মতামত

শিক্ষক দিবস ও কয়েকটি প্রশ্ন

শিক্ষক দিবস ও কয়েকটি প্রশ্ন

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। প্রতি বছরের মতো এবারও নানা আয়োজনে শিক্ষকের মর্যাদা, অবদান ও জাতি গঠনে তাদের ভূমিকার কথা বলা হবে। সভা হবে, সেমিনার হবে, ফুল দেওয়া হবে, বক্তৃতা হবে। বলা হবে: ‘শিক্ষকরাই জাতির মেরুদণ্ড’, ‘শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর’, ‘শিক্ষকের মর্যাদা সবার ওপরে।’ কথাগুলো শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু অনুষ্ঠানের আলো নিভে গেলে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ালে প্রশ্ন জাগে সত্যিই কি আমরা শিক্ষককে সম্মান করি?

একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক অবসর নিয়েছেন। জীবনের দীর্ঘ সময় শিশুদের পড়িয়েছেন। অবসরের পর তার প্রাপ্য পাওনা বুঝে নিতে তাকে বসে থাকতে হয় থানা শিক্ষা কর্মকর্তার দপ্তরে। তার কাগজপত্র এগিয়ে যায় না। কারণ, সংশ্লিষ্ট কেরানির কাছে ‘স্পিড মানি’ দিতে হবে। শুধু টাকা দিলেই হবে না, তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধনও করতে হবে। এ কেমন রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে একজন শিক্ষক তার জীবনের শেষ কর্মফলটুকু পেতে গিয়ে একজন কেরানির সামনে নিজের মর্যাদা বিসর্জন দিতে বাধ্য হন?

ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। একজন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলিজনিত কাজে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে গেছেন। একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাকে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বসিয়ে রেখেছেন। তার অপরাধ তিনি কর্মকর্তাকে ‘স্যার’বলে সম্বোধন করেননি। অর্থাৎ একজন শিক্ষক, যিনি শ্রেণিকক্ষে শিশু-কিশোরদের জ্ঞান, মূল্যবোধ ও বিবেকের শিক্ষা দেন, তাকে নিজের কাজ করাতে গিয়ে আবার শিখতে হচ্ছে কাকে ‘স্যার’ বলতে হবে!

এখানেই শেষ নয়। জেলা পর্যায়ে সরকারি কর্মসূচির সভায় একজন সরকারি কলেজের অধ্যাপক উপস্থিত আছেন। প্রাতিষ্ঠানিক পদমর্যাদার নানা হিসাব-নিকাশ থাকলেও সভার বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জেলা প্রশাসক সভার প্রধান, তিনিই উদ্বোধন করেন, তিনিই মূল বক্তা। অধ্যাপক সেখানে উপস্থিত থাকার অনুমতিটুকু পান। জ্ঞান, গবেষণা, অভিজ্ঞতা, পদমর্যাদ কিংবা শিক্ষাক্ষেত্রে তার অবদান যেন প্রশাসনিক কর্তৃত্বের কাছে গৌণ।

আর মন্ত্রণালয়ের একটি সভার কথা ভাবুন। একজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তিনি আমন্ত্রণ গ্রহণ করে সভায় উপস্থিত হয়েছেন। কিন্তু সভার টেবিলে তার জন্য জায়গা নেই। মন্ত্রী, সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিবদের বসার পর প্রথম সারির চেয়ার শেষ। অধ্যাপককে বসতে হয়েছে দ্বিতীয় সারিতে যেখানে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মী, ক্যামেরাম্যান কিংবা অফিস সহকারীও বসেছেন।

এখানে প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তিকে ছোট করা নয়। প্রশ্নটি রাষ্ট্রের জ্ঞান ও জ্ঞানচর্চার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। যে রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে আমন্ত্রণ জানিয়ে সভায় তার জন্য যথাযথ আসন নিশ্চিত করা হয় না, সে রাষ্ট্রে আমরা কীভাবে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখি? বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই ফুল, ব্যানার আর বক্তৃতার আগে আমাদের নিজেদের দিকে তাকানো দরকার।

বাংলাদেশে শিক্ষক মূলত দুই ধরনের সরকারি ও বেসরকারি। সরকারি শিক্ষক রাষ্ট্রের কর্মচারী। কিন্তু প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে তারা কোথায়? তাদের মর্যাদা কি সত্যিই জ্ঞানদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, নাকি তারা কেবল সরকারি চাকরির আরেকটি শ্রেণি? অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষকরা আরও অনিশ্চিত বাস্তবতার মধ্যে থাকেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাবানদের ইচ্ছার ওপর অনেক সময় তাদের পেশাগত স্বাধীনতা নির্ভর করে। কোথাও কোথাও শিক্ষককে শিক্ষক নয়, ব্যক্তিগত কর্মচারীর মতো ব্যবহার করার অভিযোগও শোনা যায়।

প্রশ্ন হলো একজন শিক্ষক কতটা বাধ্য হলে এমন আচরণ মেনে নেন? যে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের আত্মমর্যাদা শেখাবেন, তিনি যদি নিজের কর্মস্থলেই আত্মমর্যাদা রক্ষার সুযোগ না পান, তাহলে তিনি কী শিক্ষা দেবেন? আমাদের আরও একটি কঠিন প্রশ্ন করা দরকার কত শতাংশ মানুষ সত্যিকার অর্থে শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন? কতজন শিক্ষক এই পেশাকে জীবনের আদর্শ হিসেবে বেছে নিয়েছেন? কতজন নিজেকে শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলেছেন? কতজন প্রতিদিন নতুন কিছু শেখেন, পড়েন, গবেষণা করেন, শিক্ষার্থীদের বোঝার চেষ্টা করেন? আবার কতজন কেবল জীবিকার প্রয়োজনে শিক্ষক হয়েছেন? কতজন চাকরিটিকে নিছক একটি নিরাপদ পেশা হিসেবে নিয়েছেন? আর কতজন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আত্মমর্যাদা, নৈতিকতা ও সততার সঙ্গে আপস করে স্রোতে গা ভাসিয়েছেন? প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর। কিন্তু শিক্ষা নিয়ে সত্যিকারের কথা বলতে হলে এগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

কারণ একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না। তার আচরণও একটি পাঠ। তার সততা একটি পাঠ। তার মানবিকতা একটি পাঠ। শিক্ষার্থীর প্রতি তার সম্মান একটি পাঠ। আবার তার উদাসীনতা, অবহেলা কিংবা অনৈতিক আচরণও শিক্ষার্থীর কাছে এক ধরনের শিক্ষা। অন্যদিকে একজন অযত্নশীল শিক্ষকের হাতে কত শিশু ধীরে ধীরে স্কুল থেকে দূরে সরে যায়, ঝরে পড়ে, হারিয়ে যায় তার হিসাব আমরা রাখি না। আবার কোনো কোনো শিক্ষক একটি শিশুর চোখের সম্ভাবনা চিনতে পারেন। তাকে একটু উৎসাহ দেন, একটু সময় দেন, একটু বিশ্বাস করেন। সেই শিশুই হয়তো একদিন নিজের জীবন বদলায়, পরিবার বদলায়, সমাজ বদলায়।

এই দুই ধরনের শিক্ষকের পার্থক্য কেবল ব্যক্তিগত নয়। এর সঙ্গে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।

রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে: শিক্ষকের মর্যাদা কোথায়? প্রশাসনকে ভাবতে হবে: একজন শিক্ষককে কি ফাইলের পেছনে ছুটতে হবে? ঘুষ দিয়ে নিজের পাওনা আদায় করতে হবে? ‘স্যার’ না বললে কি তার কাজ আটকে থাকবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাকে সভার দ্বিতীয় সারিতে বসিয়ে আমরা আসলে কাকে ছোট করছি? আর শিক্ষকদেরও নিজেদের কাছে প্রশ্ন করতে হবে আমরা কি সত্যিই শিক্ষক?

শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়। এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য শিক্ষককে আগে মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে হবে। মর্যাদা নিয়ে বাচার মতো সম্মানী নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক অস্বচ্ছলতায় শিক্ষককে নিমজ্বিত রেখে তার কাছ থেকে ভালো কিছু প্রত্যাশা করা কি অযৌক্তিক নয়!

শিক্ষকদের মানবেতর জীবনযাপনের প্রশ্নটিও আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক সীমিত বেতন, অনিশ্চিত চাকরি, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ব্যয় এবং নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেন। মাসের শেষ দিকে একজন শিক্ষককে নিজের সংসারের প্রয়োজন আর সন্তানের ভবিষ্যতের মধ্যে হিসাব কষতে হয়। কেউ কেউ অতিরিক্ত আয়ের জন্য কোচিং, প্রাইভেট টিউশন কিংবা অন্য কাজের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। অথচ শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে তাকেই শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে শেখাতে হয়। একজন মানুষ যখন নিজের জীবনযাপন নিয়েই অনিশ্চয়তায় থাকেন, তখন তার কাছ থেকে সমাজ কীভাবে সর্বোচ্চ নিষ্ঠা, সৃজনশীলতা ও আত্মনিবেদন আশা করে? শিক্ষকের আর্থিক নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়; এটি একটি মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক শর্ত।

যে সমাজ তার শিক্ষককে সম্মান করে না, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত জ্ঞানকেও সম্মান করে না। আর যে রাষ্ট্র জ্ঞানকে সম্মান করে না, তার উন্নয়ন যতই চকচকে হোক, ভিতরে ভিতরে সে দুর্বলই থেকে যায়। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই আমাদের সবচেয়ে জরুরি কাজ ফুল দেওয়া নয়; শিক্ষকের সামনে মাথা নত করার মতো একটি সমাজ তৈরি করা। কারণ শিক্ষককে সম্মান করা মানে শুধু একজন মানুষকে সম্মান করা নয় নিজেদের ভবিষ্যৎকে সম্মান করা।

 

বিষয়:আত্মমর্যাদা শিক্ষক দিবস সমাজ

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…