অপরাধ

তাহসিফের মৃত্যু: বন্ধু দ্বীপ পিবিআইয়ের হেফাজতে

তাহসিফের মৃত্যু: বন্ধু দ্বীপ পিবিআইয়ের হেফাজতে

কে এম তাহসিফ সাউরি। ছবি: সংগৃহীত

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তার জুনিয়র বন্ধু দ্বীপকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদস্যরা। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন দ্বীপ।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ওই কর্মকর্তা জানান, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দ্বীপকে পিবিআইয়ের সদস্যরা নিয়ে গেছেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তার জানা নেই।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসার তৃতীয় তলা থেকে দ্বীপকে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দীপ ওই এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজার ছেলে।

তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগের সময়ের সিসিটিভি ফুটেজে এক ব্যক্তির সঙ্গে তাকে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে দ্বীপ হিসেবে শনাক্ত করেন। ফুটেজে দেখা যায়, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে তাহসিফের সঙ্গে ওই ব্যক্তির দেখা হয়। পরে তারা হাত মেলান এবং আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে সেখান থেকে চলে যান।

তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য উদ্‌ঘাটনে নৌ পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরখান থানা, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কাজ করছে।

উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বৃহস্পতিবার রাতে বলেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। তাহসিফের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। দাফন শেষ করে পরিবারের সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থানায় আসবেন বলে তিনি ধারণা করছেন।

তাহসিফের মোটরসাইকেল না পাওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটা নদীতে আছে নাকি কেউ নিয়ে গেছে বিষয়টি নৌ পুলিশ তদন্ত করে দেখবে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার রেজাউল করিমের ধারণা, এটি হত্যাকাণ্ড। ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে তাহসিফকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

তিনি বলেন, ‘এ ঘটনার ব্যাপারে আমরাও খোঁজ নিচ্ছি, নৌ পুলিশকে সহায়তা করছি।’

নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘মামলা না হলেও এ ঘটনা তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করেছি। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা অগ্রসর হচ্ছি।’

নিখোঁজ হওয়ার আগে ছয় ঘণ্টা একসঙ্গে ছিলেন তাহসিফ-দ্বীপ

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তদন্তকারী দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ইতোমধ্যেই তাহসিফদের উত্তরা আবাসিক এলাকার বাসা এবং আশপাশের সড়কের ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরাগুলোর ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ শুরু করেছেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে-মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সবুজ রঙের পাঞ্জাবি পরা তাহসিফ বাসা থেকে নেমে নিচে আসেন। নিচতলায় নামার পর তাকে অপর এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে এবং হাত মেলাতে দেখা যায়। ওই সময় সেখানে একটি নীল রঙের মোটরসাইকেল চালু অবস্থায় বা সেটির হেডলাইট জ্বালানো অবস্থায় দাঁড়ানো ছিল। ওই ব্যক্তির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথাবার্তার পর দুজনকে ওই স্থান থেকে একসঙ্গে পৃথক দুটি মোটরসাইকেলে করে নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে রওয়ানা হতে দেখা যায়। ফুটেজে জুনিয়র বন্ধু দ্বীপের উপস্থিতি এবং তাদের উভয়ের গন্তব্য কোনদিকে ছিল, তা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

এসআরবির লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে এসআরবি ইতিমধ্যে মাঠে নেমেছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের টিম মাঠে কাজ করছে আমরা চেষ্টা করছি প্রকৃত ঘটনা বের করতে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা-ডিবির প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, তদন্তকারী সংস্থা নৌ পুলিশকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে ডিবি প্রস্তুত রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘নৌ পুলিশ তদন্তকারী সংস্থা হলেও আমরা খোঁজ নিচ্ছি।’

বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড ধরে নিয়েই তদন্ত শুরু করেছেন তারা। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, মোটরসাইকেল উদ্ধারের চেষ্টা, মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ এবং কারও সঙ্গে বিরোধ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা হচ্ছে।

তারা জানান, মোটরসাইকেল উদ্ধারে ঘটনাস্থলের আশপাশের নদীতে তল্লাশি চালানো হতে পারে।

বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রুয়াপ কেন্দ্রীয় মসজিদে তাহসিফের জানাজা সম্পন্ন হয়। এর আগে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে নিয়ে আসা হয়। লাশবাহী গাড়ি এলাকায় পৌঁছলে স্বজন ও প্রতিবেশীরা ভিড় করেন। এ সময় স্বজনদের কান্নায় এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। জানাজা শেষে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।

টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন জানিয়েছেন, বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ। পরে পরিবারকে জানানো হয়।

নৌ পুলিশের তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময় জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর দেওয়া হয়। টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। তাহসিফের পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো জামা। হাতে ঘড়ি এবং পকেটে ছিল আইফোন। ফোনের সূত্র ধরেই শনাক্ত হয় তার পরিচয়।

পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ময়নাতদন্তের জন্য তাহসিফের মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

সেখানকার ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাশাত জাবীন বলেন, “তাহসিফের পাকস্থলী, লিভার, কিডনি ও রক্ত পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে প্রতিবেদন পাওয়া গেলে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। তখন মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বলা যাবে।”

বিষয়:কে এম তাহসিফ সাউরি পিবিআই বন্ধু দ্বীপ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…