ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রথম অনারারি ফেলোশিপ পেলেন প্রফেসর পিটার সিঙ্গার

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি অস্ট্রেলীয় দার্শনিক প্রফেসর পিটার সিঙ্গারকে অনারারি ফেলোশিপ প্রদান করেছে। নৈতিকতা, পরোপকার ও প্রাণী অধিকার নিয়ে আলোচনায় বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এই অস্ট্রেলীয় দার্শনিক।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির মেরুল বাড্ডা ক্যাম্পাসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তার হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারপারসন তামারা হাসান আবেদ এবং ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার।
অনারারি ফেলোশিপ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সম্মাননা। ব্র্যাক ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রফেসর সিঙ্গারকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রফেসর সিঙ্গারের অবদানের কথা তুলে ধরে সম্মাননাপত্র পাঠ করেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার। তিনি এতে নৈতিক দর্শন, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে প্রফেসর সিঙ্গারের অবদান তুলে ধরেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ১৯৭২ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধ ফেমিন, এফ্লুয়েন্স অ্যান্ড মোরালিটি, ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত বই এনিমেল লিবারেশন এবং “দ্য লাইফ ইউ ক্যান সেভ” প্রতিষ্ঠা ও এর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন। তিনি ৫০টিরও বেশি বই লিখেছেন।
প্রফেসর আনোয়ার বলেন, স্যার ফজলে হাসান আবেদের ভাবনার সঙ্গে প্রফেসর সিঙ্গারের কাজের মিল রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই সম্মাননা শিক্ষা ও গবেষণায় উৎকর্ষ অর্জন এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাব তৈরিতে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
অনুষ্ঠানে তামারা হাসান আবেদ বলেন, “আপনার কাজ আমাদের মনে একটি সহজ প্রশ্ন তুলে ধরে। সেটি হলো যে, আমাদের যদি অন্যকে সাহায্য করার সামর্থ্য থাকে, তখন আমাদের কী করা উচিত? কারণ এই প্রশ্নটি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির জন্যও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি বলেন, আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার মাধ্যমে পাওয়া সুযোগগুলো কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে ভাবুক। তারা যেন নিজেদের কাজের মাধ্যমে অন্য মানুষের উপকার করার কথাও চিন্তা করে। প্রফেসর সিঙ্গারের ৮০তম জন্মবার্ষিকীর বছরে তাকে স্বাগত জানিয়ে তামারা হাসান আবেদ বলেন, “আপনাকে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে আমাদেরই একজন হিসেবে স্বাগত জানাতে পেরে আমরা অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি।”
সম্মাননা গ্রহণ করার প্রতিক্রিয়ায় প্রফেসর সিঙ্গার বলেন, স্যার ফজলে হাসান আবেদের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই স্বীকৃতি পাওয়া তার কাছে বিশেষ কিছু।

তিনি আরও বলেন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে সবাই সত্য ও জ্ঞানের সন্ধান করেন। এখানে স্বাধীনভাবে চিন্তা করা, প্রশ্ন করা ও নিজের মত প্রকাশের সুযোগ রয়েছে।
ফেলোশিপ প্রদান অনুষ্ঠানের আগে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহর সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন প্রফেসর সিঙ্গার। আলোচনায় আসিফ সালেহ ১৯৭১ সালের নভেম্বরের কথা তুলে ধরেন। সে সময় সিঙ্গার অক্সফোর্ডে একজন তরুণ দার্শনিক ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং লাখ লাখ শরণার্থীর ভারতে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা দেখছিলেন। আসিফ সালেহ বলেন, ওই পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় তিনি ফেমিন, এফ্লুয়েন্স অ্যান্ড মোরালিটি প্রবন্ধটি লেখেন।
আসিফ সালেহ আরও বলেন, ১৯৭২ সালে প্রকাশিত এই প্রবন্ধের মধ্য ধনী দেশগুলোর মানুষের দরিদ্র মানুষের প্রতি কী দায়িত্ব রয়েছে, তা নিয়ে সিঙ্গারের পাঁচ দশকের কাজ শুরু হয়।
প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফরে এসে প্রফেসর সিঙ্গার বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশকে একটি প্রাণবন্ত দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন এখানে অনেক কাজ হচ্ছে। বাংলাদেশের অগ্রগতিকে তিনি “অনুপ্রেরণার গল্প” বলেও অভিহিত করেন। এই সফরে তিনি ব্র্যাকের অতিদরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে পরিচালিত আল্ট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন কর্মসূচি ঘুরে দেখেন।
ইফেক্টিভ অলট্রুজম সম্পর্কে প্রফেসর সিঙ্গার বলেন, এই আন্দোলনের লক্ষ্য হলো মানুষ যেন অন্যের উপকার করাকে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এবং সেই কাজ কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
এ প্রসঙ্গে তিনি ব্র্যাকের আল্ট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন কর্মসূচির উদাহরণ দেন। কর্মসূচিটি প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো ও মূল্যায়ন করা হয়। কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়ার পর কর্মসূচিটি সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি দেশেও এই কর্মসূচি চালু হয়েছে।
ব্যবসার মুনাফাকে জনকল্যাণে ব্যবহারের বিষয়ে প্রফেসর সিঙ্গার বলেন, পুঁজিবাদকে সংস্কার করা সম্ভব। এজন্য তিনি সম্প্রতি প্রফিট ফর গুড নামে একটি উদ্যোগ গঠনে সহায়তা করেছেন। এর উদ্দেশ্য হলো, ব্যবসায়ীরা যেন তাদের মুনাফার একটি অংশ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করেন।
তিনি বলেন, “আমরা কোম্পানিগুলোকে তাদের মুনাফার অন্তত ১০ শতাংশ ভালো কাজে দান করার অঙ্গীকার করতে উৎসাহিত করছি। একই সঙ্গে ভোক্তাদেরও এসব কোম্পানির দিকে নজর দিতে বলছি।”
পিটার সিঙ্গার জানান, ইতিহাসবিদ রুটগার ব্রেগম্যান প্রতিষ্ঠিত নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংগঠন স্কুল অফ মোরাল এমবিশন এর সঙ্গে যৌথভাবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্ক সিটিতেও বর্তমানে সংগঠনটির একটি কার্যালয় রয়েছে। স্কুল অফ মোরাল এমবিশন এমন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়, যারা নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও কাজের লক্ষ্য নতুনভাবে নির্ধারণ করতে চান।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, “মানুষের লক্ষ্য যেন শুধু নিজের স্বার্থে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা যেন আরও নৈতিক পথে পরিচালিত হয়।”
দুই বছর আগে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়ার কথা জানিয়ে পিটার সিঙ্গার বলেন, এখন তিনি লেখালেখিতে কম সময় দিয়ে যেসব কাজে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করা সম্ভব, সেগুলোতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চান।

লিভস ওয়েল লিভড নামের একটি পডকাস্ট পরিচালনা করেন পিটার সিঙ্গার। সেখানে সাম্প্রতিক কয়েকজন অতিথির কথা উল্লেখ করে তিনি পরোপকারের উদাহরণ দেন। তাদের প্রত্যেকেই অপরিচিত একজন ব্যক্তিকে কিডনি দান করেছিলেন।
তিনি বলেন, “তারা জানতেন, একটি কিডনি নিয়েও ভালোভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব এবং একটি কিডনি নিয়ে থাকার ঝুঁকিও খুব কম। তাই তারা অপরিচিত একজন মানুষকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন।”
আলোচনায় আসিফ সালেহ বাংলাদেশের মতো দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চান। এআই নিয়ে বাস্তব কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে তিনি জানান।
এআইয়ের সুবিধা সম্পর্কে তিনি বলেন, “বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষ, শুধু ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই, স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের পরামর্শ পেতে পারেন।”
তবে তিনি বলেন, এআইয়ের কারণে অনেক মানুষের কাজ ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। শ্রমিকদের আয় যেন কমে গিয়ে সেই অর্থ ধনী দেশগুলোর প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোরn হাতে চলে না যায়, তা ঠেকাতে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
এ সমস্যা মোকাবিলায় তিনি একটি সম্ভাব্য উপায় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যেসব কোম্পানির প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে মানুষ কাজ হারান, সেসব কোম্পানিকে শ্রমিকদের ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম ব্যবস্থায় অর্থ দিতে বাধ্য করা যেতে পারে।
তবে কাজ মানুষের জীবনে শুধু আয়ই নিশ্চিত করে না, এটি মানুষকে ব্যস্ত রাখে এবং জীবনে উদ্দেশ্যও দেয়। তাই যেসব কাজ যন্ত্র দিয়ে করা সম্ভব নয়, সেগুলোর গুরুত্ব সমাজের ধরে রাখা উচিত বলে মনে করেন প্রফেসর সিঙ্গার।
আড়ংয়ের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, কাপড়ে হ্যান্ড প্রিন্টিং ও অ্যামব্রয়ডারি করার কাজ এখনো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। তিনি বলেন, “কাপড়ে হাতে ছাপ দেওয়া এবং হাতে সূচিকর্ম করার মধ্যে আলাদা এবং বিশেষ একটা যত্ন রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, যেসব কাজে যন্ত্র ভালো, সেসব কাজে যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এর ফলে মানুষের জীবনে মূল্যবান কাজগুলোর গুরুত্ব যেন কমে না যায় সেই বিষয়টা বিশেষভাবে খেয়াল রাখবে হবে।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল, ব্র্যাক ইউনভার্সিটির বোর্ড অফ ট্রাস্ট্রিজের সদস্যবৃন্দ,বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ব্র্যাক ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি পরিবারের সদস্যবৃন্দ।






