তাবাসসুম ফাতিমা হাশমি থেকে টাবু হওয়ার যাত্রা

ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রতিভাবান অভিনেত্রী টাবু। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। কখনো সংবেদনশীল নারী, কখনো জটিল মানসিকতার চরিত্র, আবার কখনো কমেডি কিংবা থ্রিলারের গুরুত্বপূর্ণ মুখ-বিভিন্ন ঘরানায় তার অভিনয় মুগ্ধ করেছে দর্শক ও সমালোচকদের। ৪ নভেম্বর ৫৫ বছরে পা রাখলেন এই অভিনেত্রী।
১৯৭১ সালের ৪ নভেম্বর হায়দরাবাদে জন্মগ্রহণ করেন তাবাসসুম ফাতিমা হাশমি, যিনি টাবু নামেই পরিচিত। শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় শুরু করা টাবু হিন্দি, তেলুগু, তামিল, মালয়ালম, মারাঠি, বাংলা ও ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং সেরা অভিনেত্রী বিভাগে ফিল্মফেয়ার ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ডের একাধিক সম্মাননা। ২০১১ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।
দ্য স্টেটসম্যানের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে টাবুর অভিনয়জীবনের সেরা আটটি সিনেমা ও চরিত্রের কথা, যেগুলো তার অভিনয়প্রতিভার বৈচিত্র্য তুলে ধরে।
‘মাচিস’ (১৯৯৬): বীরন
গুলজারের পরিচালনায় ‘মাচিস’ টাবুর অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা। ১৯৮০-এর দশকে পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছবিটিতে বীরন চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। সংযত অথচ আবেগপূর্ণ অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শক ও সমালোচকদের নজর কাড়েন টাবু। এই সিনেমার জন্য প্রথমবার সেরা অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।
‘বিরাসত’ (১৯৯৭): গেহনা
প্রিয়দর্শন পরিচালিত ‘বিরাসত’ একটি গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের সিনেমা। তামিল ছবি ‘থেভার মাগান’-এর পুনর্নির্মাণ এতে অনিল কাপুর ও অমরিশ পুরির সঙ্গে অভিনয় করেন টাবু। গেহনা চরিত্রে তাকে দেখা যায় একজন বুদ্ধিমতী ও আত্মবিশ্বাসী গ্রামীণ নারী হিসেবে। পুরুষপ্রধান পরিবেশেও নিজের অবস্থান ধরে রাখার মধ্য দিয়ে চরিত্রটি দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়। সিনেমাটির জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান টাবু।
‘অস্তিত্ব’ (২০০০): অদিতি
মহেশ মাঞ্জরেকর পরিচালিত ‘অস্তিত্ব’ দাম্পত্য সম্পর্ক, নারীর স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন নিয়ে নির্মিত। এতে অদিতি চরিত্রে অভিনয় করেন টাবু। অতীতের একটি সম্পর্কের কথা জানার পর তার স্বামীর আচরণ বদলে যায়। নীরবতা ও অভিব্যক্তির মাধ্যমে চরিত্রটির মানসিক টানাপোড়েন ফুটিয়ে তোলেন অভিনেত্রী। সমালোচকদের কাছে এটি তার অন্যতম সেরা অভিনয় হিসেবে বিবেচিত।
‘চাঁদনি বার’ (২০০১): মুমতাজ
মধুর ভান্ডারকর পরিচালিত ‘চাঁদনি বার’ টাবুর ক্যারিয়ারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সিনেমা। এতে মুমতাজ চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে মুমতাজ মুম্বাইয়ের একটি ডান্স বারে কাজ করতে বাধ্য হন। একজন ভীতসন্ত্রস্ত তরুণী থেকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া নারীতে তার রূপান্তর দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে। এই সিনেমার জন্য দ্বিতীয়বার সেরা অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান টাবু।
‘দ্য নেমসেক’ (২০০৬): আশিমা গাঙ্গুলি
মীরা নায়ার পরিচালিত ‘দ্য নেমসেক’ ঝুম্পা লাহিড়ীর একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। কলকাতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো একটি বাঙালি পরিবারের গল্প এতে তুলে ধরা হয়েছে। আশিমা গাঙ্গুলি চরিত্রে অভিনয় করেন টাবু। নতুন দেশে একাকিত্ব ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে নিজের জীবন গড়ে তোলা এবং সন্তানদের বড় করার সংগ্রাম ফুটিয়ে তোলেন তিনি। সিনেমাটিতে তার স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করেন প্রয়াত ইরফান খান। তাদের পর্দার রসায়ন বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
‘চিনি কম’ (২০০৭): নীনা
গম্ভীর ও আবেগনির্ভর চরিত্রের পাশাপাশি রোমান্টিক কমেডিতেও টাবুর দক্ষতার প্রমাণ ‘চিনি কম’। আর বালকি পরিচালিত সিনেমাটিতে অমিতাভ বচ্চনের বিপরীতে নীনা চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। বয়সের বড় ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও দুজনের প্রেমের গল্প দর্শকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন তারা। নীনা চরিত্রে টাবুর আত্মবিশ্বাস, রসবোধ ও সাবলীল অভিনয় সিনেমাটিকে বিশেষ মাত্রা দেয়। এতে নীনার বাবার চরিত্রে অভিনয় করেন পরেশ রাওয়াল।
‘হায়দার’ (২০১৪): গজলা
বিশাল ভরদ্বাজ পরিচালিত ‘হায়দার’ উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট’ অবলম্বনে নির্মিত। ১৯৯৫ সালের কাশ্মীরের প্রেক্ষাপটে নির্মিত সিনেমাটিতে শাহিদ কাপুর অভিনয় করেন নামভূমিকায়। টাবু অভিনয় করেন হায়দারের মা গজলার চরিত্রে। ভালোবাসা, হারানোর বেদনা ও ভেঙে পড়া পরিবারের জটিলতার মধ্যে আটকে থাকা একজন নারীর চরিত্রে তার বহুমাত্রিক অভিনয় সিনেমাটিকে স্মরণীয় করে তোলে। এই সিনেমার জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান তিনি।
‘আন্ধাধুন’ (২০১৮): সিমি
শ্রীরাম রাঘবন পরিচালিত ‘আন্ধাধুন’ একটি ব্ল্যাক কমেডি থ্রিলার। এতে আয়ুষ্মান খুরানা অভিনয় করেন এমন এক পিয়ানোবাদকের চরিত্রে, যিনি অন্ধ সেজে থাকেন। নানা অপ্রত্যাশিত ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে তার জীবন। টাবু অভিনয় করেন সিমি চরিত্রে, যিনি একজন চলচ্চিত্র তারকার আকর্ষণীয় কিন্তু ষড়যন্ত্রকারী স্ত্রী। কখনো মিষ্টি, কখনো ভয়ংকর—চরিত্রটির দুই বিপরীত দিকই অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলেন তিনি। সিনেমাটি সেরা হিন্দি চলচ্চিত্র বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করে।
আরও কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ
টাবুর অভিনয়জীবনের স্মরণীয় সিনেমার তালিকা এই আটটিতে সীমাবদ্ধ নয়। ‘বিজয়পথ’ (১৯৯৪), ‘লাইফ অব পাই’ (২০১২), ‘দৃশ্যম’ (২০১৫), ‘দৃশ্যম ২’ (২০২২), ‘ক্রু’ (২০২৪) এবং ‘ডিউন: প্রফেসি’ (২০২৪)-তেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গেছে তাকে।
‘বিজয়পথ’-এ অজয় দেবগনের বিপরীতে অভিনয় করে সেরা নবাগত অভিনেত্রী বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান টাবু। অ্যাং লি পরিচালিত অস্কারজয়ী ‘লাইফ অব পাই’-তে অভিনয় করেন গীতা প্যাটেলের চরিত্রে। ‘দৃশ্যম’ ও ‘দৃশ্যম ২’-তে আইজি মীরা দেশমুখ হিসেবে অজয় দেবগনের চরিত্রের সঙ্গে তার বুদ্ধির লড়াই দর্শকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ‘ক্রু’-তে কারিনা কাপুর ও কৃতি শ্যাননের সঙ্গে অভিনয় করেন তিনি। আন্তর্জাতিক টেলিভিশন সিরিজ ‘ডিউন: প্রফেসি’-তে সিস্টার ফ্রান্সেসকার চরিত্রেও দেখা গেছে তাকে।
টাবুর অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি প্রধান চরিত্র কিংবা পার্শ্বচরিত্র-দুই ক্ষেত্রেই দর্শকের মনে ছাপ ফেলতে পারেন। নাটক, কমেডি, থ্রিলার কিংবা শেক্সপিয়ারের নাটক অবলম্বনে নির্মিত সিনেমা-বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে সমান স্বচ্ছন্দ তিনি। নীরবতা, অভিব্যক্তি ও সংলাপের সংযত ব্যবহারে চরিত্রের গভীরতা প্রকাশ করতে পারাই তার অভিনয়ের বিশেষ শক্তি। দ্য স্টেটসম্যান






