী দলিল। কিন্তু এসবের ওপরে যে সংখ্যাটি সবচেয়ে বেশি অর্থ বহন করে, সেটি হলো একুশ বছর। দীর্ঘ দুই দশক ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে নিজেকে প্রাসঙ্গিক ও প্রভাবশালী রাখা। এত বছরে ফুটবল-বিশ্ব অনেক বদলে গেছে; অনেক তারকা এসেছেন, অনেক তারকা হারিয়ে গেছেন; কিন্তু মেসি থেকেছেন সব সময়, সব মঞ্চে, সব প্রতিযোগিতায়। এটিই তার সবচেয়ে বড় বিজয়।

মেসির ব্যক্তিত্বও তার কিংবদন্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত মানুষদের একজন হয়েও তিনি অযথা প্রচার বা নাটকীয়তার পেছনে ছুটেননি। তিনি সাধারণত কম কথা বলেন। মাঠেই তার উত্তর। পরিবারকেন্দ্রিক জীবনযাপন এবং তুলনামূলকভাবে নিরিবিলি ব্যক্তিজীবন তাঁকে অনেক বিশ্বতারকাদের চেয়ে আলাদা করেছে। তিনি কখনো নিজেকে অন্য কারও ওপরে স্থাপন করেননি; কখনো নিজের প্রতিভার অহংকারে অন্যদের ছোট করেননি। শিশুদের জন্য তার মানবিক কাজও উল্লেখযোগ্য।

২০১০ সাল থেকে ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে তিনি শিশুদের স্বাস্থ্য, কল্যাণ ও অধিকার রক্ষায় কাজ করে আসছেন। নিজের ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি অসহায় শিশুদের চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। ফলে মেসি শুধু একজন ফুটবল-নক্ষত্র নন; তিনি বিশ্বের লাখো শিশুর কাছে অনুপ্রেরণারও একটি নাম। তিনি প্রমাণ করেছেন, মহান হওয়া মানে কেবল মাঠে মহান হওয়া নয়; মাঠের বাইরেও মানুষ হিসেবে মহান হওয়া।

তরুণ প্রজন্মের ওপর মেসির প্রভাব সম্ভবত তার গোলের সংখ্যার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হবে। পৃথিবীর অসংখ্য শিশু তার খেলা দেখে ফুটবল হাতে নেয়, তার বল নিয়ন্ত্রণ অনুকরণ করে, তার বাঁ পায়ের মতো করে বল মারতে চায়, তাঁর গোল উদ্‌যাপন অনুসরণ করে। কিন্তু মেসির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো তার বলের কারিকুরিতে নয়; তার জীবন ও ক্যারিয়ারে। তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিভা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শৃঙ্খলা আরও গুরুত্বপূর্ণ; গতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বুদ্ধিমত্তা দীর্ঘস্থায়ী; গোল করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সতীর্থকে দিয়ে গোল করানোও সমান সুন্দর; আর তারকা হওয়া গুরুত্বপূর্ণ নয়, দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠাই আসল।

তিনি দেখিয়েছেন, ব্যর্থতা শেষ নয়; ব্যর্থতার পর ঘুরে দাঁড়ানোই আসল সাহস। তিনি দেখিয়েছেন, সমালোচনা সহ্য করা যায়, যদি নিজের ওপরে বিশ্বাস থাকে। বাংলাদেশেও আর্জেন্টিনার জার্সি পরা অসংখ্য তরুণের কাছে মেসি শুধু একজন বিদেশি ফুটবলার নন, তিনি তাঁদের শৈশবের একটি স্মৃতি, একটি আবেগ এবং একটি স্বপ্ন। ঢাকার অলিগলিতে, গ্রামের মাঠে, স্কুলের টিফিন বিরতিতে, সব জায়গায় মেসির নাম উচ্চারিত হয়েছে একই শ্রদ্ধায়, একই ভালোবাসায়।

তাই একদিন যখন মেসি সত্যি সত্যিই আর মাঠে থাকবেন না, তখন তার অনুপস্থিতি শুধু একটি দলের জন্য নয়, একটি প্রজন্মের জন্যও অনুভূত হবে। আর কোনো বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ১০ নম্বর জার্সি পরে তিনি মাঠে নামবেন না। আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তার সেই পরিচিত স্থির মুখ দেখা যাবে না। আর কোনো মুহূর্তে তিনি হঠাৎ কয়েকজন প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাবেন না। আর কোনো ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে একই সঙ্গে বিস্ময় ও উচ্ছ্বাস মিশে উচ্চারিত হবে না মেসি… মেসি… মেসি… তখন হয়তো আমরা বুঝব, দুই দশক ধরে একজন ফুটবলারকে আমরা কতটা স্বাভাবিকভাবে পেয়ে গিয়েছিলাম। তার উপস্থিতি এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল যে আমরা ভুলে গিয়েছিলাম এমন প্রতিভা ইতিহাসে বিরল, এমন খেলোয়াড় এক প্রজন্মে একবারই আসেন।

আসলে এমন একজন ফুটবলারকে পাওয়া কখনোই স্বাভাবিক ছিল না। এমন একজন খেলোয়াড় এক প্রজন্মে একবার আসেন কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। হয়তো কয়েক প্রজন্ম অপেক্ষা করতে হয়। তাই মেসির বিদায় শুধু একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয়; এটি একটি ফুটবল-যুগের অবসান। যে যুগে আমরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করেছি তার খেলা দেখার জন্য, যে যুগে তার একটি গোল কোটি মানুষের আলোচনার বিষয় হয়েছে, যে যুগে শিশুরা তার নাম লেখা জার্সি পরে মাঠে নেমেছে, সেই যুগ এখন ধীরে ধীরে ইতিহাসে পরিণত হচ্ছে। আমরা যারা এই যুগে বেঁচে আছি, তারা সৌভাগ্যবান; কারণ আমরা ইতিহাসের অংশ হতে পেরেছি, আমরা মেসিকে খেলতে দেখেছি।

৬ অক্টোবর ২০২৬-এর মনুমেন্টালের রাত তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ ছিল না। এটি ছিল একটি জাতির পক্ষ থেকে তার সবচেয়ে প্রিয় ফুটবলারকে বলা ধন্যবাদ, লিও। ধন্যবাদ আমাদের আনন্দ দেওয়ার জন্য। ধন্যবাদ আমাদের কাঁদার কারণ হওয়ার জন্য। ধন্যবাদ আমাদের স্বপ্ন দেখানোর জন্য। ধন্যবাদ পরাজয়ের পরও ফিরে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেওয়ার জন্য। ধন্যবাদ আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার জন্য। আর সবচেয়ে বেশি, ধন্যবাদ আমাদের সময়ে জন্ম নেওয়ার জন্য।

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মেসির গোল দেখবে পুরোনো দৃশ্যপটে, তার বিশ্বকাপ দেখবে প্রামাণ্যচিত্রে, তার রেকর্ড পড়বে ইতিহাসের পাতায় এবং তার অসাধারণ মুহূর্তগুলো দেখবে সংরক্ষিত ভিডিওতে। কিন্তু আমরা যারা তাঁকে আমাদের চোখের সামনে খেলতে দেখেছি, তারা জানি, মেসিকে দেখা শুধু ফুটবল দেখা ছিল না; মেসিকে দেখা ছিল ফুটবলের এক অসাধারণ যুগকে চোখের সামনে ঘটতে দেখা। আমরা জানি, পর্দায় মেসিকে দেখা আর মাঠে মেসিকে দেখা, এই দুইয়ের মধ্যে যে ব্যবধান, তা কোনো ভিডিও কখনো পূরণ করতে পারবে না। কারণ মেসির খেলা ছিল এক জীবন্ত শিল্প, যা কেবল সেই মুহূর্তে, সেই মুহূর্তের বাতাসে, সেই মুহূর্তের গর্জনে অনুভব করা যায়।

আজ আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার আন্তর্জাতিক অধ্যায় শেষ হয়েছে। কিন্তু মেসি শেষ হননি। তিনি এখন আর শুধু একজন ফুটবলার নন। তিনি একটি স্মৃতি, একটি আবেগ, একটি প্রজন্মের পরিচয়, একটি ফুটবল-দর্শন এবং একটি দেশের ভালোবাসার নাম। তার পায়ের ছোঁয়া হয়তো আর মনুমেন্টালের সবুজ ঘাসে দেখা যাবে না, কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে তার পদচিহ্ন কখনো মুছে যাবে না। তিনি যুগে যুগে নতুন ফুটবলারদের কাছে হয়ে থাকবেন সেই আলো, যার দিকে তাকিয়ে তারা স্বপ্ন দেখবে, একদিন তারাও মেসির মতো ফুটবলকে ভালোবাসতে শিখবে, মেসির মতো পরাজিত হয়েও ঘুরে দাঁড়াতে শিখবে, আর মেসির মতো ফুটবলকে সুন্দর করে তুলতে শিখবে।

লিওনেল আন্দ্রেস মেসি, চিরন্তন ১০ নম্বর, চিরন্তন অধিনায়ক, চিরন্তন ফুটবলার। ধন্যবাদ, লিও। ফুটবলকে সুন্দর করে তোলার জন্য ধন্যবাদ।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিষয়:চিরন্তন মেসি ফুটবল মেসি লিওনেল আন্দ্রেস মেসি লিওনেল মেসি

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…