মতামত

অটোরিকশা উচ্ছেদের অভিযানে প্রশ্ন: দায় কার, শাস্তি ভোগ করবে কেন দরিদ্র চালক?

অটোরিকশা উচ্ছেদের অভিযানে প্রশ্ন: দায় কার, শাস্তি ভোগ করবে কেন দরিদ্র চালক?
অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন

“ও স্যার, আমার দুলাভাইয়ে কিস্তি তুইলা গাড়ি কিনছে, আমার বইনোর সংসার ভাঙ্গি যাইবো!” অবৈধ অটোরিকশার বিরুদ্ধে নগরীতে পুলিশের অভিযানের সময় এক চালকের এমন আকুতি হৃদয়কে নাড়া দেয়। রিকশা নিয়ে পুলিশ ও চালকের টানাটানির দৃশ্যের মধ্যে ধরা পড়ে এক অসহায় মানুষের জীবিকার সংকট, ঋণের বোঝা এবং একটি পরিবারের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

যে গাড়িটি তার পরিবারের উপার্জনের মাধ্যম, সেটিই যদি অভিযানে হারিয়ে যায়, তাহলে কিস্তির টাকা শোধ হবে কীভাবে? সংসারের খরচ চলবে কী দিয়ে? আর ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সেই পরিবারের ওপর কী বিপর্যয় নেমে আসবে?

এটি কেবল একজন চালকের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়। এর পেছনে রয়েছে নগর পরিবহন ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, নীতিনির্ধারণে সমন্বয়হীনতা, নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন বিস্তার এবং সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন।

সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা অবশ্যই জরুরি। অনিরাপদ যানবাহন, যানজট, দুর্ঘটনা কিংবা আইনবহির্ভূত চলাচল কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি সমস্যা যখন বছরের পর বছর ধরে বাড়তে থাকে, তখন তার সমাধান কি শুধু রাস্তায় নেমে দরিদ্র চালকের রিকশা আটকানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? সমস্যার উৎসে না গিয়ে শুধু শেষ প্রান্তে থাকা মানুষটিকে শাস্তি দিলে কি নগর পরিবহনব্যবস্থায় স্থায়ী শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব?

সমস্যার শুরু কোথায়?

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন নগরীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার এক দিনে ঘটেনি। যাত্রী পরিবহনের চাহিদা, তুলনামূলক সহজে কর্মসংস্থানের সুযোগ, প্রচলিত গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা এবং কম আয়ের মানুষের জীবিকার তাগিদ—সব মিলিয়ে এ যানবাহনের একটি বড় বাজার তৈরি হয়েছে। সেই বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গাড়ি নির্মাণ ও সংযোজন, যন্ত্রাংশ বিক্রি, ব্যাটারি সরবরাহ, চার্জিং ব্যবসা, গ্যারেজ এবং কিস্তিতে যানবাহন কেনাবেচার ব্যবস্থা।

২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ঢাকায় প্রায় ১০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের একটি আনুমানিক হিসাব দেওয়া হয়। একই প্রতিবেদনে ৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং ৯৯২টি গ্যারেজ শনাক্ত করার তথ্য তুলে ধরা হয়। এসব সংখ্যা সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের সময়কার হিসাব; বর্তমান সংখ্যা হিসেবে এগুলোকে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। তবে তথ্যগুলো সমস্যার ব্যাপকতা এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, এত বিপুলসংখ্যক যানবাহন তৈরি হলো কীভাবে? কোথায় তৈরি হচ্ছে, কারা তৈরি করছে, কারা বিক্রি করছে, কীভাবে ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ হচ্ছে, কোথায় চার্জ দেওয়া হচ্ছে এবং কোন সড়কে এসব যান চলাচল করছে—এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি আগে থেকেই নিশ্চিত করা গেল না কেন?

কোনো যানবাহন এক দিনে লাখের ঘরে পৌঁছে যায় না। এর সঙ্গে উৎপাদন, বিপণন, অর্থায়ন, বিদ্যুৎ ব্যবহার, সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক স্তর জড়িত থাকে। অথচ অভিযান শুরু হলে অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হন কেবল সেই চালক, যিনি ঋণ করে বা অন্যের কাছ থেকে কিস্তিতে গাড়ি নিয়ে প্রতিদিনের আয় দিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন।

দায় শুধু চালকের নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থারও

এখানে কয়েকটি সরকারি সংস্থার দায়িত্ব ও ভূমিকা পর্যালোচনা করা জরুরি।

প্রথমত, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। যানবাহনের উপযোগিতা, নিরাপত্তার মান, নিবন্ধন ও চালকের যোগ্যতা-সংক্রান্ত বিধিব্যবস্থা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানবাহনের নিরাপদ নকশা, অনুমোদন, চালকের প্রশিক্ষণ, নিবন্ধন এবং চলাচলের উপযোগী সড়ক নির্ধারণ নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা সময়মতো বাস্তবায়িত না হলে অনিয়ন্ত্রিত বাজার গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়।

দ্বিতীয়ত, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় পর্যায়ে যান চলাচলের শৃঙ্খলা, অনুমোদন ও লাইসেন্সিং-সংক্রান্ত প্রযোজ্য দায়িত্ব পালনে তাদের ভূমিকা রয়েছে। ২০২৬ সালের ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানায়, ব্যাটারিচালিত রিকশা ব্যবস্থাপনার জন্য সরকার নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের যানবাহনের নিবন্ধন ও চালকের লাইসেন্সের সুযোগ তৈরির জন্য স্থানীয় সরকার কাঠামোয় পরিবর্তনও আনা হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যাটি নিয়ন্ত্রণে আনতে নীতিগত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সরকারও স্বীকার করেছে।

তৃতীয়ত, ঢাকা মহানগর পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগ। সড়কে আইন প্রয়োগ, যানজট নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল প্রতিরোধ এবং নির্ধারিত সড়কে যানবাহনের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে আইন প্রয়োগের সঙ্গে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনাও থাকতে হবে। কোনো সড়কে অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ হলে বিকল্প চলাচলপথ, চালকদের অবহিতকরণ এবং বিধি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন চলাচল করতে দেওয়া কোনো যান হঠাৎ অভিযানের মুখে পড়লে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিণতিও বিবেচনায় নিতে হবে।

চতুর্থত, বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসন। অননুমোদিত চার্জিং পয়েন্ট, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাটারি ব্যবহার ও পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব রয়েছে। চার্জিং অবকাঠামোকে নিয়মের আওতায় আনা না গেলে যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঠেকানো কঠিন।

পঞ্চমত, যানবাহন প্রস্তুতকারক, সংযোজনকারী, বিক্রেতা ও কিস্তিতে অর্থায়নকারীরা। নিরাপত্তার মান যাচাই ছাড়া যানবাহন বাজারজাত করা হলে এবং ভবিষ্যৎ আইনগত অবস্থান সম্পর্কে ক্রেতাকে স্পষ্ট ধারণা না দিয়ে কিস্তির চুক্তি করা হলে ঝুঁকির বড় অংশ গিয়ে পড়ে নিম্ন আয়ের ক্রেতার ওপর। এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন অনুসারে ব্যবসায়ীদের দায় ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

এসব প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকের দায়িত্ব এক নয়। তাই কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা সংস্থাকে প্রমাণ ছাড়া সরাসরি দায়ী করা সমীচীন হবে না। তবে এত বড় একটি অনিয়ন্ত্রিত খাত গড়ে ওঠার পেছনে কোথায় কোথায় তদারকির ঘাটতি ছিল, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

কিস্তির গাড়ি যখন পরিবারের গলার ফাঁস

রিকশাচালকের আকুতির সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ হলো—তার দুলাভাই কিস্তিতে গাড়ি কিনেছেন, আর গাড়ি হারালে তার বোনের সংসার ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। দরিদ্র মানুষ জীবিকার জন্য যে সম্পদ কেনেন, সেটি সাধারণত উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে কেনা হয় না। ধার, ঋণ কিংবা কিস্তির ওপর নির্ভর করেই অনেকের কর্মজীবন শুরু হয়। প্রতিদিনের আয় দিয়ে কিস্তি, খাবার, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানের লেখাপড়ার খরচ মেটাতে হয়।

অটোরিকশা উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে চালকরা

যানবাহনটি চলাচলের অনুপযোগী বা আইনবহির্ভূত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ক্রেতাকে যথাযথ তথ্য দেওয়া হয়েছিল কি না, বিক্রেতা আইনসম্মত যানবাহন বিক্রি করেছেন কি না, ঋণদাতা ঝুঁকি যাচাই করেছেন কি না এবং কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছিল কি না—এসব প্রশ্নও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

যদি কোনো যানবাহন কেনার সময় কার্যকর নিয়মের অস্পষ্টতা থাকে, বাজারে অবাধে বিক্রি হয় এবং প্রশাসনের সামনেই দীর্ঘদিন চলাচল করে, তাহলে পরে শুধু ক্রেতা বা চালকের ওপর সব দায় চাপানো ন্যায়সংগত হবে না। তবে কিস্তিতে কেনা হয়েছে বলেই কোনো যানবাহন আইনবহির্ভূতভাবে চালানোর অধিকারও তৈরি হয় না। প্রয়োজন হলো ন্যায়সংগত, পূর্বানুমানযোগ্য ও ধারাবাহিক আইন প্রয়োগ।

শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ সংস্কার

সরকারের উচিত কয়েকটি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

প্রথমত, নগরীতে চলাচলরত ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রকৃত সংখ্যা, মালিকানা, চালক, উৎপাদনকারী, বিক্রেতা ও চার্জিং পয়েন্টের তথ্য সংগ্রহ করে একটি নির্ভরযোগ্য ডেটাবেইস তৈরি করতে হবে। নিবন্ধন ও লাইসেন্সিংয়ের জন্য বাস্তবসম্মত সময়সীমা দিতে হবে। যেসব যান নিরাপত্তার মান পূরণ করতে পারবে, সেগুলোকে নিয়মের আওতায় আনার সুযোগ দিতে হবে; আর যেসব যান সংশোধনযোগ্য, সেগুলো নিরাপদ করার ব্যবস্থা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সড়ককে যানবাহনের ধরন ও ধারণক্ষমতা অনুযায়ী ভাগ করতে হবে। প্রধান সড়ক, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও অলিগলির জন্য পৃথক চলাচলনীতি প্রয়োজন। ব্যাটারিচালিত রিকশা কোথায় চলবে, কোথায় চলবে না, কী গতিতে চলবে এবং কোন ধরনের যান নিবন্ধন পাবে—এসব সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। ২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট ঢাকা ট্রিবিউন-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঢাকার প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিষিদ্ধ রেখে নিবন্ধিত যানকে নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। এমন নীতির বাস্তবায়নে রুট নির্ধারণ ও আন্তসংস্থার সমন্বয় অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, অনিরাপদ যানবাহন উৎপাদন ও বিক্রির উৎসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অনুমোদনহীন উৎপাদন, মানহীন যন্ত্রাংশ, অনিরাপদ ব্যাটারি এবং অবৈধ চার্জিংয়ের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কেবল চালককে আটক করে সমস্যার গোড়া অক্ষত রাখা হলে একই সংকট আবার ফিরে আসবে।

চতুর্থত, যারা ইতিমধ্যে ঋণ বা কিস্তিতে গাড়ি কিনেছেন, তাদের জন্য একটি ন্যায়সংগত রূপান্তর পরিকল্পনা প্রয়োজন। নিরাপদ যানবাহনে রূপান্তরের সুযোগ, স্বল্পসুদের অর্থায়ন, কিস্তি পুনর্নির্ধারণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। কোনো যান স্থায়ীভাবে অচল ঘোষণা করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত মালিকদের পরিস্থিতি যাচাই করে আইনসম্মত সহায়তার ব্যবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে ঋণদাতা ও বিক্রেতার দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে, যাতে পুরো আর্থিক ঝুঁকি দরিদ্র পরিবারের ওপর না পড়ে।

অটোরিকশা উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে রেললাইনে বসে পড়ে চালকরা

পঞ্চমত, নগরীতে সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন বাড়াতে হবে। বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা পর্যাপ্ত না রেখে হঠাৎ বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার পথ বন্ধ করলে জনদুর্ভোগ ও বেকারত্ব বাড়তে পারে। পরিবহন সংস্কার তাই শুধু নিষেধাজ্ঞার বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান, নগর পরিকল্পনা ও সামাজিক সুরক্ষারও প্রশ্ন।

জবাবদিহি নিশ্চিত হোক,  না ভাঙুক অসহায় মানুষের সংসার

অটোরিকশার কারণে যানজট, দুর্ঘটনা কিংবা জননিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হলে সরকারকে ব্যবস্থা নিতেই হবে। নাগরিকের নিরাপদ চলাচলের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার অধিকারও উপেক্ষা করা যায় না। এ দুটি অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই দায়িত্বশীল রাষ্ট্র পরিচালনার পরীক্ষা।

কিন্তু বছরের পর বছর একটি খাতের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঘটতে দিয়ে পরে রাস্তায় অভিযান চালিয়ে চালকের কাছ থেকে জীবিকার অবলম্বন কেড়ে নিলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা আড়াল হয় না। বরং প্রশ্ন আরও জোরালো হয়—যখন গাড়ি তৈরি হচ্ছিল, বিক্রি হচ্ছিল, কিস্তিতে কেনা হচ্ছিল এবং রাস্তায় চলছিল, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কোথায় ছিল?

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে, কিন্তু সেই শৃঙ্খলার নামে অসহায় মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তোলা যাবে না। আইন ভাঙলে ব্যবস্থা নিতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে দেখতে হবে আইন বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দায়িত্ব যথাসময়ে পালন করেছে কি না।

একজন চালকের রিকশা নিয়ে পুলিশের টানাটানির দৃশ্য হয়তো কয়েক মুহূর্তের। কিন্তু সেই দৃশ্যের পেছনে একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস, ঋণের চাপ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ লুকিয়ে থাকে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু রাস্তায় যানবাহন থামানো নয়; এমন নীতিও তৈরি করা, যাতে নিরাপদ সড়ক ও মানুষের জীবিকা পরস্পরের শত্রু হয়ে না দাঁড়ায়।

প্রশ্নটি তাই শুধু অবৈধ অটোরিকশার নয়—প্রশ্নটি দায়িত্বহীনতার, নীতির ধারাবাহিকতার এবং জবাবদিহির। যে ব্যবস্থায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে একটি খাত বেড়ে ওঠে, সেখানে তার সব মাশুল শুধু দরিদ্র চালককে কেন দিতে হবে?

রাষ্ট্রের কাছে এই প্রশ্নের জবাব চাই। কারণ একটি রিকশা জব্দ করা সহজ; কিন্তু একটি পরিবারের ভেঙে পড়া অর্থনীতি পুনর্গঠন করা অনেক কঠিন।

বিষয়:অটোরিকশা অটোরিকশা উচ্ছেদ কিস্তির গাড়ি বিআরটিএ যানজট সড়কে শৃঙ্খলা

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…