‘বাংলাদেশপন্থী’ রাজনীতির সূতিকাগার ছিল বঙ্গভঙ্গ: জেডিপি

ছবি: সংগৃহীত
জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির (জেডিপি) আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ বলেছেন, বঙ্গভঙ্গ বাংলাদেশের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক আত্মপরিচয় ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি ‘বাংলাদেশপন্থী’ রাজনীতির অন্যতম প্রেরণা ও সূতিকাগার।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ১২১তম বঙ্গভঙ্গ দিবস উপলক্ষে জেডিপির ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভাটি জেডিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
নাঈম আহমাদ বলেন, বিএনপি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে তাদের রাজনৈতিক আদর্শের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে। অথচ এই জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক পটভূমি অনুধাবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গভঙ্গ দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় কিংবা দলীয় পর্যায়ে কোনো কর্মসূচি চোখে পড়েনি। বাংলাদেশপন্থী অন্যান্য দলেরও এ বিষয়ে তেমন কোনো কর্মসূচি লক্ষণীয় ছিল না। বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যথাযথভাবে স্মরণ না করা হতাশাজনক।
তিনি বলেন, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে কেবল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস কিংবা বাংলা ভাগের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। বঙ্গভঙ্গের মধ্য দিয়ে পূর্ববাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। পূর্ববাংলা ও আসামকে নিয়ে গঠিত নতুন প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। ঢাকাকে রাজধানী করার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বও বৃদ্ধি পেয়েছিল।
বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জেডিপির আহ্বায়ক বলেন, ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিন কংগ্রেস ও বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন অংশ শোক পালন, রাখীবন্ধন, উপবাস ও কর্মবিরতির মতো কর্মসূচি গ্রহণ করে। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের এই ধারা থেকেই পরবর্তী সময়ে হিন্দুত্ববাদের উত্থান ঘটে। তবে পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের মানুষের কাছে বঙ্গভঙ্গের প্রশ্নটি কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয় ছিল না। এ অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজ ও দলিত হিন্দুদের একটি অংশ ভাগ্যের উন্নয়ন ও বৈষম্য দূরীকরণের সম্ভাবনা বিবেচনায় বঙ্গভঙ্গের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
নাঈম আহমাদ বলেন, বঙ্গভঙ্গ রদের অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাকে প্রভাবিত করেছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মধ্য দিয়ে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বৈষম্য, স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এই ধারাবাহিকতায় বঙ্গভঙ্গকে পূর্ববাংলার স্বতন্ত্র রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বঙ্গভঙ্গের সময় পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বঙ্গভঙ্গ রদ না হলে চল্লিশের দশকেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের উত্থান ঘটতে পারত। হিন্দুত্ববাদীদের বাধার কারণে সেই সম্ভাবনা ভেস্তে গিয়েছিল।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জেডিপির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক ইমরান হোসেন রাহাত। তিনি বলেন, “অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। সেই স্বাধীনতার আদর্শিক সূচনা হয়েছিল বঙ্গভঙ্গের মধ্য দিয়ে। বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববাংলায় এমন এক রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপ নেয় এবং ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
“বঙ্গভঙ্গের ঘটনা ১২১ বছর আগের হলেও এই ইতিহাস আমাদের আত্মমর্যাদা ও স্বাধিকার অর্জনের সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জোগায়। সেই সংগ্রামের ধারাবাহিকতা জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বহমান।”
আলোচনা সভায় বক্তারা বঙ্গভঙ্গ দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে আলোচনা এবং বঙ্গভঙ্গের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব নিয়ে গবেষণার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
জেডিপি ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার মাহতাব হোসেন সাব্বিরের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন জেডিপির প্রধান সংগঠক মোঃ আহছান উল্লাহ, যুগ্ম সদস্য সচিব মোস্তফা শাহরিয়ার, আবদুল হামিদ, ঢাকা মহানগর উত্তরের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম সুমন, যুগ্ম সদস্য সচিব শিহাব উদ্দিন, সোহরাব আলী, দপ্তর সম্পাদক ইভান ও অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আল আমিন প্রমুখ।



